চৈতন্য সাহিত্য


চৈতন্য সাহিত্য  আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ধর্মীয় পুরুষ কৃষ্ণ চৈতন্য ওরফে বিশ্বম্ভর মিশ্রকে (১৪৮৬-১৫৩৩) নিবেদিত বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্য বাংলাভাষী অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মীয় সাহিত্যের বৃহত্তম উপধারা গঠন করেছে। ষোল শতকে সূচিত এ সাহিত্য তিনটি অতি সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করেছে: বাংলা, সংস্কৃত ও উড়িয়া ভাষায় রচিত চরিতাখ্যানমূলক রচনা; কৃষ্ণের ভক্তি মাহাত্ম্যজ্ঞাপক পদাবলি, প্রধানত বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় এবং কিছু সংস্কৃতে; এবং এসব উৎস থেকে আহূত তাঁর জীবন কথার বিবরণ, মূলত বাংলা ও ইংরেজি গদ্যে, এবং অন্যান্য দেশিয় ভাষায়ও। উনিশ শতকে মুদ্রণ যন্ত্রের ব্যাপক প্রচলনের কারণে শেষোক্ত ধারাটি উদ্ভূত হয়েছে। গত শতকে কখনও কখনও কৃষ্ণের জীবনের কথা কাহিনী উপন্যাস, নাটক ও কাব্য রূপে প্রকাশিত হয়েছে।

এ সাহিত্যের আদিতম রূপগুলি চৈতন্যজীবনীর ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের প্রাথমিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যে কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যধারায় রচিত সাধুসন্তজীবনীর মতো এখানেও বর্ণনা একটি বিশেষ আদর্শায়িত আঙ্গিকে করা হয়েছে যা একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের বিশ্বাস দ্বারা ততখানিই রূপ লাভ করেছে যতটা বাস্তবে যা ঘটেছে তার সঠিক বিবরণে পাওয়া যায়। ভক্তদের ভক্তি প্রকাশের জন্য একটি আদর্শ তৈরি করার উজ্জীবনমূলক কাজে, চৈতন্যের ব্যক্তিজীবনের কর্মাবলি বয়ানের মাধ্যমে বৈষ্ণব ধর্মের শিক্ষালাভে এ সাহিত্যের ভূমিকা অনেক মহৎ এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অনুভূতির কাছে এ জীবনী গ্রন্থগুলি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ষোল শতকে রচিত জীবনী গ্রন্থগুলি চৈতন্যের প্রতি নিবেদিত সেরা রচনা হিসেবে পরিচিত। এ ধারার সূচনা হয় মুরারি গুপ্তের সংস্কৃত কৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃত দিয়ে, যা চৈতন্যের তিরোধানের অল্প কিছুদিন পরে সমাপ্ত হয়। নবদ্বীপে চৈতন্যের জ্যেষ্ঠ সহচর হিসেবে মুরারি পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁর আখ্যান যা প্রায়শ ‘কড়চা’ অর্থাৎ ‘নোট বই’ বা ‘দিনপঞ্জি’ নামে কথিত, চৈতন্য জীবনের মানসম্মত ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জি রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর আদর্শ পরবর্তী সকল জীবনীকার কর্তৃক অনুসৃত হয়েছে। মুরারি গুপ্ত হলেন প্রথম জীবনীকার যিনি চৈতন্যকে পরম দিব্য পুরুষ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন। মুরারির গ্রন্থ প্রকাশের এক দশক কাল শেষ হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে চৈতন্যের বিখ্যাত পরিকর নিত্যানন্দ তাঁর তরুণ ভক্ত বৃন্দাবন দাসকে বাংলায় চৈতন্য ভাগবত লিখতে আদেশ দেন। তর্ক সাপেক্ষে সবচেয়ে জনপ্রিয় চৈতন্য জীবনীগ্রন্থ এবং যার মধ্যে রয়েছে নদীয়াতে চৈতন্যের দিনগুলির বর্ণনা, সে ২৫,০০০ চরণবিশিষ্ট চৈতন্য ভাগবত ভক্তিকুসুমের প্রস্ফূটনকে এমন এক শৈলীতে ধারণ করেছে যা ছিল পার্থিব এবং তড়িৎ চমকিত, এবং তা এতটাই যে, এর গ্রন্থকার চৈতন্য লীলার ব্যাস হিসেবে আখ্যাত হয়েছেন। শ্রীবাসের গৃহপ্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কীর্তনের আসর সম্পর্কে তাঁর বর্ণনা ছিল চৈতন্যের নব স্বীকৃতি প্রাপ্ত দিব্য পুরুষ মর্যদা প্রকাশের প্রাথমিক প্রয়াস, যেখানে স্বয়ং ভগবান ও একই সাথে যুগলাবতার রূপে চৈতন্যকে কৃষ্ণের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।

বৃন্দাবন দাসের বৃহৎ গ্রন্থ সমাপ্তির প্রায় ষাট বছর পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্য চরিতামৃত নামে চৈতন্য জীবনী ধারার সবচেয়ে পরিশীলিত গ্রন্থটি (১৬০০-১৬১২) রচনা করেন। শিরোনাম থেকেই বোঝা যায়, এ পঁ্ুথি কেবল চৈতন্যের কর্মাবলির (চরিত্র) ব্যাপারে নয়, বরং চরিত্রের অর্থমাধুরীর (অমৃত) উপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং এভাবে করতে গিয়ে তা চৈতন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ের শেষ কথা হয়ে উঠেছে। বৈষ্ণব কৃত্য বিষয়ে নির্দেশ, ধর্মতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও ভক্তিবাদের সারবস্ত্ত ২৪০০০ চরণের চৈতন্য চরিতামৃত কেবল চৈতন্য ভাগবত-এর সঙ্গে তুলনীয় এবং এটি খুব সফলভাবে চৈতন্য চরিতাখ্যান রচনার সৃষ্টিধর্মী যুগের অবসান ঘটিয়েছে একটি সূত্র সরবরাহ করে যা দিয়ে ভক্তরা চৈতন্যজীবনীর ইতঃপূর্বকৃত সকল ব্যাখ্যা পড়ে নিতে পারে এবং অসামঞ্জস্য দূর করতে পারে। এ পুস্তকে চৈতন্যকে রাধাকৃষ্ণের যুগলরূপ হিসেবে চিরদিনের জন্য একটি অনন্য একক সত্তায় লীন করা হয়েছে। এ মাহাত্ম্য আজ পর্যন্ত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে প্রাধান্য বিস্তার করে রয়েছে।

চৈতন্য ভাগবত ও চৈতন্য চরিতামৃত-এর মধ্যবর্তী সময়গুলিতে আরও অনেকগুলি কম প্রচারিত চরিতাখ্যান রচিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কবি কর্ণপুরের সংস্কৃত গদ্য রচনা কৃষ্ণচৈতন্য চরিতামৃতম মহাকাব্যম (রচনা ১৫৪২), এবং আরও অনেক পরের নাট্যকর্ম চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটকম (রচনা ১৫৭২-৭৯), লোচন দাসের বাংলা রচনা চৈতন্যমঙ্গল (রচনা ১৫৭০-১৫৮০) এবং জয়ানন্দের জনপ্রিয় অথচ বিতর্কমূলক বাংলা আখ্যান যার শিরোনামও চৈতন্যমঙ্গল (রচনা ১৫৫০-৬০)।

ষোল শতকের শোষার্ধে ও সতেরো শতকের প্রথম পর্যায়ে ‘পঞ্চসখা’ পরিবৃত উড়িয়া ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত চরিতকারেরা চৈতন্যের সাহচর্যপ্রাপ্ত স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের ভিত্তি করে বেশ কিছু বৃহদাকার চরিতগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁরা চৈতন্যের দিব্য রূপকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র উড়িয়া রীতিতে ‘শূন্যতা’ স্থলে জগন্নাথদেবের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন। রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো অচ্যুতানন্দের ধর্মতত্ত্ব ভারাক্রান্ত শূন্য সংহিতা (রচনা ১৫৬০-এর শেষে); এর পরে উল্লেখ্য দিবাকর দাসের জগন্নাথ চরিতামৃত (রচনা ১৫৮০?), ঈশ্বর দাসের চৈতন্য ভাগবত রচনা (১৬৫০-৬০) এ সবগুলিই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে অভিশপ্ত রচনা। বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় অসংখ্য সংক্ষিপ্ত, কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলুপ্ত রচনা রয়েছে।

খুব সঠিক ভাবে সন তারিখের উল্লেখ না করা গেলেও এটি স্পষ্ট যে, চৈতন্য সাহিত্যের আদি রূপ হলো পদ অর্থাৎ গীতিকবিতা, প্রধানত লোক সমক্ষে ও ব্যক্তিগতভাবে আয়োজিত কীর্তনের আসরে এগুলি গীত হতো। পদাবলি রচনা করেছেন নবদ্বীপে চৈতন্যের খুব ঘনিষ্ঠ সহচরেরা, যেমন নরহরি সরকার, শিবানন্দ সেন, মুকুন্দ দাস এবং তাঁর পুত্র রঘুনন্দন এবং বাসুদেব ঘোষ ও তাঁর ভাই মাধব। পরবর্তী প্রজন্মে এঁদের শিষ্যরা, যেমন লোচন দাস, যিনি পদরচনার ঐতিহ্যধারা বজায় রেখেছিলেন। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী সতেরো শতকের শেষের দিকে ‘ক্ষণদাগীত চিন্তামণি’ তে পদাবলির সংকলন করেন।

কোনো কোনো পদে বালক কৃষ্ণের আদলে শিশু বিশ্বম্ভরের বর্ণনা আছে, কিন্তু পদাবলির অধিকতর সাধারণ বিষয় হলো কৃষ্ণের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার যৌবন- চাঞ্চল্য। বৃন্দাবনে গোপীদের সঙ্গে যেভাবে কেলিরত কৃষ্ণকে চিত্রিত করা হয়েছে, সেভাবে নদীয়ার নারীদের সঙ্গে গৌর বা স্বর্ণকান্তি গৌরাঙ্গকেও দেখানো হয়েছে। এ চিত্রণ যাকে সাধারণভাবে বলা হয় গৌরনাগরীভাব, বোধগম্যভাবে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অধিক রক্ষণশীল অংশের পীড়ার কারণ। অধিকন্তু একটি ঘনিষ্ঠ উপধারা যা নদীয়া নাগরীভাব নামে পরিচিত, তা ভক্ত সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছে চৈতন্যকে আরও নিকটে নিয়ে এসেছে। বৃন্দাবন দাস তাঁর চৈতন্য ভাগবতে এ দু ভাবের নিন্দা করেছেন (১. ১০. ১৯৭, ২০৮-১১)। অল্প কিছু পদের নিন্দা সত্ত্বেও পদাবলি সাহিত্য নবদ্বীপে চৈতন্যের অধিবাস কালের সংকটপূর্ণ বছরগুলিতে ভক্তিপূর্ণ জীবনের আদর্শায়িত আবেগমূলক মর্মকথার আকর্ষণীয় আলেখ্য দান করেছে।

এ ধারার সংস্কৃত রচনাগুলিও ষোল শতকে রচিত হয়েছিল। সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবচেয়ে বিশদ রচনা হলো গোস্বামী শিষ্য প্রবোধানন্দ সরস্বতী বিরচিত চৈতন্য চরিতামৃতম, ১২টি দীর্ঘ কবিতায় ১৪৩টি শ্লোক বিশিষ্ট একটি স্ত্ততিমূলক রচনা। অন্যান্য ভক্তিমূলক রচনার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য অষ্টক ও স্ত্রোস্ত কবিতা যেগুলি চৈতন্য জীবনকে গৌরব মন্ডিত করেছে বটে, কিন্তু চৈতন্য বিষয়ক তথ্য এগুলিতে কম। একই কথা বলা যায় গণোদ্দেশ ধারার রচনাগুলি সম্পর্কে, যেগুলিতে চৈতন্য ও তার পার্ষদদের কৃষ্ণের ভুবনের চরিত্রগুলির অনুরূপ করে দেখানো হয়েছে। সহজিয়া কবিরা তাদের বিশেষ তান্ত্রিক অভিমত প্রকাশের জন্য চৈতন্যের ব্যক্তিমাহাত্ম্যকে আত্মসাৎ করেছে। সতেরো শতকের প্রথম দিকে রচিত অকিঞ্চন দাসের ‘বিবর্তবিলাস’, যা এর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী চৈতন্য চরিতামৃতের ধারাবাহিক ভাষ্য। এটি বাদ দিলে অন্য রচনাগুলিতে কোনো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ নেই। এ সব রচনায় চৈতন্যের উপস্থিতি ব্যবহূত হয়েছে প্রধানত সহজিয়াদের কৃত্য ও ধর্মতত্ত্ব বোঝানোর জন্য।

উনিশ শতকের শুরু না হওয়া পর্যন্ত নতুন রকমের চরিত সাহিত্যের উদ্ভব হয় নি। এ সময়ের চরিতাখ্যানগুলি প্রধানত চৈতন্য জীবনীর গদ্যভাষ্য, যার অনেকগুলিই সচিত্র; নব্যশিক্ষিত নাগর অভিজাতদের চাহিদার প্রতি সাড়া দিতে এগুলি রচিত হয়েছিল। এগুলির প্রচারও ছিল সহজ। তাৎক্ষণিক মুদ্রণ সুবিধার প্রতি সাধুবাদ! এ ধারার নাট্যরূপের দৃষ্টান্ত শিশিরকুমার ঘোষের ‘অমিয় নিমাই চরিত’, যা ইতিহাস ও ভক্তির নাট্যিক সংশ্লেষণাত্মক রচনা, চৈতন্য জীবন সম্পর্কে নাট্যকারের ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রকাশরূপ এবং যা মিশ্র গদ্য ও মূল পাঠের উদ্ধৃতিসহ ছয় খন্ডে রচিত। ১৯১০ সালে এ ধারার সর্বশেষ খন্ডের প্রকাশ কাল থেকে আরম্ভ করে পরবর্তী পর্যায়ে গ্রন্থটির বিশটিরও অধিক সংস্করণ ও মুদ্রণ হয়। গৌড়ীয় ঐতিহ্যনির্ভর শত শত গবেষণাকর্ম ও পুনরালেখ্যের মধ্যে ভক্তি ও গুরুতর পান্ডিত্যের মিশ্রণে রচিত দুটি বিশাল কাজ গবেষণা ও প্রজ্ঞার নতুন মান সৃষ্টি করেছে। বৃন্দাবনবাসী ভক্ত হরিদাস গোস্বামী দুখন্ডে সমাপ্ত ১৭৮৪ পৃষ্ঠারও বেশি আয়তনের শ্রী মন্মহা প্রভুর নবদ্বীপ লীলা (প্রথম খন্ড রচনা ১৯১৫) ও লীলাচল লীলা (দ্বিতীয় খন্ড, প্রকাশ ১৯১৯) নামক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।

বহু বছর পরে, তবে অবশ্যই পান্ডিত্যের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়, রাধাগোবিন্দ নাথ চৈতন্যচরিতের বিশদ ঘটনাপুঞ্জ সংগ্রহ করে মহাপ্রভু শ্রী গৌরাঙ্গ (রচনা ১৯৬৩) নামের প্রায় তেরশ পৃষ্ঠার বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। চৈতন্যের জীবনী নাট্যকর্মেও উৎসাহ যুগিয়েছে, যেমন ১৯৫০-এ প্রকাশিত দীলিপকুমার রায়ের ‘শ্রী চৈতন্য: তিন অঙ্কে রচিত নাটক’; এবং অন্যান্য শিল্পরূপেও যেমন কবিতা, চিত্রকলা ও উপন্যাসে। হাতে লেখা পুথি এবং মুদ্রিত রূপে, উভয়ত, চৈতন্যের প্রতি নিবেদিত সাহিত্য রচনা, বাংলাভাষী অঞ্চলে অন্যতম বৃহৎ সাহিত্যশিল্প হিসেবে সমৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে।  [টনি কে. স্টুয়ার্ট]