জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা


জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা  প্রথাগত আইনের আওতায় কোনো মামলায় বাদী-বিবাদীর মধ্যে বিচার বিভাগীয় আদালতের বিচারকগণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তারা কোনো পক্ষের সমর্থক হয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন না। কোনো মামলার ক্ষেত্রে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির করা আবেদনের বাইরে আদালত কোনো ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ বা আদেশ দিতে পারেন না। অন্যদিকে অ্যাংলো-স্যাক্সন মানবিক আইনের বিচারে শুধুমাত্র স্থিতি-অধিকার রয়েছে এমন কোনো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আইনের অধীনে আদালতে কোনো মামলা করতে বা প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারবে, অন্যথায় কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয় সে কোনো প্রকার প্রতিকার চাইতে পারে না। স্থিতি-অধিকারের এই আইনটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার নীতির (laissez faire) সাথে সংশ্লিষ্ট যেখানে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে অভ্যন্তরীণ আইন এবং শাসন বজায় রাখা এবং বাইরের আগ্রাসন থেকে রাষ্ট্রীয় সীমাকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজনে স্বল্প পরিসরে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তবে এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে যে গ্রহণ করতেই হবে এমন নয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের সরকার কাঠামোয় কল্যাণমূলক অর্থনীতির ধারা প্রবর্তনের সাথে সাথে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতা অপব্যবহারের নানাবিধ প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে দেখা যায়, যার প্রভাব একসময় জনগণের উপর পড়তে শুরু করে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে নেয়া কর্মসূচীতে ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারের প্রবণতা দূর করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ আদালত স্থিতি-অধিকারের আইনের উদারীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

বাংলাদেশে স্থিতি-অধিকারের আইনের উদারীকরণের মাধ্যমে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা কার্যকর হয়। এই ঘটনার বহু পরে বিশেষ করে বেরুবাড়ী রীটের আবেদনকারী একজন আইনজীবি কাজী মোকলেসুর রহমান বনাম বাংলাদেশ (২৬ ডিএলআর (এডি) ৪৪) মামলার মাধ্যমে, যা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ এবং ভারত দ’ুদেশের মধ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভূমি সীমারেখা তৈরী সংক্রান্ত দিল্লি চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা হয়। এই মামলার মাধ্যমে কোনো আবেদনকারীর স্থিতি-অধিকারের ধারণাটি প্রথমবারের মতো উঠে আসে।

এই বিচারের মামলায় আদালতে বলা হয়: ‘‘এটা সবার কাছে বোধগম্য যে, স্থিতি-অধিকারের বিষয়টি কোনো ব্যক্তির আপিলের উপর আদালতের শুনানীর এখতিয়ারের সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং কোনো ব্যক্তির আদালতে শুনানীর লক্ষ্যে আবেদন করার সামর্থ্য অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। এখানে তাই বিবেচনার বিষয় হচ্ছে প্রকৃত ঘটনা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে উভয় মামলার ক্ষেত্রে আদালত কোন ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।’’

কিন্তু পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি মামলায় আদালত স্থিতি-অধিকারের পুরনো রীতি অনুযায়ী রায় প্রদান করে।

১৯৯৬ সালে পরিবেশ আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মহিউদ্দিন ফারুকের দায়েরকৃত ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান মামলায় আপীল বিভাগ কর্তৃক স্থিতি-অধিকার প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়। এতে বলা হয়, কোনো নির্বিশেষ অন্যায়, নির্বিশেষ অনিষ্ট অথবা অনির্দিষ্ট সংখ্যক লোক বা কোনো নাগরিক বা দেশিয় সংগঠনের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত যেকোন ব্যক্তির স্থিতি-অধিকার রয়েছে। এ সিদ্ধান্তের আগে ও পরে পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়্যার্স্ অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, মহিলা পরিষদ এবং জন-অধিকার সম্পর্কে সচেতন এমন কিছু ব্যক্তি, অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দুর্দশা মোচনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা দায়ের করে।

১৯৯৬ সালে স্থিতি-অধিকার উদারীকরণের পর জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু মামলা ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক নিষ্পন্ন করা হয়। ফ্লাড অ্যাকশন মামলায় বন্যা প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নকালে পরিবেশ ও বাস্ত্তসংস্থান প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিতে এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান পালন করতে সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়। ১৯৯৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে উত্তরা মডেল টাউনে পার্ক ও অন্যান্য সাধারণ সুবিধার জন্য নির্ধারিত ভূমির পরিমাণ হ্রাস করে তা আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্লটের অন্তর্ভুক্তকরণ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়। এর আগে এক মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ঘোষণা করে যে, ঢাকা শহরের গুলশান আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য প্রতিরক্ষার জন্য উক্ত এলাকার পার্ক জঞ্জালমুক্ত রাখতে হবে। এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগ জেলখানায় আটক একজন বন্দির ডান্ডাবেড়ি অপসারণের নির্দেশ দেয় এবং হাতকড়ায় আবদ্ধ একজন মহিলাকে তথাকথিত নিরাপদ হেফাজত থেকে মুক্ত করে। আদালতের আদেশে ঢাকা শহরে গাড়ি পার্ক করার জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাজারের ভবন নির্মাণ, লেক ভরাটকরণ এবং বস্তিবাসীদের উচ্ছেদও স্থগিত করা হয়।

সম্প্রতি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দুটি মামলায় আপিল বিভাগ আবেদনকারীর স্থিতি-অধিকারের উপর দুটি বিপরীতমুখী মত প্রকাশ করে। এর প্রথমটি হচ্ছে ব্রাক বনাম অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মামলা ((২০০২)বিএলডি(এডি)৪১) যেখানে বলা হয় যে, আবেদনকারীর কোনো ব্যাংকের সাথে অথবা ব্যাংকিং কোম্পানি সমূহের উন্নতির উদ্দেশ্যে ভূমিকা রাখে এমন সংস্থার সাথে এমন কোনো সম্পর্ক নেই বা ব্যাংক কর্তৃক তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমনও নয় অথবা এ জাতীয় কোনো সংস্থা কর্তৃক দেয়া কোনো আদেশের বিরুদ্ধে তার কোনো বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণের আবেদন অথবা ব্রাক ব্যাংকের বিরুদ্ধে তার অভিযোগপত্র রয়েছে এমনও নয়। কিন্তু পরবর্তী একটি মামলায় আদালত এই মামলার রায় বিবেচনায় না এনে ভিন্নধর্মী মত প্রকাশ করে। ইটিভি লিঃ বনাম ডঃ চৌধুরী মাহমুদ হাসানের ((২০০২)৫৪ ডিএলআর (এডি)১৩০) মামলায় আপিল বিভাগ এই রায় প্রদান করে যে, আবেদনকারী সমাজের একজন সচেতন নাগরিক এবং জনগণের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের প্রতিবাদে আগ্রহ থাকার কারণে, বিবাদী কর্তৃক জনগণের স্বার্থ পরিপন্থী কার্য সম্পাদিত হওয়ার কারণে, এবং এর দ্বারা অস্বচ্ছতা এবং চুক্তিবিরোধী কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের কারণে আদালতের কর্তব্য হচ্ছে এই ধরনের আইন ভঙ্গকারী বিষয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যেখানে অন্য সম্প্রচারকারী প্রতিযোগীরা ইটিভি লিঃ -এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে কোনো আবেদন পেশ করছে না। ইটিভি মামলায় এই বিপরীতধর্মী সিদ্ধান্ত প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ব্রাক ব্যাংক মামলার বিষয়টি পুনঃবিবেচনায় আনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে, যা এখনও নিষ্পত্তি হয় নি।

স্থিতি-অধিকার উদারীকরণের প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা দায়েরের মাধ্যমে নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অবস্থার উন্নয়ন এবং দুর্ভোগ মোচনের দ্বারা সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের বিষয়টি তাদের জীবনে বাস্তব করে তোলার বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সে সঙ্গে এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে, কেউ কেউ জন-অধিকার সচেতন ব্যক্তির ছদ্মপরিচয়ে অনর্থক অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে আদালতে যথেচ্ছ মামলা দায়েরের প্রয়াস নিতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগ এমনিতেই অসংখ্য মামলায় আকীর্ণ হয়ে আছে এবং মামলা নিষ্পত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় মামলা দায়েরের ফলে হাইকোর্ট বিভাগ অযথা আরও ভারগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে এবং এর ফলে মামলায় জড়িত জনগণের দুর্গতি আরও বৃদ্ধি পাবার আশঙ্কা রয়েছে। মামলার প্রারম্ভেই আদালত বিশেষভাবে সতর্ক থাকলে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলার মাধ্যমে প্রতিকার প্রার্থী সকল আবেদনকারীর সদুদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবেদনের যথার্থতা পরীক্ষা করে দেখলে এ সঙ্কট প্রতিহত করা যেতে পারে। কিন্তু ইটিভি মামলায় আপিল বিভাগের রায় প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অনেকেই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলার নামে হাইকোর্ট ডিভিশনে মামলা করে এবং তাদের অপ্রয়োজনীয় এজেন্ডা দ্বারা আদালতে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি করে, যেখানে তালিকা ভুক্ত মামলার ভারে এই আদালত এমনিতেই ভারাক্রান্ত। এক্ষেত্রে আপিল বিভাগের কর্তব্য হচ্ছে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়টির প্রতারণামূলক ব্যবহার রোধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে অপ্রয়োজনীয় মামলার ভারে আদালতের গতি স্তিমিত না হয়ে যায়। আপিল বিভাগ এজন্য জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার কতটুকু সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করলে এর অপব্যবহার অনেকটা রোধ করা যাবে বলা যায়। এক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বালকো এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এআইআর ২০০১ এসসি উইকলি ৫১৩৫) মামলার কথা বলা যায়, যেখানে আবেদনকারীর করা মামলা যদি খারিজ হয়ে যায় সেজন্য আগেই অন্যপক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে বাদীকে বাধ্য করা হয়।  [কাজী এবাদুল হক]