জাতীয় সংসদ ভবন


জাতীয় সংসদ ভবন  রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত। এ অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য জাতি গর্বিত। পিরামিডের সময় থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ব্যাপ্ত স্থাপত্যসমূহের যদি একটি বাছাই তালিকা করা হয় তবে তাঁর মাঝেও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন উপরের সারিতেই স্থান পাবে। বলা যায়, এটি আধুনিক যুগের স্থাপত্য রীতির সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন এবং এর মাধ্যমে সূচিত হয় আধুনিকোত্তর যুগের স্থাপত্য রীতির। এ অসাধারণ ভবনটি আমেরিকার স্থাপতি  লুই আই কান-এর সৃষ্টিশীল ও কাব্যিক প্রকাশের নিদর্শন।

১৯৬২ সালের ভূমি নকশা, জাতীয় সংসদ ভবন, ঢাকা

১৯০১ সালে এস্তোনিয়ার এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী লুই কান তাঁর পিতা-মাতার সাথে আমেরিকায় অভিবাসিত হন। পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফিলাডেলফিয়ায় তিনি তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেন। একই সাথে তিনি ইউনিভার্সিটিতেও শিক্ষকতা করতেন। ফিলাডেলফিয়ার রিচার্ড মেডিক্যাল ল্যাবরেটরি নকশার মাধ্যমে তিনি প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কর্মের মধ্যে ফিলিপস এক্সটার অ্যাকাডেমি লাইব্রেরি, ব্রায়েন ময়ার ডরমিটরি, ইয়েল আর্ট গ্যালারি, শালক্ ইনস্টিটিউট, কিম্বল আর্ট মিউজিয়াম, ভারতে আহমেদাবাদ ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, নেপালে ফ্যামিলি প্লানিং সেন্টার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর সবচেয়ে বড় ও সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স। লুই আই কান-এর মৃত্যুর পর তাঁর সহকারী হেনরী উইলকট কমপ্লেক্সটির পরিবর্তিত নকশা সম্পাদন করেন। হেনরী এম. প্যামব্যাম এর কাঠামোটি ডিজাইন করেন। ভবনটি সৃষ্টিশীলতা ও কারিগরি মিশেলের এক  বিস্ময়।

১৯৫৯ সালে প্রথম ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটির পরিকল্পনা গৃহীত হয়। তৎকালীন সামরিক সরকার পাকিস্তানের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রাজধানী শেরে বাংলা নগরে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সংসদ ভবন র্নিমাণের পরিকল্পনা থেকে বর্তমান সংসদ ভবনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখনকার খ্যাতনামা স্থাপতি লুই কান ভবন কমপ্লেক্সটির নকশা প্রণয়নের জন্য প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হন। তাঁকে সরাসরি কাজে নিযুক্ত না করে ভবনের প্রাথমিক নকশা প্রদানের জন্য বলা হয় এবং ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তিনি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পান। ১৯৬১ সালে বর্তমান মানিক মিয়া এভিনিউ-এর উত্তর পার্শ্বে ২০৮ একর জমি দ্বিতীয় রাজধানী প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় এবং ১৯৬২ সালে মূল নকশা প্রস্ত্তত হয়। ১৯৬৪ সালে ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুমিত ব্যয় ধরে কমপ্লেক্সটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সমস্ত সুবিধাদিসহ ৩২ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তিত ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে। কমপ্লেক্সটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে মূল সংসদ ভবন, সংসদ সদস্য, মিনিস্টার ও সেক্রেটারিদের হোস্টেল, অথিতি ভবন ও কমিউনিটি বিল্ডিং। রাস্তা, হাটার পথ, বাগান ও লেক দ্বারা এ সমস্ত কিছুই আকষর্ণীয় করে তোলা হয়েছে।

সুপ্রিম কোট, মসজিদ ও প্রেসিডেন্টের বাসভবনের ক্ষেত্রে মূল মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন সাধিত হয়। এ ভবনগুলি যতটা কম আকর্ষণীয় করা যায় সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এগুলি প্রধান সংসদ ভবন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ভবনগুলির মধ্যে প্রেসিডেন্টের বাসভবন (বর্তমানে গণভবন ও প্রধান মন্ত্রীর সরকারি বাসভবন) ছিল একটি। ১৯৬৪ সালে সংসদ ভবনের নকশা সম্পন্ন হয় এবং এর পরপরই  নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নির্মাণাধীন প্রধান অবকাঠামোটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার ভবনের মূল নকশায় কোনো রকম পরিবর্তন না এনে নির্মাণ সম্পন্ন করার কৃতিত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

জাতীয় সংসদ ভবন

জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিশালত্বের মাঝে নিহিত। মার্বেল পাথর সংযুক্ত বিপুল কংক্রিটের বহির্দেয়ালের মাঝে মাঝে রয়েছে নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতির প্রবশদ্বার। বৃত্তাকার ও আয়তাকার কংক্রিটের সমাহার ভবনটিকে দিয়েছে এক বিশেষ স্থাপত্যিক সৌকর্য যা এর মহান উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবনের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে হলো সংসদের প্রধান হল, যেখানে সংসদ সদস্যগণ পার্লামেন্টে বসেন। সমকেন্দ্রিক নকশার মূল হলরুমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অংশগুলি গড়ে উঠেছে। ছাদ দিয়ে প্রবেশ করা আলোর মালা সাত তলা উঁচু গোলাকার মূল হলরুমটি এমনভাবে বেষ্টিত ঠিক যেন দেবীর মঞ্চকে ঘিরে উম্মুক্ত গোলাকার পথ। মূল ভবনের চারবাহু বরাবর চার কোণে অন্যান্য কাজের জন্য রয়েছে চারটি একই ধরনের অফিস ব্লক। যোগাযোগের জন্য রয়েছে বিভিন্ন প্রকার সিড়ির ব্যবস্থা। বর্গাকার নকশার হলেও এটি নিপুণ ভাবে অষ্টভুজের মধ্য স্থাপিত হয়েছে। নয়তলা বিশিষ্ট হলেও অনুভূমিক যোগাযোগ রয়েছে মাত্র তিনটি তলায়। মাটির উপরে কাঠামোটির উচ্চতা ৪৯.৬৮ মিটার।

মূল ভবন কমপ্লেক্সটির নয়টি স্বতন্ত্র বিভাগে বিভক্ত। এর মধ্য আটটি ৩৩.৫৩ মিটার এবং কেন্দ্রীয় অষ্টভুজাকার ব্লকটি ৪৭.২৪ মিটার উঁচু। কেন্দ্রীয় ব্লকটি ৩৫৪ আসন ধারণক্ষম অ্যাসেম্বলি কক্ষ নিয়ে গঠিত। সমগ্র কমপ্লেক্সটির আয়তন (floor area) হলো মূল ভবনে ৭৪,৪৫৯.২০ বর্গমিটার, দক্ষিণ প্লাজায় ২০,৭১৭.৩৮ বর্গমিটার এবং উত্তর প্লাজায় ৬,০৩৮.৭০ বর্গমিটার। দক্ষিণ প্লাজার মূল প্রবেশ পথটি একটি প্রশস্ত সিঁড়ির আকারে ধীরে ধীরে ৬.২৫ মিটার উচ্চতায় উঠে গেছে। এর বেসমেন্টে রয়েছে পার্কিং এলাকা, তত্ত্বাবধায়ক এজেন্সির অফিস ও মূল ভবনের সুবিধাদি প্রদানের জন্য স্থাপিত বিভিন্ন ব্যবস্থা। একটি কৃত্রিম লেক ভবনের চার পাশের প্রাচীর ঘিরে আছে এবং এটি উত্তর ও দক্ষিণ প্লাজাকেও সংযুক্ত করেছে। সমস্ত ভবনটাকে মনে হয় যেন পানির উপরে ভেসে উঠেছে। র্পালামেন্ট ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে দক্ষিণের গ্র্যান্ড প্লাজা ও উত্তরে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বাগান ও ইউক্যালিপটাসের সারি শোভিত প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার। উত্তর প্রবেশ পথের দিকে রয়েছে একটি এ্যাম্পি থিয়েটার যেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর প্লাজা পেরিয়ে ক্রিসেন্ট লেকের পাশে রয়েছে একটি রাস্তা।

পার্শ্বচিত্র, জাতীয় সংসদ ভবন

ভবনের কোথাও কোনো কলাম নেই। শূন্য স্থানের অংশ হিসেবে ফাঁপা কলাম রয়েছে ঠিকই কিন্তু তা শুধুই কাঠামো নকশায় ভারসাম্য রক্ষার্থে ব্যবহূত হয়েছে। এটি অনেকটাই বিশাল কংক্রিটকে খোদাই করে পরিণত করা হয়েছে একটি অসাধারণ কার্যকর ভাস্কর্যে। নির্মাণ মসলা হিসেবে কংক্রিট ব্যবহূত হয়েছে এবং ভেতরে ও বাইরের অংশে ব্যবহূত হয়েছে ঢালাই কংক্রিট। যে দক্ষতার সাথে আলোকে প্রয়োগ করা হয়েছে তাই হলো কান-এর নকশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ছাদ দিয়ে প্রবেশকৃত আলো বিভিন্ন জায়গাকে যেভাবে আলোকিত করেছে তাতে মনে হয় আলোকচ্ছটা ঝরে পড়ছে স্বর্গ থেকে।

জাতীয় সংসদ ভবনের নকশায় সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির প্রতিরোধকে বিবেচনা করা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। অন্যদিকে বাতাসের বাধাহীন চলাচলকে সম্ভব করেছে বহিস্থ ফাসাদের বিশাল জ্যামিতিক ত্রিভুজ, আয়তক্ষেত্র, সম্পূর্ণ বৃত্ত ও বৃত্তাংশ এবং সমতল খিলানসমূহ। ভবন কাঠামোটি একটি অসাধারণ সৌধ হিসেবে দৃষ্টিগোচর হয়। এখানে বাইরের দিকে গতাণুগতিকভাবে জানালা স্থাপন পদ্ধতিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মূল দেওয়ালে ফাঁক সৃষ্টি করে বিশাল স্থাপত্যের অসুবিধাকে দূর করা হয়েছে। স্থাপত্যিক শৈলীতে ভবনটি ঢাকার আধুনিক ভবনসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

এ ভবনের প্রধান সমালোচনার বিষয় এর অত্যধিক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। ৫৮,৩২৭.৫৯ বর্গমিটার (পার্লামেন্ট ভবন ৩.৪৪ একর; উত্তর প্লাজা ১.৪৬ একর; দক্ষিণ প্লাজা ৪.৯৮ একর এবং আবাসিক ভবন, হোস্টেল, বাগান, রাস্তা, লেক ইত্যাদি) এলাকার এ ভবন কমপ্লেক্সটির সর্বমোট নির্মাণ ব্যয় ১২৮ কোটি টাকা। ভবন কমপ্লেক্সে ৫০টি সোপান, ৩৪০টি শৌচাগার, ১৬৩৫টি দরজা, ৩৩৫টি জানালা, ৩০০টি পার্টিশন দেওয়াল, ৩,৩৩০.৫৭ বর্গমিটার কাঁচের শাটার, ৫,৪৩৪.৮৩ বর্গমিটার কাঠের শাটার, ৩,৭৩৮ ঘন মিটার কাঠের প্যানেল রয়েছে। ভবনের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। ভবনের সর্বোচ্চ তলাটি বা লেবেল ১০ ব্যবহার্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য ব্যবহত হয়।

১৯৮২ সালের প্রথম দিকে ভবনটির কাজ সম্পন্ন হয় এবং একই বছর ২৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট জাস্টিস আব্দুস সাত্তার এটির উদ্বোধন করেন। ১৯৮২ সালের ১৫ ফের্রুয়ারি এ ভবনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পৃথিবীর প্রায় সকল স্থাপত্য বিষয়ক পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন আলোচিত হয়েছে এবং এটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। পুরস্কার প্রদানের সময় প্রকাশিত সম্মাননা পত্রে বিধৃত উক্তি এ প্রকল্পের একটি প্রকৃষ্ট মূল্যায়ন করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অসাধারণ সামর্থতায় স্থাপত্যিক গুরুত্বসহ অবয়ব ও সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ এ ভবনটি জুরি র্বোড কর্তৃক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এ বলে যে, এ গরিব দেশটির নিকট শেরে বাংলা নগরে স্থাপিত এর প্রয়োজন কতটুকু। তারপরও ভবনটির নকশা এবং নির্মাণ পরিকল্পনা ... প্রকাশ করে যে কালক্রমে এটি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে এটি দাড়িয়ে আছে এবং বিভিন্ন কল্যাণকর উপায়ে দেশটিকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছে। স্থাপত্যকে ছাড়িয়েও ভবনটি এর বিভিন্ন পার্ক এবং জলাশয়ের মধ্য দিয়ে আশপাশের এলাকাকে সম্পৃক্ত করেছে ... স্থপতি ঢাকার স্থানীয় নির্মাণ শৈলীকে নতুন করে রূপদান করেছেন। এর ফল হলো এমন একটি ভবন যা নমুনা, সুষমা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সর্বজনীন হয়েও আর কোথাও এর বিকাশ সম্ভব ছিল না।  [মীর মোবাশ্বের আলী এবং মোঃ আবদুর রউফ]