জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি


জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি  জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সম্পাদন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত ও অনুমোদিত কার্যপ্রণালী বিধি কাঠামো। সংবিধানের ৭৫(১) (ক) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সংসদ কর্তৃক গঠিত কমিটির পেশকৃত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রণীত।

কার্যপ্রণালী বিধি ১৯৭৪ সালের ২২ জুলাই সর্বপ্রথম গৃহীত হয়। সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার কাঠামো প্রবর্তনের পর এ বিধিমালা সর্বমোট আটবার সংশোধিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের ৫ নভেম্বর সংসদীয় সরকার কাঠামো পুনঃপ্রবর্তনের পর স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নয়টি সভায় আলোচনার মাধ্যমে বিধিমালাটি আরও সংশোধন করে। এ কমিটির প্রতিবেদন ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি  সংসদের অনুমোদন লাভ করে এবং একই দিনে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে এ বিধিমালায় আরও সংশোধন আনা হয় এবং ১৯৯৭ সালের ১০ জুন সরকারি গেজেটে তা প্রকাশিত হয়। বিধিমালা হালনাগাদ করে ২০০১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সংসদ সচিবালয় এটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে। কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনীসহ সর্বশেষ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি।

কার্যপ্রণালী বিধি ২৯ টি অংশে বিভক্ত। এতে রয়েছে ৩১৮ টি ধারা ও চারটি সিডিউল। বিধিমালার প্রধান বিষয়বস্ত্ত হলো:

সংসদের অধিবেশন আহবান, মুলতবী ও অবলুপ্তি, সংসদ-সদস্যদের শপথগ্রহণ, সদস্যদের তালিকা প্রণয়ন ও আসন নির্ধারণ;

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন, এবং শূণ্যপদ পূরণ ও পদবি নির্ধারণ;

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি, সংসদ-সদস্যদের বহিষ্কার ও সাময়িক বহিষ্কার এবং স্পিকার কর্তৃক ক্ষমতার বিভাজন;

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও তাঁর বাণী এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ;

সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন, উত্তর দানের পদ্ধতি, সম্পূরক প্রশ্ন এবং প্রশ্ন উত্থাপনের বিধিনিষেধ;

জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলতবী প্রস্তাব, এবং দৃষ্টি আর্কষণী নোটিশ;

সরকারি বিল এবং তৎসংক্রান্ত আলোচনা ও অনুমোদন, সংবিধানের সংশোধন, পিটিশন ও ব্যক্তিগত বিল;

বাজেট উত্থাপন ও বিতর্ক, অনুদানের দাবি, অর্থ বিল ও বিশেষ খাতে রক্ষিত বিল;

সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্ত;

রাষ্ট্রপতির অভিসংশন;

সংসদ-সদস্যদের সুবিধাদি ও অধিকার;

গোপন বৈঠক;

স্থায়ী ও অন্যান্য কমিটি সংক্রান্ত বিধিবিধান।

উপর্যুক্ত কয়েকটি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। প্রথমেই আসে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপনের বিষয়টি। এ সম্পর্কিত বিধিতে একজন সদস্যকে প্রশ্ন উত্থাপনের অধিকার দেয়া হয়েছে। প্রশ্নটি যে মন্ত্রি বা সদস্যের উদ্দেশ্যে উত্থাপিত হবে, তাঁকেই এর জবাব দিতে হবে। অবশ্য এ অধিকারের উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে তন্মধ্যে প্রধান হলো: (ক) যে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরকারের সঙ্গে আর্থিক বা অন্য কোনো সম্পর্ক নেই; (খ) উত্থাপিত প্রশ্নটি ব্যঙ্গাত্বক বা মানহানিকর হবে না; (গ) এতে কোনো জটিল আইনি বিষয়ের কোনো সমাধানের প্রস্তাব থাকবে না; (ঘ) কোনো সংসদীয় কমিটির বিবেচনাধীন কোনো বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না; (ঙ) উত্থাপিত প্রশ্নে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত চরিত্র সম্পর্কে কোনো অভিযোগ বা ইঙ্গিত থাকবে না; (চ) জনগণ সহজেই কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এমন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না; (ছ) প্রশ্নটির মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় আলোচিত হয়েছে এমন বিষয় সম্পর্কে কোনো তথ্য অথবা রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত পরামর্শ সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য চাওয়া যাবে না যা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সংবিধান বা কোনো আইনে বাধানিষেধ আছে; (জ) বাংলাদেশের কোনো এলাকায় কোনো আদালত বা বিচারিক কর্তৃপক্ষের বিচারাধীন কোনো বিষয় সম্পর্কে কোনো তথ্য চেয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না; (ঝ) এমন কোনো বিষয় উত্থাপন করা যাবে না, যা আদালতে বিচারাধীন অথবা কোনো ট্রাইবুন্যাল বা কমিশনের তদন্তাধীন রয়েছে। তবে কেবলমাত্র এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে যা আইনি প্রক্রিয়া বা তদন্তের কাজে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

বিশেষভাবে, জাতীয় সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের ক্ষেত্রে আরও কিছু বাধানিষেধ রয়েছে। যথা:

রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের আচরণ সম্পর্কে কোনো কটাক্ষ করা যাবে না;

সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো সমালোচনা থাকবে না;

আইনের দৃষ্টিতে গোপন কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য চাওয়া যাবে না;

প্রতিষ্ঠিত কোনো আদালত বা সংবিধিবদ্ধ ট্রাইব্যুনালের কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো কটাক্ষ থাকবে না এবং অনুরূপ আদালত বা ট্রাইবুন্যালে বিচারাধীন কোনো বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে, এমন কোনো মন্তব্য থাকবে না;

কোনো বন্ধুরাষ্ট্র সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক কোনো মন্তব্য থাকবে না।

মুলতবী প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও কিছু বাধানিষেধ রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণী নোটিশ দানের ক্ষেত্রেও কিছু বাধানিষেধ রয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় কার্যপ্রণালী বিধি হলো নিয়ন্ত্রক পদ্ধতি। এ পদ্ধতি সংসদের কার্যাবলি সম্পাদনে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য অবশ্যই অনুসরণীয়।  [এ.এম.এম শওকত আলী]

তথ্যসুত্র  Bangladesh Jatiyo Sangsad, Rules of Procedure, 2007 (Amended upto 11 January 2007).