জনসংযোগ


জনসংযোগ  সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সুনাম বৃদ্ধির জন্য, ওই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট ‘জন’ যথা শ্রমিক, কর্মচারী ও ক্রেতাসহ সমাজের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিব©র্গর সাথে সম্পর্ক উন্নত রাখার প্রক্রিয়া। জনসংযোগ হচ্ছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত প্রকৃত ঘটনাভিত্তিক উদ্দেশ্যমূলক একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া। সামপ্রতিক মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে জনসংযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এ বিষয়টি মানুষের কর্মকান্ডের সকল ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার পাশাপাশি তাদের সেবা ও বাণিজ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে জনসংযোগ কর্মী নিয়োগ করে থাকে। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে (পিআরও) তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও রক্ষার জন্য জনসংযোগ কর্মসূচি প্রণয়ন, সংগঠন ও সমন্বয় করতে হয়। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যাবলি সম্পাদনসহ এ সকল দায়িত্ব পালনে নিজ সংগঠনের প্রতিটি ব্যক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।

‘জনসংযোগ’ শব্দটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ১৮০৭ সালে তাঁর কংগ্রেস ভাষণের খসড়ায় প্রথম ব্যবহার করেন। তখন থেকেই জনসংযোগ একটি আধুনিক, জরুরী এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে। একটি সৃজনশীল ও কূশলী বিদ্যা হিসেবে ‘জনসংযোগ’ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পেতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বহু স্থানে ‘জনসংযোগ’ একটি পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

জনসংযোগ কর্ম সম্পাদনের জন্য ব্রিটিশ সরকার বিশ শতকের চল্লিশের দশকে ভারতে সেণ্ট্রাল পাবলিসিটি বোর্ড গঠন করে। এর আগে বেসরকারি খাতে টাটা স্টিল অ্যান্ড আয়রন শ্রমিকদের সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্য নিয়ে প্রথম জনসংযোগ কর্মসূচি চালু করে। এছাড়া ইন্ডিয়ান রেলওয়ে বিক্রয় উন্নয়ন প্রচারাভিযান জোরদার করতে এবং যাত্রী সেবার মান বাড়াতে জনসংযোগ কর্মসূচি হাতে নেয়। ভারতে সরকারের কেন্দ্রীয় প্রচার বোর্ডের নাম ১৯২১ সালে বদলে রাখা হয় সেন্ট্রাল বোর্ড অব ইনফরমেশন। ১৯২৩ সালে পুনরায় এ দফতরের নাম রাখা হয় ডাইরেক্টরেট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন। ১৯৩১ সালে এটি ডাইরেক্টরেট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং হিসেবে রূপান্তরিত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রাজত্বের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সংস্থাটি দেশব্যাপী জনসংযোগ কর্মসূচি চালু করে। ব্রিটিশ সরকার এ সময় ভারতে ওয়ার পারপাসেজ এক্সিবিশন ইউনিট এবং সেণ্ট্রাল ব্যুরো অব পাবলিক ইনফরমেশন গঠন করেছিল। এ সকল দপ্তর কর্তৃক নিজেদের প্রচারসামগ্রী হিসেবে প্রদর্শনীর জন্য কয়েকটি তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য অধিদপ্তর, বেতার, ফিল্ম ডিভিশন এবং ফিল্ম পাবলিসিটি অফিসগুলোর মাধ্যমে সরকারের জনসংযোগ কর্মসূচি জোরদারের প্রচেষ্টা নেয়। পরে সরকার কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিসের কাঠামোর আওতায় সেণ্ট্রাল ইনফরমেশন সার্ভিস গঠন করে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থা এবং মন্ত্রণালয়গুলোর জনসংযোগের দায়িত্ব এই ক্যাডারের অফিসার ও পেশাদার জনসংযোগবিদদের দেয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা এবং তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের তথ্য ক্যাডার গঠিত হয়। এরপর থেকে সম্মিলিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে তথ্য ক্যাডার অফিসারদের বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নিয়োগের পরপরই তাদের তিন মাসের পেশাগত প্রশিক্ষণ কোর্স সমাপ্ত করতে হয়। পরে এদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির জনসংযোগ কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়। আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো এবং সেক্টর কর্পোরেশনে দায়িত্বের জন্য নিয়োজিত করা হয় পেশাদার জনসংযোগকর্মীদের। ১৯৫৮ সালে এই ভূখন্ডে সর্বপ্রথম পৃথক জনসংযোগ পরিদপ্তর গড়ে তোলে পূর্ব পাকিস্তান ওয়াপদা (পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)। বর্তমানে বাংলাদেশের সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং প্রায় তিনশ আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থায় জনসংযোগ কাঠামো গড়ে উঠেছে।

বিশ্বের পেশাদার জনসংযোগবিদরা নিজেদের সংগঠিত করে ১৯৫৫ সালে আন্তর্জাতিক জনসংযোগ সমিতি গঠন করেন এবং ১৯৬১ সালে একটি আচরণবিধি চুড়ান্ত করেন। ১৯৬৫ সালের মে মাসে এথেন্সে আন্তর্জাতিক জনসংযোগ সমিতির সাধারণ সভায় জনসংযোগের নীতিমালা প্রণীত হয়। কোড অব এথেন্স নামে খ্যাত এই নীতিমালা ১৯৬৮ সালে তেহরানে সমিতির কাউন্সিল সভায় সংশোধিত ও যুগোপযোগী করার পর পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের জাতীয় জনসংযোগ সমিতিগুলো কর্তৃক গৃহীত হয়। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতি গঠিত হয় এবং ওই বছরেই অনুষ্ঠিত সমিতির প্রথম জাতীয় সম্মেলনে এই নীতিমালা গৃহীত হয়।

স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোকে বিদ্যমান গণমাধ্যম ও সম্পদের সহায়তায় জনসংযোগ কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশ প্রদান করে। বাংলাদেশে বিবিধ প্রকার জনসংযোগ কর্মসূচি চালু রয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় এনে জনসংযোগ কর্মকর্তারা এগুলোর পরিকল্পনা করে থাকেন। তারা শাসনকার্যে জনসমর্থন ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা, কর্মসূচি, নীতি ও কার্যক্রম এবং সেগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে থাকেন। জনসংযোগ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি লোকজ মাধ্যমসমূহ তথা আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া ব্যবহূত হয়। কারণ, দেশের অধিকাংশ জনগণের, এমনকি নগরবাসীদেরও অনেকের সংবাদপত্র, সাময়িকী, পুস্তিকা এবং অন্যান্য মুদ্রণ সামগ্রীর প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। সাম্প্রতিক কয়েকটি সমীক্ষায় দেখা যায়, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মাত্র শতকরা সাত ভাগ লোকের সাথে মুদ্রণ মাধ্যমে জনসংযোগ ঘটে থাকে। ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশে মিডিয়া তালিকাভুক্ত ২৪৬টি দৈনিক সংবাদপত্র, ১২৮টি সাপ্তাহিক এবং ৬১টি অন্যান্য সাময়িকী ছিল। এগুলোর সর্বমোট প্রচারসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ লক্ষ ৪৫ হাজার। সরকার নিয়ন্ত্রিত দুটি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র এলাকা থেকে দেখা ও শোনা যায়। বিটিভি ওয়ার্ল্ড ও বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের অনুষ্ঠানে শ্রোতা-দর্শক বিশ্বব্যাপী। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টেশন এবং দেশের অন্যত্র ১৫টি সাব-স্টেশন রয়েছে। অবশ্য টেলিভিশনের প্রচার আওতার অনুপাতে দর্শক সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ২০০০ সাল পর্যন্ত এদেশে টিভি দর্শকের সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি মাত্র। পরবর্তীকালে দেশে বেসরকারী স্যাটেলাইট কেবল টিভির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিদেশি চ্যানেলসমূহ কেবল টিভিতে যুক্ত হওয়ায় টিভি দর্শকের সংখ্যা অনেক বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সাল নাগাদ দেখা যায়, একমাত্র ঢাকা থেকে ১২টি বেসরকারী কেবল টিভি চ্যানেল বাংলায় খবর ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। তুলনামুলকভাবে, বাংলাদেশ বেতারের শ্রোতার সংখ্যা দেশ-বিদেশ মিলিয়ে অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ১২টি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র এবং ৬টি ইউনিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতার দৈনিক ২৪৪ ঘন্টারও বেশি অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। প্রতি ঘন্টার সংবাদসহ প্রতিদিন ৬৭টি সংবাদ বুলেটিন বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত হয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে সস্তা রিসিভার ও সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক সম্পন্ন কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেতারের জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে। ২০০৯ সাল নাগাদ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মেট্রোপলিটান এলাকায় ৪টি বেসরকারী এফ এম বাণিজ্যিক রেডিও নেটওয়ার্ক চালু হয়। সংবাদ ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় বেসরকারী এফ এম বেতার সম্প্রচারের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসাথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইদানীং জনসংযোগ কর্মসূচিতে ভিডিও মাধ্যমটির চাইতে ডিজিটাল প্রযুক্তি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত সস্তা, সহজতর ও দ্রুততর নির্মাণ পদ্ধতি এবং দেশে সহজলভ্য সকল কারিগরি সুবিধা থাকায় এ মাধ্যমটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলসমূহ চালু হওয়ায় ভিডিও মাধ্যমটির প্রসার বেড়েছে। এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার জনসংযোগ বিভাগ এই মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ-মূলক অনুষ্ঠান ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছে। ইন্টারনেট এবং ই-মেইল সার্ভিসও এখন দেশের প্রয়োজনীয় জনসংযোগ উপকরণে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয় এবং কালক্রমে অনেক সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যকর ও স্বচ্ছ জনসংযোগের লক্ষ্যে বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ নিজস্ব ওয়েবসাইট স্থাপন করে। নতুন শতাব্দীর সূচনালগ্নে জনসংযোগের হাতিয়ার হিসেবে ‘ব্লগ’ও বেশ জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্র মাধ্যমটি দীর্ঘদিন ধরে জনসংযোগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে। নিরক্ষর জনগণকে সামনে রেখে ফলপ্রসূ জনসংযোগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে চলচিত্র মাধ্যম অনন্য, তবে ব্যয়বহুল। ঢাকায় অবস্থিত দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলাদেশ চলচিত্র উন্নয়ন সংস্থা। এছাড়া রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর।  জনসংযোগবিদদের প্রায়ই এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে হয়। চলচিত্র নির্মাণ শেষ হয়ে গেলে তা প্রদর্শনের পূর্বে বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।

সরকারের চলচ্চিত্র ইউনিট এবং প্রকাশনা বিভাগ একত্রে পুনর্গঠিত হয়ে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর নামে কাজ শুরু করে। এই অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্ব হলো, সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পর্কে নিউজ-রিল সংবাদচিত্র তৈরি, বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি সম্পর্কে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ। এছাড়া এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের জনসংযোগ কর্মসূচির আওতায় পোস্টার, পুস্তিকা, বই, সাময়িকী ইত্যাদি প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করে থাকে।

বাংলাদেশ সরকারের নীতি, কর্মসূচি, উদ্যোগ ও পরিকল্পনাসহ সামগ্রিক কর্মকান্ড সম্পর্কে তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) গণমাধ্যমসমূহে তথ্য প্রদান ও জনগণের সাথে যোগাযোগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে। তথ্য অধিদফতর ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন সংবাদ ও সংবাদচিত্র এবং জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে ফিচার নিবন্ধ বিতরণ করে থাকে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পিআইডির কর্মকর্তাগণ জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তারা সরকারকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনমত সম্পর্কে অবহিত রাখেন। এছাড়া তথ্য অধিদফতরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানীয় এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডও প্রদান করে থাকে।

বাংলাদেশে সরকারের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর। ১৯৭২ সালে পাকিস্তান আমলে গঠিত ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ম পাবলিসিটি, পাকিস্তান কাউন্সিল, ব্যুরো অব ন্যাশনাল রি-কনস্ট্রাকশন এবং মহিলা উন্নয়ন উইং-এর সমন্বয়ে গঠিত এই অধিদপ্তরটির নেটওয়ার্ক দেশব্যাপী বিস্তৃত। সকল জেলা সদর এবং কয়েকটি নির্বাচিত উপজেলায় এই অধিদপ্তরের কার্যালয় রয়েছে। এ সকল অফিসে রয়েছে পল্লী অঞ্চলসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে সহজে বহনযোগ্য অনেক ইউনিট। এ সকল ইউনিটে সিনেমা, ভিডিও প্রজেক্টর ও জেনারেটর সংযুক্ত ভ্যান রয়েছে। এগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে চলচিত্র প্রদর্শনী, সভা সমাবেশ ও সেমিনার অনুষ্ঠান, লোকজ গান ও নাটক অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহূত হয়। চলচিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের নির্মিত চলচিত্রসমূহও এ সকল ইউনিট প্রদর্শন করে থাকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা ও উজ্জ্বল করা এবং বিদেশে রাষ্ট্রের পক্ষে জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করে থাকে। ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে তথ্য মন্ত্রণালয় দেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সেক্টর কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে ও জনসংযোগ কার্যক্রমকে জোরদার করতে একটি নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বিতরণকৃত এ নির্দেশিকায় বলা হয় যে, জনসংযোগকে অবশ্যই একটি বিশেষজ্ঞ পেশা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং এ কাজে নিয়োগের জন্য এমন প্রার্থী বাছাই করতে হবে যার সাংবাদিকতাসহ বা গণযোগযোগ বিষয়ে শিক্ষা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই পেশার প্রতি বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। এই নির্দেশিকায় জনসংযোগকে ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার সকল স্তরে জনসংযোগবিদদের সম্পৃক্ত রাখার পরামর্শ দেয়া হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বছরগুলোতে বাংলাদেশে দক্ষ জনসংযোগকর্মী পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। কেননা, এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিল সীমিত। ১৯৬২ সালে প্রথম সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্সে জনসংযোগ বিষয়ক পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করে। ষাটের দশকের শেষে চালু করে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৭৭ সালে চালু করে গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান করছে। ১৯৮০ সালে সরকার জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রতিষ্ঠানটি জনসংযোগ বিষয়ে সরকারের তথ্য ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে বেতার ও টিভির প্রযোজক প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি মুদ্রণ মাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান । ২০০০ সালে এখানে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা চালু হয়েছে। এই পাঠক্রমেও জনসংযোগ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া প্রেস ইনস্টিটিউট জনসংযোগ সম্পর্কিত স্বল্পমেয়াদি কোর্স পরিচালনা করে থাকে।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি জনসংযোগকর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও জনসংযোগে কাঙ্ক্ষিত পেশাদারিত্ব এখনও অর্জিত হয় নি। বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতিও স্বীকার করে যে এর সদস্যবৃন্দ নিজেরাই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত নির্দেশিকা ও জনসংযোগের আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে নি। সমিতির সদস্যদের মতে, এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছে একটি জাতীয় জনসংযোগ নীতিমালা না থাকা, জনসংযোগ পেশাজীবীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাব এবং জনসংযোগ শাখাকে কর্তৃপক্ষের কম গুরুত্ব প্রদান। অনেক সংস্থায় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও জনসংযোগ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করতে দেয় না। মূলত এ সকল কারণে এখনও কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি এবং প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে।  [মাহবুবুল আলম]