জনমত


জনমত  কোনো সময়কার ব্যাপক আলোচিত বিষয় সম্পর্কে গোটা জনগণ বা তার বৃহত্তর অংশ যে ধারণা পোষণ করে তাই হচ্ছে জনমত। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রিপূর্বাব্দ) সাধারণ জনগণের মতামতের কোনো মূল্য আছে বলে মনে করেন নি। তাঁর ধারণায় এসব মতামত পরিবর্তনশীল। রোমান লেখকরা জনমতের খুব একটা মূল্য দিতেন না। প্রাচীনকালে জনমতের কিছু ভূমিকা হয়ত ছিল, কিন্তু মতামত দেওয়ার অধিকারী জনগণের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আবার সে মতামত প্রকাশের কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাও ছিল না। রোমানদের ব্যাপক রাজ্য জয়ের কারণে সংবাদ ও তথ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং এ পর্যায়ে রোমানরা vox populi বা জনগণের কথা বলতে শুরু করে। তবে আঠারো শতকের শেষদিকের পূর্ব পর্যন্ত রাজনৈতিক পন্ডিতরা vox populi, vox dei (জনগণের কথাই ঈশ্বরের কথা) এমন কথা বলতে শুরু করেন নি। ফ্রান্সে জীন রুশো এবং পরে জ্যাকস নেকার জনমত নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। ইংল্যান্ডে জেরেমী বেনথাম জোরেশোরে বলেন যে, দেশের কুশাসন সামাজিকভাবে রোধ করার জন্য জনমত একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শক্তি এবং গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্লেটোর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত জনমতের কোনো গ্রহণীয় সংজ্ঞা দেয়া হয় নি, যদিও এখন জনমত কথাটি দৈনন্দিন আলাপ আলোচনায় বিশেষ করে রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমের লোকদের মুখে মুখে বহুল প্রচারিত। জনমতের একটি সংজ্ঞা হলো কোনো জনগোষ্ঠীর সকলের মতামত, এমনকি সংখ্যালঘুদের মতামতও এতে থাকতে হবে। যদি তাদের মতের পার্থক্য প্রকট ও স্থায়ী হয় এবং সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারবে না বলে মনে হয়, তখন তাদের একটি আলাদা জনগোষ্ঠী বলতে হবে। উনিশ শতকের লেখকরা জনমতের যৌক্তিকতার উপর গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু বিশ শতকের লেখকরা তা অগ্রাহ্য করেছেন। ১৯০০ সালের পরে সমাজ-মনোবিজ্ঞানিরা অযৌক্তিক বিষয়াদির উপর জোর দিয়েছেন। প্রচার বিশারদ ও বিজ্ঞাপনদাতারা জনমতকে প্রভাবিত করার এমন সব কলাকৌশল ব্যবহার করছে, যার ফলে যৌক্তিকতার উপর বিশ্বাস আর থাকছে না। কোনো কোনো জনসংযোগবিদ কৌশল করে স্বল্পসংখ্যক লোকের মতামতকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মতামত বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসা এবং শিল্পে জনমতের উপর গবেষণা হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিযোগিতার বাজারে তাদের দ্রব্য ও সেবার জোর প্রচার করছে। রাজনৈতিক দলগুলোও জনমত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বহু অর্থ ব্যয় করে সভা মিছিল করছে এবং সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকে শুরু হয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কিছু নমুনা অংশের মতামতের উপর ভিত্তি করে জনমত জরিপের পদ্ধতি। এর পর থেকেই নমুনা মতামতের উপর ভিত্তি করেই জনমত জরিপের রীতি প্রচলিত হয়। জনমত যাচাইয়ের প্রথা ১৯৬৫ সালের মধ্যেই পৃথিবীর বহুলাংশে ছড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য দেশে শত শত জরিপ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং এর মধ্যে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রগুলি এভাবে জনমত যাচাই শুরু করে। সংখ্যার উপর ভিত্তি করে জরিপে দেখা গেছে, জনগোষ্ঠীর এক বৃহদংশ গণমাধ্যমের প্রচার সত্ত্বেও রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রশ্নের প্রতি খুব কমই নজর দিয়ে থাকেন। পশ্চিম ইউরোপে দেখা গেছে, সেখানকার অধিকাংশ লোক খেলাধুলা এবং বিনোদনের তারকাদের বেশি চেনে এবং দু চারজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ছাড়া অন্যদের খুব কমই চেনে। দেখা যায়, খুব কম লোকই নিয়মিতভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি নজর দিয়ে থাকে। এর ফলে গবেষকরা দেশে কয়েক ধরনের জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছেন, যেমন সাধারণ জনগোষ্ঠী, মনোযোগী জনগোষ্ঠী, জ্ঞাত বা সচেতন জনগোষ্ঠী এবং উচ্চ পর্যায়ের জনগোষ্ঠী। কয়েকটি দেশে বার বার জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে তাদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন সব ঘটনাকে অতি সহজেই তারা মন থেকে দূরে রাখে। জনমত জরিপের পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে দেখা যায় এর বহুবিধ ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সরকার এসব জরিপের সাহায্য নিচ্ছে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং সমিতি প্রায়ই জরিপের সাহায্য নেয় তাদের নির্বাচনে এবং আন্দোলনে সাফল্যের পূর্বাভাষের জন্য। শ্রমিক সংগঠন, চার্চ, পেশাজীবী সংগঠন এবং গবেষণাকারীরা প্রতিনিয়ত জনমতের ছোট বড় জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত জানার চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশে জনমত জরিপের পরিচিতি এবং ব্যবহার খুবই সীমিত। কালেভদ্রে খবরের কাগজের মাধ্যমে নেয়া জরিপে খুব কম লোকই সাড়া দিয়ে থাকে। ২০০০ সালের শেষে বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারিকরণ বিষয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের নেয়া জরিপে মাত্র ১১ টি উত্তর আসে। কিন্তু এই ১১ জন লোকের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সংবাদপত্রটি অভিমত প্রকাশ করে যে, ‘বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারিকরণ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা উদ্বিগ্ন নন’।

আমাদের দেশে সংবাদ-মাধ্যমগুলি এখন অনেকটা উন্নত। রেডিও, টেলিভিশন এখন অনেকটা সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত। তবে সাধারণ জনগণের পর্যায়ে টেলিভিশন তেমন ঢুকতে পারে নি, কারণ দেশের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলো দেখা যায় তা প্রায় সবই বিনোদনমূলক। সংবাদপত্রের প্রচারণা খুবই সীমিত, কারণ এর বিজ্ঞাপন ব্যয় অত্যন্ত বেশি এবং জনগণের শিক্ষার মাত্রা খুবই নিম্নে। দেশে শিল্প বাণিজ্য কম থাকায় বিজ্ঞাপনও কম হয়। সংবাদপত্রের আয়ও তাই কম। এদেশে জনমতের প্রধান ব্যবহারকারী হচ্ছে রাজনৈতিক দল, ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। তারা জনমত সংগ্রহ করে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং সম্পাদকের কাছে লিখিত পাঠকদের পত্রাদি থেকে। স্থানীয় সরকার ও সংসদ নির্বাচনে প্রচারণা প্রায়ই সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং তাতে অস্ত্রের ব্যবহার চলে। রাজনৈতিক ঐতিহ্য হচ্ছে বিশাল জনসভা করার এবং জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পেশীশক্তির ব্যবহার করা। রাজনৈতিক দল এবং শ্রমিক সংগঠন প্রায়ই স্থানীয় বা দেশব্যাপী হরতালের মাধ্যমে সারা দেশে কাজকর্ম বন্ধ করে দেয় এবং একাজে জনমতের কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার বা কর্তৃপক্ষকে স্বমতে আনা না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এ অবস্থা চালাতে থাকে। আবার সরকারি দল যখন বিরোধী দল হয় তখন তারাও একই কার্যক্রম অনুসরণ করে। কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাবমূর্তি জনমতের অনেক ঊর্ধ্বে থাকে। কোনো অগণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য জনমতকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয় যতক্ষণ না গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অবাঞ্ছিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও জনমত সমীক্ষায় ধর্মীয় বিশ্বাস, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক এবং অনুরূপ আরও স্পর্শকাতর বিষয় বাদ দেওয়া হয়, কারণ এ সম্পর্কিত সমালোচনা কোনো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসে আঘাত দিতে এবং তা সহিংস সংঘাত ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে পারে।  [এনামুল হক]