জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ


জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ  ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার নীতিতে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। বিশ শতকের ত্রিশের দশকের গোড়া থেকেই অবিভক্ত ভারতে ইসলামী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর নেতৃত্বে একটি পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাসিক পত্রিকা তারজুমান আল-কোরআন-এর মাধ্যমে ১৯৩২ সাল থেকেই এ লক্ষ্যে প্রচারকার্য শুরু হয়। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার পথ’ শীর্ষক এক বক্তৃতায় মওলানা মওদুদী মুসলিম লীগের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের কথা প্রকাশ করেন। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করা হয়। তদনুসারে ওই  বছর ২৫ আগস্ট লাহোরে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। মওলানা মওদুদী এ দলের আমীর নির্বাচিত হন।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আমীরগণ-এর তালিকা:

মওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী  ১৯৪৭-১৯৭২
উফায়েল মুহাম্মদ ১৯৭২
কাজী হুসাইন আহমেদ ১৯৭২
মওলানা জাকারিয়া ১৯৭২- জুলাই ১৯৭৩
মোঃ শফীকুল্লাহ জুলাই ১৯৭৩- সেপ্টেম্বর ১৯৭৪
মওলানা আবদুল খালেক সেপ্টেম্বর ১৯৭৪- মার্চ ১৯৭৫
সৈয়দ মোহাম্মদ আলী মার্চ ১৯৭৫- সেপ্টেম্বর ১৯৭৫
মওলানা আবদুর রহীম সেপ্টেম্বর ১৯৭৫- ১৯৭৮
মওলানা আববাস আলী খান (ভারপ্রাপ্ত) ১৯৭৯
অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৭৯-২০০০
মওলানা মতিউর রহমান নিজামী ২০০০-

যুদ্ধাবস্থার কারণে প্রায় চার বছর জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় নি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৪৫ সালের ১৯-২১ এপ্রিল পাঞ্জাবের পাঠানকোটে দলের প্রথম নিখিল ভারত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭  সালে ভারত বিভক্তির পর জামায়াতে ইসলামী দ’ুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জামায়াতে ইসলামী হিন্দ দিল্লিতে এবং জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান লাহোরে দলের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে। নিখিল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে এবং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সাথে হাত মেলায় এবং তাদের সহযোগী শক্তি হিসেবে বিভিন্ন নামে বাহিনী গঠন করে বাংলাদেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুসারে সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ হলে রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দল বিধির আওতায় মওলানা আবদুর রহীমের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ (আই.ডি.এল) রাজনৈতিক দল হিসেবে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি লাভ করে এবং জামায়াতের সদস্যরা এ দলের ব্যানারে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতের কতিপয় নেতা ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ৬ জন প্রার্থী জয়ী হন। ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে এ দলটি পুনরায় রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় এবং মওলানা আব্বাস আলী খানকে দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর নির্বাচন করা হয়।

১৯৭৯ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসনে জয়লাভ করে। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে জামায়াতের ১০ জন সংসদ সদস্য ১৯৮৭ সালের ৩ ডিসেম্বর সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট, বি.এন.পি-র নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট, ৫-দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। জোটসমূহের এই আন্দোলন ১৯৯০-এর শেষ দিকে গণঅভ্যুত্থানে রপান্তরিত হয়। জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ-এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি আসনে বিজয়ী হয় এবং সরকার গঠনের জন্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সমর্থন দেয়। মহিলাদের জন্য সংরতি ৩০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ২টি আসন লাভ করে। ১৯৯১ সালে অধ্যাপক গোলাম আযম পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর উচ্চ আদালত কর্তৃক তার বাংলাদেশের নাগিরকত্ব বৈধ ঘোষিত হবার পর তাঁকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচন করা হয়। তিনি ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামী ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের আন্দোলনে যোগ দেয়। এ আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জামায়াত দলীয় সদস্যগণ সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে মওলানা মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর পদে অধ্যাপক গোলাম আযমের স্থলাভিষিক্ত হন।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে গঠিত ৪ দলীয় জোট জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও অধিক আসনে জয়লাভ করে এবং শরীক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ পায় ১৭টি আসন। জোটের শরীক হিসেবে জামায়াত সরকারে অংশ নেয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৪-দলীয় জোটের মন্ত্রিসভায় এ দলের দুজন সদস্য মওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং মওলানা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ অন্তর্ভুক্ত হন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটের শরীক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ২টি আসনে জয়লাভ করে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গণদাবী অনুসারে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করে। এই ট্রাইবুনাল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সহযোগিদের বিচার শুরু করে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন প্রধান নেতাও ছিলেন। ট্রাইবুনাল অভিযুক্তদের অপরাধী সাব্যস্ত করে রায় দেন । আব্দুল কাদের মোল্লা এবং মুহাম্মদ কামারুজ্জামান- এই দু’জন শীর্ষ জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক বর্ষীয়ান নেতা গোলাম আযমকে তাঁর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়। তিনি পরে কারাগারে বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

প্রসিকিউটর বনাম গোলাম আযম মামলায় প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি এবং দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে ট্রাইবুনাল মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতে ইসলামী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে কাজ করেছিল।  [এফ.এম মোস্তাফিজুর রহমান]