চৈনিক বিবরণ


চৈনিক বিবরণ  সুপ্রাচীনকাল থেকেই চীনের সাথে বাংলার যোগাযোগ ছিল। মধ্যযুগেও এ যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ উপাদান এখানে দু ভাগে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রাচীন যুগ  পাঁচ ও সাত শতকের মধ্যে কয়েকজন চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী বাংলা ভ্রমণে এসেছিলেন। বিভিন্ন তীর্থ স্থান পরিদর্শন এবং বৌদ্ধদের প্রামাণ্য ধর্মীয় গ্রন্থের সন্ধানে তাঁরা ভারতে আসেন। বাংলা অঞ্চল সম্পর্কে তাঁদের বিবরণ স্বভাবতই অপর্যাপ্ত।

ফা-হিয়েন  ভারতে চৈনিক তীর্থ-ভ্রমণকারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁর বিবরণী পাওয়া যায়, তিনি হচ্ছেন ফা-হিয়েন। পাঁচ শতকের সূচনায় তিনি ভারত ভ্রমণ করেন। এ সময় গুপ্ত বংশীয়রা বাংলার অংশবিশেষসহ ভারত শাসন করছিলেন। ফা-হিয়েন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে চীন থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৪ বছর পর আবার চীনে ফিরে যান। ভারত ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে তিনি সীমান্ত রাজ্য চম্পার মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তাঁর গন্তব্যস্থল ছিল সে সময়ের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বন্দর তাম্রলিপ্তি (তমলুক, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত)। সেখান থেকেই সমুদ্রপথে তিনি অপর বৌদ্ধপ্রধান অঞ্চল শ্রীলঙ্কায় যেতে চেয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পূর্বে ফা-হিয়েন দীর্ঘ দুবছর তাম্রলিপ্তিতে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের অনুলিপি তৈরি ও বৌদ্ধ মূর্তির ছবি অাঁকেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়, এ সময় তাম্রলিপ্তিতে চবিবশটি বৌদ্ধ মঠ ও অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন। অবশ্য তিনি এদের বিস্তারিত বিবরণ দেন নি।

হিউয়েন-সাং  ফা-হিয়েনের পরবর্তী তীর্থ-ভ্রমণকারী ছিলেন হিউয়েন-সাং। তাঁর বিবরণী থেকে সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বাংলা সম্পর্কে কিছুটা তথ্য জানা যায়। সে সময় উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধন, বাংলায় শশাঙ্ক এবং আসামে ভাস্করবর্মণ শাসন করছিলেন। হিউয়েন-সাং ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাংলায় আসেন। তাঁর বিবরণী শশাঙ্কএর ইতিহাস, বিশেষ করে হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তাঁর বৈরিতা এবং শশাঙ্কের ধর্মনীতি সম্পর্কে জানার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হিউয়েন-সাং শিবের উপাসক শশাঙ্কের বেশ কিছু বৌদ্ধবিরোধী কার্যকলাপের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। তবে অনেক ঐতিহাসিকই হিউয়েন সাং-এর এ বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

উত্তর ভারত ভ্রমণ শেষে তিনি কজঙ্গলে গঙ্গা অতিক্রম করে বাংলায় প্রবেশ করেন এবং পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ‘পুন-ন-ফ-তান-না’ রাজ্য অর্থাৎ পুন্ড্রবর্ধনে পৌঁছেন। এ দেশটির পরিসীমা ছিল প্রায় ৪০০০ লি (ছয় লি-তে প্রায় এক মাইল) এবং এর রাজধানীর পরিসীমা প্রায় ৩০ লি। তিনি দেশটিকে ঘন বসতিপূর্ণ এবং সবধরনের খাদ্যশস্যে সমৃদ্ধ দেখতে পান। এদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাপ্ত সুস্বাদু ‘পানাসা ফল’ (কাঁঠাল) বিশেষভাবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি পুন্ড্রবর্ধন সম্পর্কে আরও বলেন: ‘এখানকার মানুষ বিদ্যার কদর করে। প্রায় বিশটি সংঘারামে তিন হাজারের মতো পুরোহিত মহাযান ও হীনযান মতবাদ অধ্যয়ন করে। এখানে প্রায় ১০০টি দেবমন্দির (ব্রাহ্মণ্য) রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রয়েছে দিগম্বর-নির্গ্রন্থ (জৈন)। রাজধানী থেকে প্রায় ২০ লি পশ্চিমে অবস্থিত ‘পো-শি-প’ সংঘারাম। এখানে পুরোহিতের সংখ্যা প্রায় ৭০০, তাঁরা মহাযান মতে আইন বিধান অধ্যয়ন করেন। পূর্ব ভারতের অনেক খ্যাতিমান পুরোহিত এখানে বসবাস করেন। এখান থেকে অদূরবর্তী এক বিহারে ‘কোয়ান-তাজ-সাই বোধিসত্ত্ব’-এর (অবলোকিতেশ্বর) একটি মূর্তি আছে। এর ঐশী প্রজ্ঞার নিকট দুর্জ্ঞেয় কিছুই নয়। দূর-দূরান্তের লোকজন উপবাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর স্তব করে।’

রাজা ভাস্করবর্মণের আমন্ত্রণে তিনি পুন্ড্রবর্ধন থেকে পূর্ব দিকে ৯০০ লি অথবা এর কাছাকাছি দূরত্বে একটি বড় নদী অতিক্রম করে ‘কিয়া-মো-লু-পো’ (কামরূপ) দেশে পৌঁছেন। এখান থেকে দক্ষিণে ১২০০ অথবা ১৩০০ লি ভ্রমণ শেষে তিনি ‘সান-মো-তা-চা’ (সমতট) দেশে পৌঁছেন। তাঁর বর্ণনা মতে, এ দেশটির পরিসীমা ৩০০০ লি এবং এটি বিশাল সাগরতটে অবস্থিত। হিউয়েন-সাং-এর বিবরণ অনুযায়ী নিম্নভূমির এ দেশটি সমৃদ্ধ। রাজধানীর পরিসীমা ২০ লি। এখানে জমি নিয়মিত চাষাবাদ করা হয় এবং পর্যাপ্ত ফসল উৎপাদিত হয়। এর আবহাওয়া নমনীয় এবং অধিবাসীদের আচরণ অমায়িক। এরা প্রকৃতিগতভাবে পরিশ্রমী, খাটো আকৃতির এবং এদের গাত্রবর্ণ কালো। তাঁরা জ্ঞানচর্চায় অনুরাগী। এখানে রয়েছে ৩০টির মতো সংঘারাম এবং এগুলিতে পুরোহিতের সংখ্যা প্রায় ২০০০। তারা সকলেই স্থবির সম্প্রদায়ভুক্ত। এখানে প্রায় ১০০টির মতো দেবমন্দির রয়েছে। নির্গ্রন্থ নামের দিগম্বর সন্ন্যাসীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।  সমতট থেকে প্রায় ৯০০ লি পশ্চিমে ‘তান-মো-লি-তি’ (তাম্রলিপ্তি) দেশ। তাঁর বর্ণনা মতে, সমুদ্র তীরবর্তী এ দেশটির পরিসীমা ১৪০০ অথবা ১৫০০ লি এবং রাজধানীর পরিসীমা ১০ লি। নিম্নভূমির এ দেশটির ভূমি উর্বর, এখানে নিয়মিত কৃষিকাজ হয় এবং প্রচুর ফসল ফলে। এখানকার তাপমাত্রা বেশ উষ্ণ। মানুষগুলি চটপটে ও ব্যস্ত স্বভাবের। তাঁরা পরিশ্রমী ও সাহসী। হিউয়েন-সাং বৌদ্ধ এবং অ-বৌদ্ধদেরকে এখানে পাশাপাশি বাস করতে দেখেছেন। এখানে প্রায় ১০টি সংঘারাম এবং প্রায় ১০০০ পুরোহিত ছিলেন। হিন্দু মন্দিরের সংখ্যা ছিল ৫০। সাগরতীরের দেশ বলে এখানে সাগরের পানি আর ভূমি পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে। এখানে প্রচুর পরিমাণ মূল্যবান সামগ্রী ও রত্ন পাওয়া যায়। তাই এদেশের মানুষ সাধারণত খুবই ধনী।’

তাম্রলিপ্তি থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৭০০ লি ভ্রমণ করে হিউয়েন-সাং ‘কি-লো-নু-ফা-লা-না’ (কর্ণসুবর্ণ) দেশে পৌঁছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী দেশটির পরিসীমা প্রায় ১৪০০ অথবা ১৫০০ লি এবং রাজধানীর পরিসীমা প্রায় ২০ লি। দেশটি ঘনবসতিপূর্ণ, অধিবাসীরা ধনী এবং তাঁরা আয়েশি জীবনযাপন করেন। এ নিম্নভূমির মাটি দোঅাঁশ যুক্ত; নিয়মিত জমি চাষ হয় এবং বিচিত্র ধরনের পর্যাপ্ত ফসল ফলে। এখানকার আবহাওয়া নমনীয় এবং অধিবাসীরা সৎ ও অমায়িক। জ্ঞানচর্চায় তারা গভীরভাবে আসক্ত। এখানে বিশ্বাসী ও বিধর্মী (বৌদ্ধ ও অ-বৌদ্ধ) দুধরনের মানুষই রয়েছে; তবে বিধর্মীদের সংখ্যাই বেশি। এখানে রয়েছে প্রায় দশটি সংঘারাম এবং প্রায় ২০০০ পুরোহিত (হু’ই লি-এর বর্ণনানুযায়ী ৩০০ জন)। এখানে হিন্দু মন্দির রয়েছে ৫০টি। ‘রাজধানীর পাশে ‘লো-তো-মো-চি’ (রক্তমৃত্তিকা) নামে সুউচ্চ বুরুজসহ একটি সংঘারাম রয়েছে ...’। বাংলা থেকে হিউয়েন-সাং সিংহলে যাওয়ার চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের একজন পুরোহিত বিপদসংকুল সমুদ্রপথ পরিহার করতে তাঁকে উপদেশ দেন, এ কারণেই তিনি সড়কপথ ধরে উড়িষ্যার দিকে অগ্রসর হন।

ই-ৎসিঙ ৬৭২ খ্রিস্টাব্দের দিকে ই-ৎসিঙ নামের আরেকজন চৈনিক পর্যটক বাংলায় আসেন। তিনি তিন বছর তাম্রলিপ্তিতে অবস্থান করে সংস্কৃত ভাষা শেখেন। ই-ৎসিঙ একটি স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করেন। ‘চীনা মন্দির’ নামে পরিচিত এর ভিতটি শুধু টিকে ছিল। মহাবোধি মন্দির থেকে এর দিক নির্দেশনা ও দূরত্ব সম্পর্কে তাঁর বর্ণনা থেকে এ মন্দিরটির অবস্থান উত্তরবঙ্গের (বরেন্দ্র) কোথাও ছিল বলে অনুমান করা হয়। ই-ৎসিঙ্ শুনতে পান যে, তাঁর ভ্রমণের ৫০০ বছর পূর্বে শ্রীগুপ্ত নামে একজন মহারাজা চৈনিক পুরোহিতদের জন্য এ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এ সময়ে প্রায় ২০ জন চৈনিক পুরোহিত তীর্থযাত্রায় এখানে এলে শ্রীগুপ্ত তাদের আচরণে মুগ্ধ হন এবং তাদেরকে কিছু জমি ও ২৪টি গ্রামের রাজস্ব দান করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এ শ্রীগুপ্তই সম্ভবত গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত।

সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারত ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ভ্রমণকারী ছাপ্পান্ন জন চীনা পুরোহিতের বিবরণ ই-ৎসিঙ্ লিপিবদ্ধ করেন। এঁদের মধ্যে নিম্নলিখিত পর্যটকগণ বাংলায় ভ্রমণ করেন বলে জানা যায়।

তা চেং-তেঙ বারো বছর তাম্রলিপ্তিতে বসবাস করে সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এরপর তিনি নালন্দা, বোধগয়া এবং বৌদ্ধদের অন্যান্য পবিত্র স্থান পরিভ্রমণ করেন।

তাও-লিন সংস্কৃত নাম শিলপ্রভা। তিনি তাম্রলিপ্তিতে তিন বছর অবস্থান করে সংস্কৃত ভাষা শেখেন।

তান-কুওঙ বাংলা ভ্রমণ করেন এবং এখানেই তান মৃত্যু হয়।

হিউয়েন-সাং  এক বছরের বেশি সময় তাম্রলিপ্তিতে অবস্থান করেন।

শেঙ-চি  ই-ৎসিঙ ও শেঙ চি-এর ভ্রমনের সময় ছিল অভিন্ন (৬৭২-৭৩ খ্রি.)। জানা যায়, তিনি রাজভটের শাসনকালে সমতটে আসেন। এ রাজভট এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার খড়গ বংশ এর রাজরাজভট সম্ভবত এক ও অভিন্ন। শেঙ-চি-এর বিবরণ অনুযায়ী তিনি একজন নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রতিদিন মাটি দিয়ে লক্ষ বৌদ্ধ মূর্তি বানাতেন এবং মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র-এর লক্ষ শ্লোক আবৃত্তি করতেন। তিনি অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি সামনে নিয়ে বুদ্ধের সম্মানে শোভাযাত্রাও বের করতেন এবং পুণ্যার্থে দান করতেন। তাঁর সময়ে শহরে চার সহস্রাধিক সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী ছিলেন।

উও-ইৎসিঙ তিনিও বাংলায় ভ্রমণ করেছেন বলে জানা যায়।  [আবু ইমাম]

মধ্যযুগ  আধুনিক নাম ‘বাংলা’ চৈনিক ‘বাং-গে-লা’ রূপে মিং (Ming) বংশের আমলে (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ) ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়েছিল যা প্রথমবারের মতো Yongle-এর ষষ্ঠ বছরে (১৪০৮) Mingshilu এবং Yongle-এর তৃতীয় বছরে (১৪০৫) Shuyu Zhouzi Lu-এ দেখা যায়। Song (৯৬০-১২৭৯) এবং Yuan (১২৭৯-১৩৬৮) বংশের প্রাথমিক বিবরণগুলিতে ‘বাংলা’কে বিভিন্ন রূপে দেখা যায়: Pengqie-lo এবং Pengjiala। Pengqie-lo কে Zhao Rugua (১২২৫) পশ্চিমের একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যার নগর-প্রাচীরের পরিসীমা ছিল ৬০ কিলোমিটার; এর অধিবাসীরা ঘষে ঘষে সাদা শঙ্খকে আকার দিয়ে সেগুলি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের উৎপন্ন দ্রব্য ছিল সুন্দর তরবারি, তুলা (মখমল তুল্য) এবং সাধারণ সুতিবস্ত্র। Zhao রাজধানীর নাম Cha-na-ji রূপে উল্লেখ করেছেন যা বাংলার প্রাচীন রাজধানী লক্ষ্মণাবতীর স্থানীয় লোকপ্রিয় নাম লখনৌতির মতো শোনায়। (লা)-চ(খ-এর স্থলে), -ন (নৌ এর স্থলে) এবং তি’র স্থলে জি ব্যবহূত হয়েছে। চৈনিকীকরণ করতে গিয়ে নামটি এ বিকৃত রূপ লাভ করেছে।

সামগ্রিকভাবে চৈনিক বিবরণগুলি আমাদেরকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দান করে। তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন কারণে নাম পরিচয়ে অস্পষ্টতা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ Ai(ngai)ya-si-ding, Saifuding, Ba-yi-zhi, Zhalalading এবং Nading-এর মতো রাজাদের নাম যথাক্রমে গিয়াসউদ্দীন, সাইফুদ্দীন, বায়েজীদ, জালালুদ্দীন এবং নাসিরুদ্দীন রূপে শনাক্ত করা যায়। বায়েজীদ ও নাসিরুদ্দীনকে ভুলক্রমে দূত বলা হয়েছে।

দূত বিনিময় (পনেরো শতক) ১৪০৪ থেকে ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩৬ বছরের বাংলা ও চীনের মধ্যে কর্মব্যস্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের বিবরণ পাওয়া যায়। ১৪০৪, ১৪০৫, ১৪০৮-৯, ১৪১১, ১৪১২, ১৪১৪, ১৪১৮, ১৪২০, ১৪২১, ১৪২৩, ১৪২৯, ১৪৩৮ এবং ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলা থেকে চৌদ্দটি কূটনৈতিক দল চীনের দরবারে যায়। বিনিময়ে চীন থেকে ১৪১২, ১৪১৫, ১৪২০, ১৪২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চারটি প্রতিনিধিদল বাংলায় পাঠানো হয়। বাংলার কল্পনাশক্তিধর ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুযোগ্য ও দক্ষ শাসক গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (১৩৯১-৯২ থেকে ১৪১০-১১) চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক বিনিময় শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পনেরো শতকের বাংলার এক বিস্তৃত চিত্র আমরা পেয়েছি। বস্ত্তত, চৈনিক বিবরণগুলিতেই পান্ডুয়া এবং সুলতানদের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলা থেকে প্রথম প্রতিনিধিদল চীনে যায় ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ১৪০৫, ১৪০৮-৯, ১৪১০, ১৪১১, ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে একটি করে প্রতিনিধিদল চীনে যায়। চৈনিক প্রতিনিধিদল শুধু বাংলায়ই আসেনি, তারা জৌনপুর এবং দিল্লিও গিয়েছিল সবস্থানেই তারা গিয়েছিল নৌকায়। ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে শিহাবুদ্দীন বায়েজীদ শাহ চীনকে একটি জিরাফ উপহার দেন। এরপর চৈনিক প্রতিনিধিদল ফিরতি সফরে এসেছিলেন। ফেই সিন দুটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গেই এসেছিলেন, তবে বাংলার দরবার সম্পর্কে তার বর্ণনা প্রথম বা দ্বিতীয় সফর বা উভয় সম্পর্কিত কিনা তা স্পষ্ট নয়।

ফেই সিন বাংলার দরবার এবং চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা দিলেও বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিস্তৃত বর্ণনায় জন্য আমরা চৈনিক-মুসলমান দোভাষী মা হুয়ান-এর কাছে ঋণী। তিনি ১৪১৩-১৫, ১৪২১-২৩ এবং ১৪৩১-৩৩ খ্রিস্টাব্দে Zheng He-এর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে চৈনিকদের সমুদ্রযাত্রায় সহগামী তিনজন কর্মকর্তার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন Gong Zhen। তাদের ভ্রমণ কাহিনীগুলির মধ্যে মা হুয়ান এর বিবরণই সবচেয়ে বিস্তারিত। এ কারণেই মিং বংশের সরকারি ইতিহাসসহ পরবর্তীকালের সব গ্রন্থই বাইরের দেশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য মা হুয়ানের রচনাবলীর উপর নির্ভরশীল হয়েছিল। ফারসিতে (এবং সম্ভবত আরবিতেও) জ্ঞান এবং অনুসন্ধানের তীক্ষ্ণ বোধ তাঁর সফরকৃত দেশ সম্পর্কে বর্ণনা সমৃদ্ধ করেছে। ফলে দেশভেদে তাঁর বর্ণিত বিষয়াবলি ভিন্নতর যার জন্য বাংলার বিবরণে তিনি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ভ্রমণ-পথ ও দূরত্ব ছাড়াও বর্ষপঞ্জি, বস্ত্রশিল্প ও পশমি উৎপন্ন দ্রব্য, চার ধরনের মদ, শস্য, বিয়ে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ভাষা, পোশাক ও অলঙ্কার, মুদ্রা, পণ্যদ্রব্য রেশম ও রেশম-গুটি, নৃত্যশিল্পী ও বাঘের সঙ্গে লড়াইকারী ইত্যাদির মতো বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। ধারণা করা যেতে পারে যে, তিনি বাংলাও জানতেন।

পান্ডুয়ায় পৌঁছার আগে চৈনিক প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম অতিক্রম করেন এবং সেখান থেকে ছোট নৌকা নিয়ে জলপথে সোনারগাঁও অভিমুখে যাত্রা করেন। দুটিই ছিল রাজধানী শহর। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ছিল এখানে আগত জাহাজ থেকে কর আদায়ের শুল্ককেন্দ্রও। স্থানীয় রাজা (অথবা গোষ্ঠীপতি) ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে চৈনিক দূত সহকারী প্রধান খোজা Yang Min (১৪১২-১৪) এবং ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে উপ-প্রধান খোজা Hou Xian কে (১৪১৫-১৭) অভ্যর্থনা জানাতে বহু উপঢৌকন ও এক হাজারের বেশি লোক ও ঘোড়াসহ তার কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তী প্রধান নদীবন্দর ছিল সোনারগাঁও এটা ছিল প্রাচীর ঘেরা শহর এবং সেখানে দিঘি, পাকা রাস্তা ও বাজার ছিল এবং সেখানকার অধিবাসীরা ছিল রকমারি পেশায় নিয়োজিত।

পান্ডুয়া ছিল প্রাচীরবেষ্টিত নগরী এবং এর চারপাশে ছিল উপ-শহর এলাকা। নগরীর অভ্যন্তরেই ছিল ছোট-বড় ‘ইয়ামেন’ (সরকারি দফতর) সহ রাজপ্রাসাদ। নগর-প্রাচীর এবং শহরতলি, সবই ছিল অত্যন্ত জমকালো, বাজার ছিল সুবিন্যস্ত এবং একই পণ্যের দোকান ছিল পাশাপাশি। সারিবদ্ধ স্তম্ভ সহকারে নির্মিত দোকানগুলি ছিল সব ধরনের পণ্যে পরিপূর্ণ।

বাংলার রাজদরবার  চৈনিক সাক্ষ্যানুসারে রাজপ্রাসাদটি ছিল বর্গাকৃতির এক বিশাল সাদা অট্টালিকা। এতে নয়টি হলঘর এবং তিনটি তোরণ ছিল। এর স্তম্ভগুলি ছিল ফুল ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি দ্বারা অলঙ্কৃত পিতলের পাত দিয়ে মোড়া। দালানটি ছিল চুনসুরকিতে গাঁথা ইটের তৈরী এবং উপরে যাওয়ার জন্য এতে উঁচু ও চওড়া সিঁড়ি ছিল। এ স্থাপত্যকর্মের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান যার মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে একলাখী সমাধিসৌধ যা সম্ভবত মূল প্রাসাদের অংশ ছিল এবং এটা দরবার কক্ষ রূপে ব্যবহূত হতো। অন্য একটি হচ্ছে বিশাল আদিনা মসজিদ। দুঃখজনকভাবে উঁচু সিঁড়ি, নয়টি হলঘর, তিনটি তোরণবিশিষ্ট প্রাসাদের মূল ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেছে, পড়ে আছে শুধু উঁচু ঢিবির অংশবিশেষ।

প্রাসাদের দেওয়ালে ফেই সিন উল্লিখিত উৎকীর্ণ ফুল ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি এখনও এসব ঐতিহাসিক স্থানগুলির ধ্বংসাবশেষে দেখতে পাওয়া যায়। একলাখী সমাধিসৌধ ও আদিনা মসজিদে উৎকীর্ণ হিন্দু প্রতিমা ও অন্যান্য মনুষ্য-চিত্র রয়েছে, আদিনা মসজিদে উৎকীর্ণ পদ্মফুল এখনও দৃশ্যমান।

ভাষা, পোশাক ও অলঙ্কার  দুশতককালের মধ্যে আক্রমণকারী তুর্কিরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের অভিন্ন করে তুলেছিল এবং বাংলাকে তাদের মাতৃভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। অবশ্য অভিজাতদের মধ্যে অধিকাংশই যে ফারসিও জানতেন চৈনিক দোভাষীদের বক্তব্য থেকে সেটা স্পষ্ট। ফারসিতে দক্ষতার জন্যই এসব চৈনিক দোভাষীদের নিয়োগ করা হতো। মধ্যযুগে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যিক ভাষা ছিল ফারসি। পনেরো শতকে বাংলা সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা থেকে তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাও জানতেন বলে মনে হয়।

চৈনিকরা স্পষ্টতই বাংলায় অভিজাতশ্রেণি ও ব্যবসায়ীদের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। মুসলমান পুরুষরা তাদের মাথার চুল কামাতেন এবং সাদা পাগড়ি পরতেন। তারা মাথার উপর দিয়ে গলিয়ে রঙিন আলখাল্লা পরতেন। রঙ্গিন লম্বা ধুতি বা সারং বা লুঙ্গি দিয়ে (চৈনিকরা যাকে চৌকোনা কাপড় বলেছেন) তাদের নিম্নাঙ্গ ঢেকে রাখতেন। ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরী সাধারণত ভোঁতা মুখওয়ালা জুতা পরতেন। এগুলি সোনার সুতা দিয়ে কারুকার্যখচিত ছিল। এমনকি কোনো কোনোটির উপর নকশাও থাকত। অভিজাত শ্রেণীর সবাই এসব পোশাক পরতেন যা ছিল সম্ভবত মধ্য এশিয়া উদ্ভূত। এর ফলে একজন বিদেশির পক্ষে একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব ছিলনা। মহিলারা রেশমি অথবা সুতি শাড়ি পরতেন। ধনী মহিলারা কানে দুল ও গলায় হার পরতেন। এগুলি ছিল মূল্যবান পাথর বসানো সোনার তৈরী যা প্রাচুর্যের চিত্র প্রদর্শণ করে।

ধনী ও অভিজাত ব্যক্তিরা সকালে ভ্রাম্যমাণ বাদ্যকরদের সানাই ও ঢোলের সুর শুনে ঘুম থেকে উঠতেন। এসব বাদ্যকরদের মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো এবং সঙ্গীত পরিবেশন শেষে তাদের টাকা দেওয়া হতো। সন্ধ্যায় নর্তকীরা অভিজাতদের মনোরঞ্জন করত তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে নৃত্য পরিবেশন করত। মেহমানদের গরু ও খাসির রোস্টকৃত মাংস, গোলাপজল ও বিভিন্ন ধরনের শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। ভোজের পর পান-সুপারি দেওয়া হতো। চার ধরনের মদ তৈরি হতো, নারকেলের মদ, মহুয়া মদ, তালের রস থেকে তৈরী মদ এবং ভাত দিয়ে তৈরী মদ। এগুলির অধিকাংশই ব্যক্তিগত ভোগ ও রপ্তানির জন্য তৈরী করা হতো, তবে চৈনিকরা এর কোনোটিই আমদানি করত না।

আর্থ-সামাজিক রূপরেখা পান্ডুয়া ছিল উৎপাদন ও বিপণনের কেন্দ্র। অন্ততপক্ষে ছয় ধরনের সূক্ষ্ম সুতি ও পশমি বস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে যার মধ্যে বফত (bafta), শনবফত (shanbaft), মখমল (makhmal), সকেলত (sakelat) (পারস্য দেশিয় টকটকে লাল বর্ণের কাপড়), সফ (sof) (আরব উদ্ভূত পশমি পোশাক) ছিল মধ্য এশিয়া উদ্ভূত এবং পচদি (pachadi) (অথবা পচদা), ঝিমবরতলি (jhimbartali), চৌতর (chautar) নিশ্চিতরূপেই স্থানীয়ভাবে বা পার্শ্ববর্তী বিহার অঞ্চলে উৎপাদন করা হতো। অন্য এক ধরনও যা মোটা সুতি বস্ত্র হতে পারে, কালো রঙে পাওয়া যেত। এসব বস্ত্রের অধিকাংশই রপ্তানি হতো চীনে। বাংলায় রেশমগুটি থেকে রেশমি সুতা উৎপাদন করা হতো কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে রেশমি নকশি-কর্ম ও মহিলাদের মস্তকাবরণ হিসেবে ব্যবহূত চৌকানো কাপড়ের মতো রেশমি বস্ত্র যা শাড়ি ও ধুতিকে বোঝায়, এখানে উৎপাদন করা হতো। শন ও রেশম দিয়ে বোনা এক ধরনের মোটা রেশমি বস্ত্রও তৈরি করা হতো।

চৈনিকরা তুঁতগাছের বাকল থেকে তৈরী অত্যন্ত পাতলা ধরনের কাগজের বর্ণনা দিয়েছেন। মালদহ ও উত্তরবঙ্গে এ তুঁতগাছ প্রচুর পাওয়া যেত। চৈনিক পরিব্রাজকরা এ কাগজের চমৎকার মান, ঔজ্জ্বল্য ও মসৃণতার কারণে একে সাদা কাপড়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন।

চীনের রূপা ও সোনার প্রতি অন্যান্য এশীয় জাতির আকর্ষণ এত বেশি ছিল যে, তারা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। উপহার হিসেবে এবং খোলা বাজারে বিক্রির জন্য চীনে সব ধরনের পণ্য পাঠাতে বাংলার দরবার কালিকট (Kozhikode), হরমুজ, এডেন এবং জুফার (Zufar) এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। এ প্রতিযোগিতায় বাংলা অন্য অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল। পান্ডুয়ার রাজদরবার সাটিন বস্ত্র, রঙিন টাফেটা, নীল ও সাদা চীনামাটির বাসন- কোসন, কস্ত্তরি, সিঁদুর, পারদ, ঘাসের তৈরী মাদুর, তামার মুদ্রা আমদানি করত। বিনিময়ে পরিমাণের অতিরিক্ত পণ্যের মূল্য সোনা ও রূপায় গৃহীত হতো। বাংলা দুধ-সাদা বফত-এর মতো মসলিন, মুক্তা, দামি পাথর, ঘোড়া, সোনা ও রূপার কাজ যুক্ত ঘোড়ার জিন, সোনার খোদাই কাজ করা আলোনিরোধক, চওড়া বস্ত্র সকেলত (sakelat), সফ (sof) [মঙ্গল কাব্যে ‘সকলত’ কম্বল রূপে উল্লিখিত] নামে অভিহিত পশমি বস্ত্র, গন্ডারের শিং, সারসের মাথা, মাছরাঙার পালক, স্ফটিক-স্বচ্ছ চিনি, কুন্দু, কালো মোটা সুতি কাপড়, সুতি মখমল, টিয়া পাখি, টিয়া পাখির ঠোঁট, মোটা রসালো লতা, ঘারুকাঠ, তিলের তেল (অথবা ধূপ), খয়ের, আবলুস কাঠ, লাল বা হলুদ কাঠ, সুপারি এবং গোলমরিচ রপ্তানি করত।

এ তালিকা থেকে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, মুক্তা, ধূপ, চওড়া বস্ত্র, পশমি বস্ত্র এবং গোলমরিচের মতো পণ্য বণিকরা পান্ডুয়া থেকে আবার রপ্তানি করার জন্য বাইরে থেকে আনত। রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় বণিকদের কার্যকর সংঘই এ আকারে এ সব পণ্য দ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনাকে ফলপ্রসূ করেছিল।

জাহাজের মালিক এমন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই রাজদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। পদ-মর্যাদা জানা যায় না এমন একজন, সৈয়দ মুহম্মদ ১৪০৯ থেকে ১৪২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একটানা পাঁচ জন সুলতানের প্রধান দূত হিসেবে চীনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজধানীতে উত্থান-পতন তাঁর ভাগ্যকে প্রভাবান্বিত করে নি।

এ দুদেশের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে বাংলা প্রথম উদ্যোগ নেয়। কারণ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ফলে বাংলা লাভবান হয়েছিল। অসামরিক ও সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য চৈনিকদের কাছে বাংলার মসলিন ছিল একটি অত্যন্ত প্রিয় পণ্য দ্রব্য। এমনকি কর্মকর্তাদের বেতনের একাংশ মসলিনে পরিশোধ করা হতো। এ আমলে চীনে কর হিসেবেও মসলিন গ্রহণ করা হতো।

প্রাচীরঘেরা পান্ডুয়া নগরের ও শহরতলির বাজারগুলিতে চৈনিকসহ বিভিন্ন স্থানের ও জাতির বণিকদের দেখা পাওয়া যেত। রৌপ্য মুদ্রা ভর্তি থলি নিয়ে এরা পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করত। এ মুদ্রাগুলির প্রত্যেকটির ওজন ছিল প্রায় ১১.১৯ গ্রেন এবং এর আয়তন ছিল ৩.৭৫ সেন্টিমিটার (চৈনিক প্রতিবেদন অনুসারে, যা আমাদের জাদুঘরগুলিতে রক্ষিত নিদর্শনগুলির ওজন ও মাপের সঙ্গে অভিন্ন)। এদের মধ্যে কালো ও ফর্সা উভয় বর্ণের মানুষ ছিল। ব্যবসায়ে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দশ হাজার স্বর্ণ (মুদ্রা) ও তার চেয়েও বেশি। একবার চুক্তি হয়ে গেলে তারা কখনোই সেটা ভঙ্গ করত না। রাস্তার বাজারগুলিতে স্নানাগার, পানশালা, খাদ্য ও মিষ্টির দোকান ইত্যাদির মতো সব ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিপাটিভাবে বিন্যস্ত ছিল। ফলে খরিদ্দার ও বণিকরা তাদের পছন্দমতো নিজেদের আপ্যায়ন বা শীতল করতে পারত।

কড়ি ছিল গরিবদের মুদ্রা। জাহাজ বোঝাই করে মালদ্বীপ থেকে বাংলা ও উড়িষ্যা, দুদেশেই কড়ি পাঠানো হতো। ওজন করে কড়ি বিক্রি হতো। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে এক রৌপ্য মুদ্রায় প্রায় ১০.৫২০টির মতো কড়ি পাওয়া যেত।

পান্ডুয়ার রাস্তায় শিশুরা বাঘের খেলা উপভোগ করত যেখানে দর্শকদের উপস্থিতিতে পশুটিকে ছেড়ে দেওয়া হতো। বাঘটি তখন মাটিতে উবু হয়ে বসত এবং ক্রীড়াপ্রদর্শনকারীর চাবুকের আঘাত খেয়ে গর্জন করত ও ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারা এ খেলার অনুকরণ করত এবং এরপর পশুটির মালিক বাঘের মুখে নিজের হাত ঢুকিয়ে দিত, তবে সে কোনোরকম ব্যথা পেত না। অবশ্য সন্দেহ হতে পারে যে, এ পশুটি বাঘ নয়, চিতা বা একই রকম প্রজাতির হয়ে থাকবে। এটাই ছিল ভারতে সার্কাসের সর্বপ্রথম সাক্ষ্য।

পনেরো শতকের প্রথমভাগে চৈনিকরা পান্ডুয়াকে ছোট এক গ্রাম থেকে সামরিক রক্ষী সেনাসহ রাজধানী নগরীতে রূপান্তরিত হতে দেখেছেন। এরপর তারা একে প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হতেও দেখেন। দেশি লোক, রাজপরিবারের সদস্য, পশ্চিমের বিদেশি নাগরিক - যাদের কেউ কেউ ছিলেন স্থায়ী বাসিন্দা, কেউ কেউ ছিলেন অস্থায়ী বাসিন্দা এ নিয়ে গঠিত ছিল পান্ডুয়ার জনসমষ্টি।  [হরপ্রসাদ রায়]

গ্রন্থপঞ্জি  PC Bagchi, ‘Political Relations between Bengal and China in the Pathan Period’, Viswa-Bharati Annals, I, 1945; Feng Chengjun (ed), Xingcha Shenglan Jiaozhu (Overall Survey in the Starry Raft by Fei Xin, 1436), reprint, Taipei, 1970; Feng Chengjun (ed), Yingyai Shenglan Jiaozhu (Ma Huan’s Overall Survey of the Oceans Shores, 1433), Reprint, Taipei, 1970; Haraprasad Ray, Trade and Diplomacy in India-China Relations: A Study of Bengal during the Fifteenth Century, New Delhi, 1993.