জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ


জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় জাতীয় নীতি ও উদ্দেশ্য সম্বলিত উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। এ পরিষদ কর্তৃক প্রণীত লক্ষ ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী সাধারণত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নিজ নিজ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করে। মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্য এ পরিষদের সদস্য থাকেন। প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার প্রধান পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন। প্রয়োজন মাফিক পরিষদের সভা আহবান করা হয়। কোনো নির্দিষ্ট সভার আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্ব বা প্রকৃতি অনুসারে সভায় কারা উপস্থিত থাকবেন তা নির্ধারিত হয়। প্রথম পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এনইসির সচিবালয় হিসেবে কাজ করত। পরবর্তীকালে এ সচিবালয় পরিকল্পনা কমিশনে স্থানান্তরিত হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে: (১) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও সকল অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে সামগ্রিক দিগনির্দেশনা দান; (২) নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদন; (৩) উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা; (৪) আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিবেচ্য সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ; (৫) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের দায়িত্ব সম্পাদনের ক্ষেত্রে সহায়তা  প্রদানের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কমিটি নিয়োগ করা।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৯৮২ সালে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির গঠন কাঠামো ও কার্যাবলি নিরূপণ করা হয়। ওই  প্রস্তাবের ফলে এ সম্পর্কিত পূর্ববর্তী সকল আদেশ বাতিল হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীকে আহবায়ক করে এ কমিটি গঠিত হয়। কমিটিতে আরও ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, পূর্তমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিগণ।

কমিটির বিবেচ্য বিষয়াবলি ছিল: (১) পাঁচ কোটি টাকার উর্ধ্বে ব্যয়সাপেক্ষ উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ যাচাই ও অনুমোদন; (২) বেসরকারি খাতে ১৫ কোটি টাকার উর্ধ্বে ব্যয়সাপেক্ষ বিনিয়োগ প্রকল্পসমূহ যাচাই ও অনুমোদন; (৩) উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা; (৪) বেসরকারি, যৌথ উদ্যোগ ও বিদেশি অংশগ্রহণে গঠিত কোম্পানিসমূহের বিনিয়োগ প্রস্তাব যাচাই; (৫) অর্থনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট নীতিগত ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যালোচনা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অগ্রগতি সাধন; (৬) সংবিধিবদ্ধ কর্পোরেশনের অর্থনৈতিক কর্ম সম্পাদন এবং বিশেষত এদের কর্মকান্ডের ফলাফল পর্যালোচনা; (৭) সরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপন্ন পণ্যাদির মূল্য এবং সরকারি সেবা খাতের রেট, ফি ইত্যাদি নির্ধারণ।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যবর্গ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং অর্থ, বৈদেশিক সম্পদ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও মনিটরিং বিভাগের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিবগণকে কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হতো। ওই  সময় দেশে সামরিক শাসন চালু থাকায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও জেনারেল স্টাফ অফিসার এবং চিফ অফ জেনারেল স্টাফকেও একনেকের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হতো। ১৯৮২ সালের পর থেকে একনেকের কাঠামো ও কার্যাবলিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে। তৎকালীন প্রশাসন ব্যবস্থার প্রকৃতির উপর নির্ভর করে কাঠামো সংক্রান্ত পরিবর্তন করা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে একনেকের আহবায়কের পদে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের স্থলাভিষিক্ত হন উপ-প্রধানমন্ত্রী। অনুরূপভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও একনেকের কাঠামোতে যথাযথ পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে একনেকের সভাপতি হন অর্থমন্ত্রী। সে বছর অক্টোবরে এর সভাপতি হন সরকার প্রধান। ২০০০ সালের জানুয়ারিতে জারিকৃত সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে একনেকের সদস্য তালিকা থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রী/ প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী একনেকের সভাপতি এবং অর্থমন্ত্রী বিকল্প সভাপতি। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী। যেসব মন্ত্রণালয়ের বিষয় কমিটিতে আলোচিত হয় সেসব দপ্তরের মন্ত্রীরাও একনেকের সদস্য থাকেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, বৈদেশিক সম্পদ বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা সচিব, বাস্তবায়ন মনিটরিং ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্যবর্গ ও সচিবগণকে একনেকের কাজে সহায়তা করতে হয়।

একনেকের বর্তমান বিবেচ্য বিষয়াবলি হচ্ছে: (১) সকল প্রকল্প পরিকল্পনাপত্র যাচাই ও অনুমোদন; (২) প্রকল্প মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত ৫ কোটি টাকার উর্ধ্বে ব্যয়সাপেক্ষ সকল প্রকল্প যাচাই ও অনুমোদন; (৩) উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা; (৪) বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের বিনিয়োগ প্রকল্পসমূহ যাচাই; (৫) দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তত্ত্বাবধান ও নীতিমালা পর্যালোচনা; (৬) সরকারি বিধিবদ্ধ কর্পোরেশনসমূহের আর্থিক কর্মসূচি পর্যালোচনা; (৭) সরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপন্ন পণ্যাদির মূল্য এবং সরকারি সেবা খাতের রেট, ফি ইত্যাদি নির্ধারণ; এবং (৮) বৈদেশিক সাহায্য ও ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপ বিবেচনা এবং জনশক্তি রপ্তানির ব্যাপারে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহের লক্ষ্য নির্ধারণ ও এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যালোচনা।  [এ.এম.এম শওকত আলী]