জায়গির


জায়গির  রাষ্ট্রের পদস্থ কর্মচারীদের বার্ষিক বৃত্তি হিসেবে ভূমি ও ভূমির খাজনা বন্দোবস্ত দানের মধ্যযুগীয় পদ্ধতি। জাগীর (জায়গির) ফারসি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে বন্দোবস্তকৃত ভূমি। প্রতিকূল যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির বিনিময় প্রকৃতির কারণে বাংলার এবং ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকগণ তাঁদের কর্মচারীদের বিশেষত রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মরত পদস্থ কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য ভূমি বন্দোবস্ত দানের পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। বন্দোবস্তকৃত এ ভূমির খাজনা তাদের বেতন এবং প্রশাসনিক দপ্তরের আনুষঙ্গিক ব্যয় বরাদ্দ হিসেবে গণ্য হতো। জায়গির কর্মকর্তা অন্যত্র বদলি হলে অথবা তাঁর মৃত্যু হলে রাষ্ট্র সচরাচর জায়গির পুনগ্রহণ করে পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তাকে বন্দোবস্ত প্রদান করত। কর্মচারীদের জন্য রক্ষিত নিয়মিত জায়গির ছাড়াও শাসকগণ রাষ্ট্রের অনুগ্রহপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ভরণপোষণের জন্যও জায়গির বরাদ্দ করতেন এবং তাঁরা আজীবন বা বংশানুক্রমে এ ধরনের জায়গির ভোগ করতেন। বংশানুক্রমিক জায়গির সচরাচর বরাদ্দ দেওয়া হতো সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল বা অনাবাদি পতিত ভূমিতে। জায়গিরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা ছাড়াও জঙ্গলবাড়ি এলাকায় জায়গির প্রদান শাসকদের জন্য ছিল বেশ কয়েক দিক দিয়েই লাভজনক। এ ব্যবস্থায় পতিত ভূমি চাষাবাদে উৎসাহ যোগান হতো। রাজধানীতে দলাদলি, বিভেদ ও কোন্দলে লিপ্ত বা কলহ-কোন্দল সৃষ্টি করতে পারেন এমন গুরুত্বপূর্ণ অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের জায়গির বরাদ্দ করে দূরে সরিয়ে দিয়ে কেন্দ্রে উপদলীয় কোন্দল প্রশমন বা রহিত করা সম্ভব হতো; এবং অন্যদিকে জায়গিরপ্রাপ্তদের ব্যবহার করা যেত বহিরাগত লুণ্ঠনকারী হানাদার ও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের সীমান্তরক্ষী হিসেবে। জায়গির বরাবরই রাজকীয় ফরমান বা আদেশের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু নওয়াবী আমলে আরাকানি হানাদারদের কবল থেকে উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তার জন্য নওয়াবগণই ব্যাপকভাবে জায়গির বরাদ্দ করতেন। এধরনের জায়গিরকে বলা হতো নওয়ারা জায়গির।

ব্যক্তিবিশেষের ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গির ছিল তিন ধরনের। বংশানুক্রমিক জায়গির পরিচিত ছিল আলতামগা নামে। জায়গির গ্রহীতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেসব জায়গিরের মেয়াদ শেষ হয়ে যেত সেগুলিকে বলা হতো জাবতি বা ব্যক্তিগত জায়গির। যে সকল জায়গির বন্দোবস্তে রাষ্ট্রের প্রতি কোনো সুনির্দিষ্ট কর্তব্য পালনের শর্ত থাকত সেগুলিকে বলা হতো মাশরুত বা শর্তাধীন জায়গির। উপকূলীয় অঞ্চলের জায়গির বেশির ভাগই ছিল ‘মাশরুত’ ধরনের। যে জমিদারদের জমিদারি এলাকায় জায়গির বহাল থাকত তারা রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রদেয় রাজস্বের আনুপাতিক হারে রেয়াত পেতেন। জায়গির গ্রহীতাদের বলা হতো জায়গিরদার। জায়গিরদারগণ চাকলাদার ক্যাডারের জমিদার ব্যতীত অপর সকল ধরনের জমিদারদের তুলনায় সামাজিকভাবে উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

১৭৭২ সাল থেকে সরকার বরাদ্দকৃত সকল জায়গিরভূমি ফিরিয়ে নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। এ পুনগ্রহণের সপক্ষে যুক্তি দেখানো হয় যে, জায়গির বরাদ্দকালে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এখন আর সে পরিস্থিতি নেই; প্রাক্তন জায়গিরদারগণ এখন আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং তাঁদের কোনো দায়িত্ব ও কাজ নেই। কিন্তু জায়গিরদারদের মধ্যে অনেকে দাবি করেন যে, তাঁরা আলতামগা বা বংশানুক্রমিক জায়গির গ্রহীতা এবং সে কারণে তাঁদের জায়গিরের মেয়াদ পুনর্গহণের আওতাভুক্ত নয়। সরকার তাঁদের দাবির যাথার্থ্য যাচাই করেন এবং শুধু ওই  সকল জায়গিরদারদের জায়গির বহাল রাখেন যাঁরা তাঁদের অনুকূলে মূল সনদ দেখাতে সমর্থ হন। সরকারের এ নীতির ফলে জায়গিরদারগণ মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হন, কারণ তাঁদের অনেকের কাছেই তখন মূল সনদ ছিল না। কালের ব্যবধানে সেগুলি হয় হারিয়ে গেছে নতুবা বিনষ্ট হয়েছে। এমনকি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বহু সনদ জাল দস্তাবেজ বলে ঘোষণা করা হয়। লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক-এর শাসনকালে (১৮২৭-১৮৩৫) বেশ জোরেশোরে জায়গির পুনগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় অধঃপতিত ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে জায়গিরদারগণ সরকারকে তাঁদের অবস্থা বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আর্থিক সংকটে নিপতিত ঔপনিবেশিক সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে নিষ্ঠুরভাবে তাঁদের আবেদন নাকচ করে দেন এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। [সিরাজুল ইসলাম]