জাতীয় সংসদ


জাতীয় সংসদ  গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশের এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা। দেশের সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন ক্ষমতা এ সংসদের ওপর ন্যস্ত। প্রতি নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত।

জাতীয় সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। এ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। দেশে যুদ্ধ দেখা দিলে সংসদের মেয়াদ অনধিক এক বছর বর্ধিত করা যেতে পারে। তবে যুদ্ধ সমাপ্ত হলে এ বর্ধিত মেয়াদ ছয় মাসের বেশি হতে পারে না। যুদ্ধাবস্থায় কিংবা সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি পুনরায় সংসদের অধিবেশন আহবান করতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতির এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে হতে হবে।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ৩০০টি একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত। জাতীয় সংসদের ৩০০ জন সদস্যের প্রত্যেকে এক একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে মহিলাদের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রণীত আদি সংবিধানে জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য অতিরিক্ত ১৫ টি আসন ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষিত ছিল। ৩০০ সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যগণ নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ জন এবং  সংরক্ষণের সময়সীমা ১৫ বছর করা হয়। এ সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসন ছিল না। ১৯৯০ সালে সংবিধানের দশম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য  পরবর্তী ১০ বছর মেয়াদে ৩০টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। মহিলাদের এই  সংরক্ষিত  আসনের মেয়াদ ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। এরপর ২০০৪ সালের ১৭ মে গৃহীত সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধন) আইন ২০০৪ অনুযায়ী সংসদে মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে এ সংখ্যা ৪৫-এ উন্নীত করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে (২০১১) মহিলা আসন সংখ্যা ৫০ করা হয়। তবে সাধারণ আসনেও মহিলাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিধান প্রচলিত আছে।

সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ-সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হয়। সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে নববই দিনের মধ্যে কিংবা স্পীকার কর্তৃক যথার্থ কারণে বর্ধিত তারিখের মধ্যে সংসদ-সদস্য যদি শপথ গ্রহণ ও শপথপত্রে স্বাক্ষর না করেন কিংবা অনুরূপ ঘোষণা বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর না করেন, তবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল বলে গণ্য হয়। সংসদের অনুমতি না নিয়ে কোনো সদস্য একাদিক্রমে নববই দিন অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর আসন শূণ্য হয়ে যায়। কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে সকল সদস্যের আসন শূণ্য হয়। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী অনুসারে জাতীয় সংসদের কোনো সদস্য দল ত্যাগ করতে পারেন না। সংবিধানের ৭০(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন বা দলের  বিপক্ষে ভোট দেন অথবা দলের নির্দেশ অমান্য করে সংসদে অনুপস্থিত থাকেন বা ভোটদানে বিরত থাকেন, তবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। কোনো সদস্য স্বতন্ত্র র্প্রাথী হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি যেকোনো দলে যোগ দিতে পারেন। তবে একবার কোনো দলে যোগ দিলে তিনি আর দল ত্যাগ করতে পারেন না। কোনো ব্যক্তি সংসদের একাধিক আসনের জন্য প্রার্থী হতে পারেন। একাধিক আসনে জয়লাভ করলেও কেবল একটি আসনেই তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার বিধান আছে এবং শূণ্য আসন পূরণের জন্য উপ-নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

স্পীকার সংসদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। জাতীয় সংসদের বৈঠকে স্পীকার সভাপতিত্ব করেন। কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পীকার ও একজন ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করা হয়।  স্পীকারের প্রধান দায়িত্ব সংসদে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং এর  মর্যাদা সংরক্ষণ করা। স্পীকারকে নিরপেক্ষ হতে হয় এবং সংসদে সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংসদের অধিবেশন চলাকালে স্পীকারের সিদ্ধান্ত ও রুলিং অবশ্য পালনীয়। সংসদে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে স্পীকার যেকোন সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারেন। স্পীকার সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ করেন। সংসদ-সদস্যদের স্পীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত আছে, রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি বা তাঁর অসামর্থ্যের ক্ষেত্রে স্পীকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন (৫৪ অনুচ্ছেদ)। স্পীকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পীকার সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া সকল কাজে তিনি স্পীকারকে সহায়তা করে থাকেন। সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত প্রস্তাব দ্বারা স্পীকারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা  যায়। স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকারের পদ শূণ্য হলে সংসদ অধিবেশনরত থাকলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা অধিবেশন না থাকলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে উক্ত পদ পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার তাঁদের উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যমত স্ব স্ব পদে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হন। সংসদ-সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহবান করা হয়। রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম বৈঠকের স্থান ও সময় নির্ধারণ করেন। সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে শুরু করে সংসদ স্থগিত হওয়া বা ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত সময়কে অধিবেশন বলা হয়। প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনায় রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দান করেন।  সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকার বিধান নেই। সংসদ আহবান করা হলে সংসদের সচিব অধিবেশনের তারিখ, সময় ও স্থানের বিবরণ সংবলিত একটি বিজ্ঞপ্তি গেজেটে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন এবং সংসদ-সদস্যদের নিকট আহবানপত্র প্রেরণ করেন। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে বা স্বল্পকালের নোটিশে অধিবেশন আহবান করা হলে কেবল গেজেটে ও সংবাদপত্রে অধিবেশনের তারিখ, সময় ও স্থান সম্পর্কিত ঘোষণা প্রকাশ করা হয় এবং এ বিষয়ে তারযোগে সদস্যগণকে অবহিত করা হয়।

সংসদ আহবান, স্থগিত ও ভেঙে দেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত। তবে সংবিধানে বর্ণিত কয়েকটি পরিস্থিতিতে, যেমন রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের ক্ষেত্রে স্পীকার সংসদ আহবান করতে পারেন। সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষিত হলে বা সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে সচিবের মাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি গেজেটে প্রকাশিত হয়। প্রতি বছর সংসদের অন্যূন দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। সংসদে বিভিন্ন ধরনের বৈঠক হয়ে থাকে। এ বৈঠক সংসদের কিংবা কোনো কমিটি বা সাব-কমিটির হতে পারে। সংসদের কার্যক্রম অনুসারে স্পীকার বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন দিনে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেন। স্পীকারের নির্দেশ অনুযায়ী বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারিত হয়। স্পীকার প্রয়োজনে যেকোন বৈঠক মুলতবি ঘোষণা করতে পারেন এবং অন্য কোনো তারিখ ও সময়ে বৈঠক ডাকতে পারেন। কমিটির বৈঠকের দিন ও সময় কমিটির সভাপতি নির্ধারণ করেন। সভাপতির অনুপস্থিতিতে সচিব দিন ও সময় নির্ধারণ করেন। সংসদ-নেতার অনুরোধক্রমে স্পীকার সংসদের গোপন বৈঠকের জন্য যেকোন দিন বা দিনের অংশ ধার্য করতে পারেন। সংসদের গোপন বৈঠক চলাকালে সংসদের কক্ষ, লবি বা গ্যালারিতে কোনো আগন্তুকের প্রবেশাধিকার নেই। তবে স্পীকারের অনুমতিক্রমে কোনো ব্যক্তি সংসদের কক্ষ, লবি বা গ্যালারিতে প্রবেশ করতে পারেন। স্পীকার নিজ বিবেচনামতে গোপন বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু উপস্থিত অন্য কোনো ব্যক্তি উক্ত কার্যবিবরণী অথবা গোপন বৈঠকের কোনো সিদ্ধান্তের আংশিক বা পূর্ণ রেকর্ড অথবা নোট রাখতে পারেন না এবং বিবরণী প্রকাশ বা বর্ণনা করতে পারেন না। স্পীকারের নির্দেশ অনুযায়ী গোপন বৈঠকের অন্যান্য নিয়মাবলি নির্ধারিত হয়। জাতীয় সংসদের কার্য পরিচালনার জন্য কোরাম থাকতে হয় এবং অধিবেশনে কোরামের জন্য ন্যূনতম ৬০ জন সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। ৬০ জনের কম সদস্য উপস্থিত থাকলে স্পীকার সংসদের অধিবেশন স্থগিত রাখেন এবং পাঁচ মিনিটকাল ঘণ্টা বাজাতে বলেন। ঘণ্টাধ্বনি বন্ধ হওয়ার পরও কোরাম না হলে স্পীকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।

সংসদ-নেতা বলতে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন নেতাকে বোঝায়। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় সংসদ নেতাই সরকার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তবে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত অন্য কোনো মন্ত্রী সংসদ নেতা হতে পারেন। তাঁকে অবশ্যই সংসদ-সদস্য হতে হয়। যেকোন সংসদকে কার্যকর ও সফল করার ক্ষেত্রে সংসদ-নেতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ নেতাকে সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়েরই অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। দলের চীফ হুইপের মাধ্যমে সংসদ-নেতা সরকারি কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করেন। সংসদ পরিচালনায় তিনি স্পীকারকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। দেশের আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত সকল পরিকল্পনা গ্রহণের দায়িত্ব সংসদ নেতার।

সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্যবিশিষ্ট বিরোধী দল এবং বিরোধী দলগুলোর সকল সদস্যের আস্থাভাজন সংসদ-সদস্যই বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। তিনিই সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন এবং সংসদ-নেতা ও হুইপদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংসদের কর্মসূচি নির্ধারণ করেন।

সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন। তিনি পূর্ণকালীন অফিস ও স্টাফ সুবিধা পান। আইন প্রণয়ন, সংসদীয় বিতর্ক এবং যেকোন ধরনের সংকটকালে বিরোধী দলীয় নেতা বিকল্প প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজ নিজ দলের স্বার্থ সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে উভয় দল থেকে হুইপ পদে দলীয় সংসদ-সদস্যদের নিয়োগ করা হয়। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলেই একজন করে চীফ হুইপ থাকেন। তাঁদের সহায়তা করার জন্য আরও কয়েকজন হুইপ থাকেন। চীফ হুইপ বা হুইপগণ এ পদের জন্য আলাদা কোনো সম্মানী পান না। সংসদে হুইপদের পদ অত্যন্ত ব্যস্ততাপূর্ণ। নিজ নিজ দলের পক্ষে ভোট দিতে সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করা, দলীয় সদস্যদের প্রয়োজনীয় দলিল, কাগজ ও তথ্য সরবরাহ করা, সংসদে সংঘটিত ঘটনাবলি সম্পর্কে দলীয় নেতাদের অবহিত করা এবং দলনেতার কাজে সহায়তা করা হুইপের দায়িত্ব। বিভিন্ন কমিটিতে প্রতিনিধিত্বকারী দলীয় সদস্যদের নামের তালিকা প্রস্ত্তত করাও হুইপদের কাজের অন্তুর্ভুক্ত। সরকারি ও বিরোধী দলের চীফ হুইপ ও অন্যান্য হুইপদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সুসম্পর্ক সংসদের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করে। কোনো বিষয়ে সমস্যা ও বিতর্ক দেখা দিলে চীফ হুইপগণ তা নিরসনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।

সংসদ-কক্ষের সামনের দিকের আসনগুলোকে বলা হয় ট্রেজারি বেঞ্চ। সরকারি দলের মন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ সামনের সারিতে বসেন। স্পীকারের আসনের ডানদিকে থাকে ট্রেজারি বেঞ্চ। এর বিপরীত দিকে সামনের সারিতে বসেন বিরোধী দলের নেতা, উপনেতা, হুইপ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। ট্রেজারি বেঞ্চকে ‘ফ্রন্ট বেঞ্চ’ও বলা হয়। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের যেসব সদস্য পেছনের সারিতে বসেন তাদের বলা হয় ব্যাকবেঞ্চার। এ সদস্যগণ সরকারি দলের মন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত নন, আবার বিরোধী দলের নেতৃস্থানীয়ও নন। তাই সংসদের আসন ব্যবস্থায় তাঁরা পেছনের সারিতে বসেন।

সংসদ সদস্যগণ যে ভাষায় বক্তৃতা করেন কিংবা যে ভাষায় সংসদের কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ হয় তা ‘সংসদের ভাষা’ নামে অভিহিত। সাধারণত রাষ্ট্রভাষাই সংসদের ভাষা হিসেবে ব্যবহূত হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ভাষা বাংলা। তবে কোনো সদস্য বাংলায় যথাযথভাবে বক্তব্য রাখতে অপারগ হলে স্পীকার তাঁকে ইংরেজিতে বক্তৃতা প্রদানের অনুমতি দিতে পারেন।

সংসদের কার্যবিবরণীর সরকারি রেকর্ড বাংলা ভাষায় সংরক্ষিত হয়। তবে স্পীকার প্রয়োজনবোধে কার্যবিবরণীর যেকোন অংশ বা উদ্ধৃতি ইংরেজি ভাষায় সংরক্ষণের অনুমতি দিতে পারেন। সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর  প্রথম অধিবেশনের সূচনায় এবং প্রত্যেক বছর সংসদ অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দান করবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দানের পূর্বে স্পীকারকে এ সম্পর্কে লিখিতভাবে জানান। স্পীকার ভাষণের তারিখ ও সময় ঠিক করে নির্দিষ্ট দিনের কার্যসূচিতে ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণ’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রদানের পর সংসদ-সদস্যগণ এ ভাষণের ওপর আলোচনা করেন। স্পীকার সংসদ নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য সময় বরাদ্দ করেন। সংসদের একজন সদস্য কর্তৃক উত্থাপিত এবং অন্য একজন  সদস্য কর্তৃক সমর্থিত একটি ধন্যবাদ প্রস্তাবের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি কোনো বাণী প্রেরণ করলে স্পীকার তা সংসদে পড়ে শোনান এবং তার ওপর আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংসদের যোগাযোগ ঘটে স্পীকারের মাধ্যমে।

জাতীয় সংসদের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৭৬(১) অনুচ্ছেদে তিন ধরনের স্থায়ী কমিটি সম্পর্কে উল্লেখ আছে: (ক) সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, (খ) বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও (গ) সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে নির্দিষ্ট অন্যান্য স্থায়ী কমিটি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি কমিটি রয়েছে, যেমন, কার্যউপদেষ্টা কমিটি, বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি, অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটি, সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি, বিল সম্পর্কিত বাছাই কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি, সংসদ কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি এবং বিশেষ কমিটি। সংসদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়োগ করা হয়। সংবিধানের বিধি অনুযায়ী কোনো বিল সম্পর্কিত বাছাই কমিটি, অথবা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে সংসদ কর্তৃক গঠিত কোনো বিশেষ কমিটি ব্যতীত অন্যান্য সকল কমিটির মেয়াদ সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত বলবৎ থাকে। তবে প্রয়োজনে সংসদ কর্তৃক কমিটি পুনর্গঠিত হয়।

কমিটির বৈঠকের জন্য মোট সদস্য সংখ্যার মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতিতে কোরাম হয়। বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সংখাগরিষ্ঠ ভোটে কমিটির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কোনো প্রশ্নে দু’পক্ষে সমসংখ্যক ভোটের ক্ষেত্রে সভাপতি অথবা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তি দ্বিতীয় বা নির্ণায়ক ভোট প্রদান করতে পারেন। কমিটিতে প্রেরিত কোনো বিষয় পরীক্ষা করে দেখার জন্য মূল কমিটির ক্ষমতাসম্পন্ন এক বা একাধিক সাব-কমিটি নিয়োগের বিধান আছে। সাব-কমিটিগুলোর রিপোর্ট মূল কমিটির কোনো বৈঠকে অনুমোদন লাভ করলে তা মূল কমিটির রিপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। কমিটির বৈঠকের দিন ও সময় সভাপতি নির্ধারণ করেন। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসদের সচিব দিন ও সময় ধার্য করতে পারেন। বিল সম্পর্কিত কোনো বাছাই কমিটির সভাপতি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না থাকলে সচিব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে দিন ও সময় ধার্য করে থাকেন। সংসদের সচিব পদাধিকার বলে প্রত্যেক কমিটির সচিব থাকেন, অথবা সংসদ সচিবালয়ের যেকোন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন। কমিটি প্রধানত দুভাগে বিন্যস্ত, সংসদীয় কমিটি ও মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি। এ কমিটিগুলোর প্রধান কাজ খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করা এবং বিভিন্ন বিলের উন্নয়ন সাধনের জন্য সুপারিশ করা। কমিটির মাধ্যমে সংসদ সরকারের কার্যকলাপ তদারকি করে। সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনা করে কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ বা প্রশাসন সম্পর্কে অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতা কমিটির রয়েছে। কমিটির কার্যকারিতার ওপর সংসদের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। কমিটি নিয়োগ এবং কমিটির ক্ষমতা ও কার্যাবলি সম্পর্কে জাতীয় সংসদের  কার্যপ্রণালী বিধিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সংসদে উত্থাপিত বিলের এক একটি স্বতন্ত্র অংশকে বলা হয় ক্লজ বা দফা। বিল পাস হওয়ার পর এগুলো আইনে পরিণত হয়। বিল সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর দফা অনুযায়ী বিলের ওপর আলোচনা হয়। স্পীকার ক্ষেত্রমতে দফা অনুযায়ী বিল সংসদে পেশ করেন। কমিটি পর্যায়ে বিলের ওপর দফাওয়ারী আলোচনা হয়। কমিটি প্রয়োজনবোধে দফায় পরিবর্তন বা নতুন দফা সংযোজন করতে পারে।

সংসদের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংসদ তার কার্যপ্রণালী বিধি প্রণয়ন করে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নিজস্ব কার্যপ্রণালী বিধি রয়েছে। কার্যপ্রণালী বিধিতে সংসদ আহবান, স্থগিতকরণ ও ভঙ্গকরণ এবং সদস্যবৃন্দের আসন ব্যবস্থা, শপথ ও তালিকা, স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারের নির্বাচন, সভাপতিমন্ডলীর মনোনয়ন, স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি, সংসদের বৈঠক, কার্যাবলি বিন্যাস, দিনের কার্যসূচি, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাণী, প্রশ্ন ও স্বল্পকালীন নোটিশের প্রশ্ন, বিভিন্ন বিষয়ের প্রস্তাব, আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন, পিটিশন, আর্থিক বিষয় সম্পর্কিত কার্যপদ্ধতি, সিদ্ধামত প্রস্তাব, সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, কমিটির কার্যপ্রণালী, সাধারণ কার্যপ্রণালী, সংসদ-সদস্যদের পালনীয় বিধি প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যাবলি দু’ধরনের, সরকারি কার্যাবলী ও বেসরকারি সদস্যদের কার্যাবলি। কোনো মন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত বিল, বাজেট, সিদ্ধামত প্রস্তাব, সংশোধনী ও অন্যান্য প্রস্তাবকে সরকারি কার্যাবলি হিসেবে গণ্য করা হয়। মন্ত্রী ব্যতীত সরকারি ও বেসরকারি দলের সদস্য কর্তৃক প্রস্তাবিত বিল, সিদ্ধামত প্রস্তাব, সংশোধনী ও অন্যান্য প্রস্তাব বেসরকারি সদস্যদের কার্যাবলি হিসেবে পরিগণিত। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন বেসরকারি সদস্যদের কার্যাবলির জন্য বরাদ্দ থাকে। অন্যান্য দিনে কেবল সরকারি কার্যাবলি সম্পাদিত হয়। সরকারি কার্যাবলি সংসদে প্রাধান্য পায় এবং এর জন্য অধিক সময় বরাদ্দ থাকে। কোনো বিশেষ ধরনের কাজের জন্য নির্ধারিত দিনে ওই  বিশেষ কাজটিই প্রাধান্য পায়। তবে প্রয়োজনবোধে স্পীকার সংসদ-নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে বেসরকারি সদস্যদের কার্যাবলির জন্য যেকোন দিন বরাদ্দ করতে পারেন। স্পীকারের নির্দেশ অনুযায়ী সংসদের সকল কার্যক্রম বিন্যস্ত হয়।

সংসদের সচিব নির্দিষ্ট দিনের জন্য একটি কার্যতালিকা প্রস্ত্তত করেন। স্পীকার কর্তৃক তা অনুমোদনের পর দিনের কাজ শুরু হওয়ার আগে কার্যতালিকার একটি করে প্রতিলিপি প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য সরবরাহ করা হয়। এ তালিকা দিনের কার্যসূচি বলে পরিচিত। কোনো দিনের কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয় নি এমন কোনো কাজ স্পীকারের অনুমতি ব্যতীত সম্পাদন করা যায় না। বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের জন্য বরাদ্দকৃত কোনো দিনের কার্যসূচিতে পাঁচটির বেশি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। তবে স্পীকারের নির্দেশে এ নিয়মের পরিবর্তন হতে পারে।

সংসদে-সদস্যদের  প্রশ্ন বা প্রস্তাব উত্থাপন করতে হলে পূর্বাহ্নে নোটিশ প্রদান করতে হয়। সদস্যগণ সচিবকে সম্বোধন করে লিখিতভাবে কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদে উত্থাপনীয় প্রশ্নের নোটিশ প্রদান করেন। যথাসময়ে প্রদত্ত নোটিশ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের প্রতিলিপি সচিব সদস্যদের নিকট প্রেরণ করেন। নোটিশের সঙ্গে প্রশ্নের একটি কপিও দিতে হয়। এ নোটিশ কমপক্ষে ১৫ দিন আগে পাঠাতে হয়। একজন সদস্য একদিনে দশটির বেশি প্রশ্নের নোটিশ দিতে পারেন না। প্রশ্নটি যদি কোনো মন্ত্রীকে করা হয় তবে স্পীকার মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে প্রশ্ন করার অনুমতি দিতে পারেন। কোনো নোটিশ স্পীকার কর্তৃক গৃহীত ও সদস্যদের মধ্যে প্রচারিত না হওয়া পর্যমত সংসদ-সদস্য বা অন্য কোনো ব্যক্তি তা প্রচার করতে পারেন না। সংসদে প্রশ্নের উত্তর প্রদান না হওয়া পর্যমত প্রশ্নের নোটিশ প্রচার করা যায় না। কোনো নোটিশ স্পীকারের নিকট বিতর্কমূলক, সংসদ-রীতিবিরোধী, শ্লেষাত্মক, অপ্রাসঙ্গিক, বাগাড়ম্বরপূর্ণ বা অন্য কোনো প্রকারে অনুপযোগী প্রতীয়মান হলে নোটিশটি প্রচারের পূর্বে নিজ ক্ষমতাবলে তিনি তা সংশোধন করতে পারেন। সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপনকারী বেসরকারি সদস্যকে কমপক্ষে দশ দিনের নোটিশ প্রদান করতে হয়। কোনো সদস্য একদিনে ২৫টির বেশি সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের নোটিশ দিতে পারেন না। সংসদ অধিবেশন চলাকালে বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০১ বিধিতে বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন, এ সম্পর্কে স্পীকারের করণীয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। যে কোনো সংসদ-সদস্য বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। তবে তা সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি এবং স্পীকারের ক্ষমতার অমতর্ভুক্ত বিষয় হতে হবে। সংসদের বিবেচনাধীন কোনো বিষয়ের ওপরই কেবল বৈধতার প্রশ্ন তোলা যায়। উত্থাপিত প্রশ্নটি বৈধতার কিনা তা নির্ধারণ করেন স্পীকার। বৈধতার প্রশ্ন নিয়ে কোনো বিতর্ক হয় না,  তবে স্পীকার সঙ্গত মনে করলে তার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে সদস্যদের  বক্তব্য শুনতে পারেন। সবশেষে স্পীকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

আইনের খসড়া বা প্রস্তাবকে বিল বলা হয়। আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংসদে আনীত প্রত্যেকটি প্রস্তাব বিল আকারে উত্থাপিত হয়। বিল দুই প্রকারের হতে পারে, সরকারি বিল ও বেসরকারি বিল। সরকারি বিল সংসদে উত্থাপন করেন মন্ত্রী। বেসরকারি বিল যে কোনো সংসদ-সদস্য উত্থাপন করেন। সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য প্রথমে অনুমতির প্রস্তাবসহ বিলের প্রতিলিপির সঙ্গে নোটিশ দিতে হয়। এরপর বিল গেজেটে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে বিলটি বিবেচনার জন্য গৃহীত হয় বা স্থায়ী কমিটি কিংবা বাছাই কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। এ পর্যায়ে বিলের ওপর সংশোধনী সম্পর্কে আলোচনা চলে। দফাওয়ারী আলোচনার পর বিলটি পাস হয়। কোনো বিল সংসদে গৃহীত হওয়ার পর স্পীকার তা সত্যায়িত করে সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করেন। বিলটি পেশ করার পনের দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দেন অথবা পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। সংসদ বিলটি পুনর্বিবেচনা এবং পাস করে রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপন করে। রাষ্ট্রপতি সাত দিনের মধ্যে তাতে সম্মতি দান করেন। রাষ্ট্রপতি বিলে সম্মতি দানে অসমর্থ হলে সাত দিন পর ধরে নেওয়া হয় যে তিনি সম্মতি দান করেছেন। তারপর বিলটি আইনে পরিণত হয়। তবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়। অর্থবিল রাষ্ট্রপতির সুপারিশ ব্যতীত সংসদে উত্থাপন করা যায় না। অর্থবিল সংসদে একবার পাস হলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাবার বিধান নেই।

অর্থবিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। কোনো বিল অর্থবিল কিনা এ প্রশ্নে স্পীকারের দেওয়া সার্টিফিকেট চূড়ামত বলে গৃহীত হয়। অর্থবিল বা অর্থব্যয় সংক্রান্ত বিলের উদ্যোক্তা সরকার। প্রতি বছর পরবর্তী বছরের জন্য সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে অর্থবিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। সংসদে উত্থাপনের পর যথানিয়মে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিলটি পাস করতে হয়। অর্থবিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য উপস্থাপিত হলে পনের দিনের মধ্যে তিনি বিলটিতে সম্মতি প্রদান করেন। রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদানে অসমর্থ হলে উক্ত মেয়াদের শেষে বিলটি আইনে পরিণত হয়।

প্রতি অর্থ বছরের শুরুতে সেই বছরের জন্য সরকারের  অনুমিত আয় ও ব্যয়ের একটি বিবৃতি সংসদে উত্থাপন করতে হয়। সাধারণত অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট উপস্থাপন করে থাকেন। বাজেটের অমতর্ভুক্ত থাকে পূর্ববর্তী বৎসরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, চলতি বছরের আয়-ব্যয়ের চিত্র এবং  চাহিদা পূরণের অর্থের বিবরণ। সংসদের যে অধিবেশনে বাজেট উপস্থাপিত হয় তা বাজেট অধিবেশন নামে অভিহিত। তিনটি স্তরে আলোচনা, বিতর্ক ও ভোটাভুটির পর অর্থবিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য প্রেরণ করা হয়। তবে দায়যুক্ত ব্যয় সম্পর্কিত মঞ্জুরি দাবিসমূহ সংসদের ভোটে দেওয়া যায় না। বাজেটের প্রত্যেক স্তরের ওপর বিতর্কের জন্য স্পীকার পৃথক পৃথক দিন বরাদ্দ করেন। সংবিধানের ৮৯(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ কর্তৃক মঞ্জুরি দাবি পাস হয়। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে মঞ্জুরি দাবিতে তার উল্লেখ থাকে। পরবর্তী ধাপে নির্দিষ্টকরণ বিল পাস হয়। রাষ্ট্রের সমুদয় অর্থ জমা থাকে সংযুক্ত তহবিলে। সংযুক্ত তহবিল বা সরকারি তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ করতে হলে সংসদের মাধ্যমে  তা নির্দিষ্ট করিয়ে নিতে হয়। সংসদ নির্দিষ্টকরণ বিল পাস করলেও অর্থ মঞ্জুরির পরিমাণ এবং মঞ্জুরির উদ্দেশ্য পরিবর্তন করতে পারে না এবং এ জাতীয় সংশোধনী প্রস্তাবও গ্রহণ করা যায় না।

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়, উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব বা বিলের ওপর সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কে সংসদ-সদস্যগণ নিজ নিজ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি ও অন্যের বক্তব্যের জবাবে পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন। বিতর্কের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বিতর্কের জন্য সময়ও নির্ধারিত রাখা হয়। বিতর্কের পরিণতিতে বিষয়টি ভোটে দেওয়া বা না দেওয়া অথবা প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জন করা হয়। সংসদীয় বিধি মোতাবেক সদস্যদের বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে হয়। সদস্যগণ স্পীকারের নিকট থেকে বক্তব্য রাখার অনুমতি গ্রহণ করেন। স্পীকার ক্রমানুসারে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেন। বির্তকের সময় স্পীকারকে সম্মানসূচক সম্বোধন করে বক্তব্য রাখতে হয়।

সাধারণত বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা স্পীকারের রুলিং-এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে বের হয়ে আসেন। সরকারি দলের সদস্যরাও ওয়াকআউট করতে পারেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে ওয়াকআউট সদস্যদের অধিকার বলে স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী দলের ঘন ঘন ওয়াকআউটের  নজির রয়েছে।

সংসদীয় পরিভাষায় ‘বয়কট’ শব্দের অর্থ সংসদ বর্জন। সংসদ সদস্যগণ সুনির্দিষ্ট দাবিতে অথবা স্পীকারের কোনো সিদ্ধামত বা রুলিং-এর প্রতিবাদে কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের  আন্দোলনের ভিত্তিতে সংসদের অধিবেশন বর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশে নববই দশকের পর থেকে বয়কট প্রবণতা লক্ষণীয়। জাতীয় সংসদে সমর্থক ও বিরুদ্ধ ভোটের ক্ষেত্রে ‘হাঁ’ এবং ‘না’ ব্যবহূত হয়।

জাতীয় সংসদের কার্য পরিচালনার জন্য নিজস্ব সচিবালয় রয়েছে। সংসদের বৈঠক আহবানের বিজ্ঞপ্তি, সদস্যদের তালিকা প্রণয়ন, দৈনন্দিন কার্যতালিকা প্রণয়ন, বৈঠকের সময়, প্রশ্ন, প্রস্তাব প্রভৃতির নোটিশ গ্রহণ, রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ প্রভৃতি নানাবিধ কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব ন্যস্ত সচিবালয়ের ওপর। সংসদ সচিবালয় সংসদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সরকারের অঙ্গ বা অধীন কোনো বিভাগ নয়। সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি সম্পর্কে জাতীয় সংসদ পৃথক আইন তৈরি করেছে। এ আইন অনুযায়ী সংসদ সচিবালয়ের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে এ যাবত নয়টি সংসদ গঠিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো বহুদলীয় সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ পদ্ধতির ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নি। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তিত হয়। ১৯৯১ সালে সংবিধানের  দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থা অনুযায়ী যেকোন সময় সংসদের সিদ্ধান্তক্রমে সরকার পরিবর্তনের বিধান থাকে। কিন্তু দ্বাদশ সংশোধনীতে এই বিধান পরিবর্তন করা হয় এবং সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সরকার পরিবর্তন না করার বিধান নিশ্চিত করা হয়।

সপ্তম জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু করা হয়। সংসদের অধিবেশন চলাকালে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে সংসদ-সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং তিনি তার জবাব দিয়ে থাকেন। প্রথম দিকে এই প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য সময় বরাদ্দ ছিল ১৫ মিনিট। পরে তা বাড়িয়ে ৩০ মিনিট করা হয়। সরকারি দলের সদস্যদের জন্য ১৫ মিনিট এবং বিরোধী দলের সদস্যদের জন্য ১৫ মিনিট করে সময় ধার্য করা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম সংসদের মেয়াদকাল ছিল ২ বছর ৬ মাস। এ সংসদ ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। দ্বিতীয় সংসদের মেয়াদকাল ছিল ২ বছর ১১ মাস। এ সংসদ কার্যকর ছিল ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল থেকে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যমত। তৃতীয় সংসদের মেয়াদকাল ১ বছর ৫ মাস, ১৯৮৬ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। চতুর্থ সংসদের মেয়াদকাল ২ বছর ৭ মাস, ১৯৮৮ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পঞ্চম সংসদের মেয়াদকাল ছিল ৪ বছর ৮ মাস, ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যমত। ষষ্ঠ সংসদ কার্যকর ছিল ১২ দিন, ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যমত। সপ্তম সংসদ ১৯৯৬ সালের ১৪ জুলাই থেকে শুরু করে ২০০১ সালের ১৩ জুলাই পর্যমত কার্যকর থেকে ৫ বছর মেয়াদকাল পূর্ণ করে। অষ্টম সংসদের মেয়াদকাল ছিল ৫ বছর, ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি।  [শাহীদা আখতার]