জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল ১৯০৬


জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল (১৯০৬)  ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দান করার উদ্দেশ্যে এ আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটে অধিকতর সংখ্যায় শ্বেতাঙ্গ সদস্য মনোনীত করে এগুলিকে পুনর্গঠন করা হয়। সরকার সাম্প্রতিককালে গজিয়ে ওঠা বহু বেসরকারি কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এগুলিকে জাতীয় আন্দোলনের লালনভূমিরূপে বিবেচনা করা হয়েছিল। উভয় পদক্ষেপই ছিল শিক্ষাকে বিজাতীয়করণের উদ্দেশ্যে সতর্কতার সঙ্গে গৃহীত প্রচেষ্টা। এ পদক্ষেপ বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী ‘ভদ্রলোকদের’ সক্রিয় করে তুলেছিল।

এরপর আসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল স্বদেশী, বর্জন ও জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন। ১৬ নভেম্বর জমিদার সমিতি পার্ক স্ট্রিটে এক সভার আয়োজন করে। ওই  সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ ১৫০০ প্রতিনিধি এতে যোগ দেন। এখানেই জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিলের বিষয়টি আলোচনার জন্য উত্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ, নীপেন্দ্র চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় ও বিনয়কুমার সরকার ছিলেন স্বদেশী ও শিক্ষা বর্জন আন্দোলনের পুরোধা। রংপুরের ১৯০৫ সালের ৩ নভেম্বরের ঘটনা এ বর্জন আন্দোলনকে তীব্র করে তুলেছিল। সকল ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরকে স্বদেশী আন্দোলন-এ ছাত্রদের অংশগ্রহণ প্রতিরোধের নির্দেশ সম্বলিত ১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবরের কুখ্যাত ’কার্লাইল ইশতেহার’ জারির অব্যবহিত পরে এটা ঘটে। রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় এ ইশতেহারকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। কলকাতা যখন অসন্তোষে ফেটে পড়ছিল তখন এ সার্কুলারের বিরুদ্ধে রংপুর জেলা স্কুলের ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং কলকাতার ২৪ অক্টোবরের সভায় গৃহীত স্বদেশী ও বর্জন কর্মসূচির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে এ স্কুলের ছাত্ররা সার্কুলারকে অমান্য করে ‘বন্দে মাতরম’ গান গায়। রংপুরের ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের জরিমানা করেন এবং জরিমানা আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের ওপর বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখেন। তিনি স্কুল বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দেন। যদিও অভিভাবকরা জরিমানা দেননি এবং ছাত্ররা স্কুলে যোগদান থেকেও বিরত ছিল। এ খবর ৪ নভেম্বর কলকাতায় পৌঁছে। কলেজ স্কোয়ারে নরেশ সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে এক জনসভা আহবান করা হয় এবং অন্যান্যদের সঙ্গে সতীশ মুখোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতা, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, মৌলভী লিয়াকত হোসেন এ সভায় যোগদান করেন। এতে ইশতেহার বিরোধী সমিতি গঠন করা হয় এবং রমাকান্ত রায় ও শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু রংপুরে ছুটে যান।

৭ নভেম্বর রংপুরের অধিবাসীরা একটি সম্মেলন করেন। ৮ নভেম্বর রংপুরে প্রথম জাতীয় বিদ্যালয় চালু করা হয়। সাধারণ ও কারিগরি বিষয়ে দেশীয় শিক্ষাদান ছিল এর উদ্দেশ্য। জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে আন্দোলন আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ’জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। ইতোমধ্যে মাদারীপুর হাইস্কুলের ছাত্রদের বেত্রাঘাতের আদেশ এবং প্রধান শিক্ষক কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যান জনগণের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করে। ১৯০৫ সালের ৯ নভেম্বর অ্যাকাডেমিক ক্লাবের মাঠে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলায় একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুবোধচন্দ্র বসুমল্লিক এক লক্ষ টাকা দানের অঙ্গীকার করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করার জন্য আশুতোষ চৌধুরীর আহবানে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ১৬ নভেম্বর বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সম্মেলনে যোগদানের আহবান জানানো হয়। এ সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল সর্বভারতীয় পর্যায়ে এবং জাতীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার উৎকর্ষের জন্য জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা। এ সভায় গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীশ মুখোপাধ্যায়, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আশুতোষ চৌধুরী, রাসবিহারী ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারকনাথ পালিত, চিত্তরঞ্জন দাশ, আবদুর রসুল, এম. ইস্পাহানি, নীলরতন সরকারের মতো বাংলার সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যোগদান করেন। রাজা সুবোধ মল্লিকের ১ লক্ষ টাকা ছাড়াও গৌরীপুরের ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ৫ লক্ষ টাকা দান করেছিলেন। প্রায় দেড় হাজার লোকের এ সমাবেশে জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল ১৪ আগস্ট, ১৯০৬ সালে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এবং এর সহযোগী সংস্থা সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব টেকনিক্যাল এডুকেশন একই বছর ২৫ জুলাই বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল বৈজ্ঞানিক, পেশাগত ও কারিগরি শিক্ষাদানের জন্য বাংলায় বিশেষত পূর্ব বাংলায় অধিকাংশ জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। কলকাতায় বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল ছাত্র আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলেও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট উন্নতি করতে থাকে। ১৯১০ সাল নাগাদ সংস্থা দুটির পার্থক্য বিদূরিত হয়। ততোদিনে তারকনাথ পালিত সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব টেকনিক্যাল এডুকেশন থেকে তাঁর পুরো অনুদান প্রত্যাহার করে তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্স’কে দান করেন। সে সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ১৯২৮ সালে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিলের কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির সঙ্গে একীভূত হয়। কলা ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষাক্রম নিয়ে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ তখনও টিকে ছিল। সে সময় থেকেই কলেজ দুটির শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে এবং নামকরা শিক্ষকদের অধীনে বহুসংখ্যক ছাত্র এখানে শিক্ষালাভ করতে থাকে।

১৯৫৬ সালে এ দুটি প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি জাতীয় প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ে পরিণত হয়ে সমগ্র ভারতে এবং বিদেশে প্রকৌশলিদের ছড়িয়ে দিয়েছিল। এ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারীরা বাংলায় বহু স্বদেশী শিল্পোদ্যোগ গ্রহণ করেছিল যার কয়েকটি এখনও টিকে আছে। কলা ও বিজ্ঞান কলেজও সুখ্যাতি অর্জন করে এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এ ভাবেই ১৯০৫-১৯১১ সালের উত্তাল বছরগুলিতে জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল যে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার সন্ধান করছিল তা পূর্ণতা লাভ করে। [চিত্তব্রত পালিত]