চৌধুরানী, করিমুন্নেসা খানম


চৌধুরানী, করিমুন্নেসা খানম (১৮৫৫-১৯২৬)  মুসলিম মহিলা কবি ও সমাজকর্মী। জহিরউদ্দীন মুহম্মদ আবু আলী সাবের ও রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানীর জ্যেষ্ঠা কন্যা করিমুন্নেসা খানম চৌধুরানী রংপুর জেলার পায়রাবন্দ পরগনার এক অভিজাত সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ছিলেন করিমুন্নেসার ছোট বোন।

সমকালীন রক্ষণশীল মুসলিম জমিদার পরিবারে রীতি-রেওয়াজ মোতাবেক করিমুন্নেসাকে কঠোর পর্দাপ্রথা পালন করতে হয়েছে এবং সে সময় একমাত্র কুরআন তেলাওয়াত ব্যতীত তাঁর আর অন্যকোনো শিক্ষালাভ ঘটেনি। কিন্তু জ্ঞানলাভ করার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা ছিল করিমুন্নেসার প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর নিজের চেষ্টার ফলে এবং লেখাপড়ার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহের কারণে তাঁর ভাইদের পড়া শুনে শুনে তিনি কিছু কিছু বাংলা ও ইংরেজি শিখেছিলেন। পবিত্র কুরআন শরীফের অর্থ জানা ও বোঝার জন্য তিনি ৬৭ বছর বয়সে আরবি শেখা আরম্ভ করেছিলেন।

১৪ বছর বয়সে করিমুন্নেসার বিয়ে হয় টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার জমিদার পরিবারের আবদুল হাকিম খান গজনবীর সঙ্গে। দু’নাবালেগ পুত্র সন্তানসহ ২৩ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। করিমুন্নেসা একজন প্রগতিশীল মহিলা ছিলেন। তিনি তাঁর পুত্রদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে কলকাতায় যান। ১৮৮৫ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর বড় ছেলে আবদুল করিম গজনবী-কে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। ছোট ছেলে আবদুল হালীম গজনবী-কেও তিনি কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি করে দেন। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে করিমুন্নেসার দু’ছেলে পরবর্তীকালে বাংলার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গজনবী ভাইদের এ সাফল্যের জন্য তাঁরা তাঁদের মায়ের কাছে ঋণী। করিমুন্নেসা তাঁর ছোট বোন বেগম রোকেয়ার বিদ্যাশিক্ষা লাভের জন্যও উৎসাহ দিয়েছেন। যখন সমাজের প্রায় সবাই রোকেয়ার বাংলা শিক্ষার বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, তখন করিমুন্নেসা রোকেয়াকে সমর্থন দিয়েছেন এবং তাঁর লেখায় উৎসাহ জুগিয়েছেন। করিমুন্নেসা নিজেও একজন কবি ছিলেন। তিনি দুঃখতরঙ্গিণী ও মানস বিকাশ নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। করিমুন্নেসা অনেক পারিবারিক ঘটনা ও সামাজিক বিষয় নিয়েও কবিতা লিখেছেন। করিমুন্নেসা ছিলেন স্বভাবকবি।

করিমুন্নেসা তার সমকালীন অনেক প্রগতিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি আবদুল হামিদ খান ইউসুফজাই কর্তৃক সম্পাদিত আহাম্মদী নামক একটি বাংলা পাক্ষিক পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৮৮৬ সালে দেলদুয়ার থেকে প্রথম প্রকাশিত আহাম্মদী পত্রিকাটিই প্রথম ম্যাগাজিন যা হিন্দু-মুসলমান ঐক্য কামনা করত এবং মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কৃষ্টিবিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ করত।

১৮৮৪ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত মীর মশাররফ হোসেন দেলদুয়ার জমিদারি এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। মীর মশাররফ হোসেনকে তাঁর সাহিত্য কর্মের ব্যাপারে করিমুন্নেসা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বলে জানা যায়। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ বিষাদ সিন্ধু এর (১৮৮৫) প্রথম সংস্করণটি করিমুন্নেসাকে উৎসর্গ করেন। বেগম রোকেয়াও তাঁর বিখ্যাত মতিচুর কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণটি বড় বোন করিমুন্নেসার নামে উৎসর্গ করেন। মৃত্যু ১৯২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। [মুহম্মদ আবদুস সালাম]