জগৎ শেঠ পরিবার


জগৎ শেঠ পরিবার  আঠারো শতকে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংকার-পরিবার। ‘জগৎ’ শব্দের অর্থ বিশ্ব এবং ‘শেঠ’ অর্থ ব্যাংকার। ‘জগৎ শেঠ’-এর অর্থ ‘বিশ্ব ব্যাংকার’। এটি একটি বংশগত রাজকীয় উপাধি। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিক চাঁদ। আঠারো শতকের শেষভাগে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং পদ্ধতি চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জগৎ শেঠ পরিবারই ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের অর্থ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতো। পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিক চাঁদ ১৭ শতকের শেষ দশকে পাটনা থেকে ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করেন এবং সরকারের পক্ষে ব্যাংকার বা অর্থ যোগানকদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাংলার দীউয়ান মুর্শিদ কুলী খান ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর খালসা বা রাজস্ব দপ্তর স্থানান্তর করে মুর্শিদাবাদ এ স্থাপন করলে মানিক চাঁদও তাঁর দপ্তর ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। সেখানে তিনি নবাবের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও ব্যাংকারে পরিণত হন। শিঘ্রই মানিক চাঁদ সরকারের একচ্ছত্র ব্যাংকার হিসেবে নিজের স্থান করে নেন।

১৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলী খান মানিক চাঁদকে ‘নগর শেঠ’  উপাধি দেওয়ার জন্য সম্রাট ফররুখ সিয়ার এর নিকট সুপারিশ করেন। ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দে মানিক চাঁদ-এর মৃত্যু হয়। মানিক চাঁদ তাঁর ভাতিজা (ভাইপুত্র) ফতেহ চাঁদকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ফতেহ চাঁদ এ পরিবারিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানে পরিণত হন। ফতেহ চাঁদই ভারতের সর্বত্র  তার ব্যাংক-ব্যবসার প্রসার ঘটান। তাঁর ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা এমন বেড়ে যায় যে, তাঁর ইস্যুকৃত হুন্ডি ভারতের সর্বত্র দেখামাত্র পরিশোধ করার মর্যাদা লাভ করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ফতেহ চাঁদ-এর চমৎকারিত্ব ও একজন ব্যাংকার হিসেবে তাঁর আন্তঃআঞ্চলিক প্রভাবের কারণে ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট মাহমুদ শাহ তাঁকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ‘জগৎ শেঠ’ উপাধিটি ছিলো বাংলায় ও বাংলার বাইরে ফতেহ চাঁদ-এর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকিং হাউজ এর ব্যাপক কর্মকান্ডের স্বীকৃতির সরকারী প্রত্যয়নপত্র। মুর্শিদাবাদে প্রধান দপ্তর ছাড়াও জগৎ শেঠের ব্যাংক-এর শাখা ঢাকা, পাটনা, দিল্লি ও সুরাটসহ বাংলার ও উত্তর ভারতের প্রায় সব কয়টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

মুর্শিদ কুলী খানের অধীনে মুর্শিদাবাদ টাকশালের দারোগা রঘুনন্দন-এর ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হলে মুর্শিদাবাদের টাকশালের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা জগৎ শেঠের হস্তগত হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মুদ্রানীতি প্রথামাফিক জগৎ শেঠই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে জগৎ শেঠের ব্যাংকের অর্থ লেনদেন, ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ, বুলিওন বা সোনারূপা ক্রয় ও বিক্রয়ের তথ্য সমসাময়িক দলিলপত্রে পাওয়া যায়। সমসাময়িক ইউরোপীয় লেখক রবার্ট ওর্ম লিখেছেন যে, এই হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবারটি ছিলো মুগল সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে ধনী পরিবার। মুর্শিদাবাদের সরকারের ওপর এই পরিবারের অসাধারন প্রভাব ছিলো। ওর্ম এর মতে, জগৎ শেঠের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক সংখ্যক জমিদার ও ব্যবসায়ীর আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সমকালীন সরকার ও আর্থ-সমাজ জগৎ শেঠ পরিবারের আর্থিক লেনদেন-এর কার্যক্রম সর্বদা ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আঠারো শতকে ব্রিটেন সরকারের পক্ষে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যে ধরনের কাজ সম্পাদন করতো, জগৎ শেঠ-এর প্রতিষ্ঠানও বাংলার সরকারের পক্ষে অনুরূপ কাজ সম্পাদন করতো। তাঁর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস ছিলো বহুবিধ। এ প্রতিষ্ঠান সরকারের পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহকারী ও সরকারের ট্রেজারারের ভূমিকা পালন করতো। জমিদারগণ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের রাজস্ব সরকারকে জমা দিতেন এবং নবাব পুনরায় এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই দিল্লির সরকারকে বাৎসরিক খাজনা প্রদান করত। এই হাউজই মুর্শিদাবাদের টাকশাল নিয়ন্ত্রণ করতো এবং ইউরোপীয় ব্যবসায়ী কর্তৃক সোনারূপার পিন্ড বাংলায় আমদানি করা হলে তা ক্রয় করে মুর্শিদাবাদের টাকশালে মুদ্রায় পরিণত করা হত।

১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে ফতেহ চাঁদ-এর দৌহিত্র মাহতাব চাঁদ পারিবারিক পদবিটি (জগৎ শেঠ) উত্তরাধিকার সূত্রে ধারন করেন। তাঁর ভাই মহারাজা স্বরূপ চাঁদ নবাব আলীবর্দী খানের দরবারের অভিজাতদের মধ্যে অন্যতম একজনে পরিণত হন। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রভাবিত মাহতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদ উভয়েই নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে পড়েন এবং একই সময়ে সিরাজউদ্দৌলা কোম্পানির সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে, তাঁরা উভয়েই নীরবে কোম্পানির পক্ষ অবলম্বন করেন। তথ্য প্রমাণ রয়েছে যে, জগৎ শেঠ নওয়াবের বিরুদ্ধে ও কোম্পানির পক্ষে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং তিনি নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকি নিতে কোম্পানিকে বড় অংকের টাকা ঋণ হিসেবে প্রদান করেন। সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, প্রধানত জগৎ শেঠের সহযোগিতার কারণেই পলাশীর যুদ্ধের মতো বড় ঘটনাটি সংঘঠিত হয়েছিলো। ১৭৫৭ সালের যুদ্ধের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রবাহ এমন ছিলো যে, জগৎ শেঠ কার্যত বাংলার নবাবে পরিণত হন। কোম্পানির তৈরি নবাবমীরজাফর জগৎ শেঠের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল নবাবে পরিণত হন।

মুগল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষের নবাব মীরকাসিম তাঁর সভাকক্ষ থেকে প্রথমেই জগৎ শেঠকে বহিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে জগৎ শেঠ ও তাঁর ভাই উভয়ের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানির ক্ষমতা গ্রহণের পর জগৎ শেঠ পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত পতন ঘটে। জগৎ শেঠ পরিবারের ক্ষমতা ও প্রভাবের সঙ্গে সাম্রাজ্যিক শক্তি হিসেবে কোম্পানির উত্থানের মধ্যে সঙ্গতি ছিলো না। ১৭৮০ ও ১৭৯০-এর দশকে ইউরোপীয় এজেন্সি হাউজ সমূহের উত্থান হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পূর্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং এভাবে জগৎ শেঠদের ব্যাংকিং পরিবার, যারা বাংলায় মুগল রাজনীতিতে এককালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, ১৭৮০’র দশকে তারা তাদের আর্থিক ক্ষমতা ও প্রভাব সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে। [সিরাজুল ইসলাম]