চৈতন্য ভাগবত


চৈতন্য ভাগবত  বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবত বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সন্তজীবনী গ্রন্থ এবং ধর্মীয় পুরুষ কৃষ্ণ চৈতন্য ওরফে বিশ্বম্ভর মিশ্রের (১৪৭৮-১৫৩৩) অসামান্য জীবনের প্রামাণিক দীর্ঘতম আদি রচনা। জাগতিক রীতিতে রচিত চৈতন্য ভাগবত, যাঁকে ভক্তকুল স্বয়ং কৃষ্ণ হিসেবে বরণ করেছিল, সে চৈতন্যের বিস্ময়কর আবির্ভাব বর্ণনা করেছে। বৃন্দাবন দাস বড় হয়েছিলেন নবদ্বীপে চৈতন্যের ঘনিষ্ঠ পরিকর শ্রীবাসের বাড়িতে। শ্রীবাস ছিলেন বৃন্দাবন দাসের মায়ের দেবর সম্পর্কীয় এবং এভাবে বৃন্দাবন দাস চৈতন্যকে যাঁরা ভালোভাবে জানতেন তাঁদের অভিজ্ঞতায় লাভবান হয়েছিলেন। যদিও চৈতন্য শ্রীবাসের গৃহে অনেক সময় কাটিয়েছেন, তবু ধারণা করা হয়, বৃন্দাবন দাস তখন এতই ছোট ছিলেন যে, ব্যক্তিগতভাবে চৈতন্যের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার কথা নয়। বৃন্দাবন দাসের গুরু নিত্যানন্দ, চৈতন্যের বিতর্কিত সহযোগী, চৈতন্যের মৃত্যুর (১.১.৬০-৬১; ২.২.৩৩৯-৪০) অল্পদিন পরে গ্রন্থটি রচনার অনুমতি দিয়েছিলেন। পন্ডিতদের মতে, এ গ্রন্থ সমাপ্ত হয়েছে ১৫৪০-এর মধ্যে যখন বৃন্দাবন দাস বিশ বছর বয়সী হবেন।

গ্রন্থটি চৈতন্যের শৈশব লীলা এবং তাঁর জন্মের পূর্বে বাংলার অবস্থা থেকে আরম্ভ করে সংসারত্যাগী হয়ে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। কাহিনিতে রয়েছে সংক্ষিপ্ত ছোট ছোট ইতিবৃত্ত যার মধ্যে পালাক্রমে দ’ুধরনের আখ্যান পাওয়া যায়। প্রথম ধরনের আখ্যান হলো সে সম্পর্কিত কাহিনী যা অদ্যাবধি বর্তমান চৈতন্যের প্রথম চরিতগ্রন্থ মুরারি গুপ্ত রচিত সংস্কৃত কৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতম-এ বা মুরারি গুপ্তের কড়চায় মূল ঘটনাক্রম অনুসারে প্রতিষ্ঠিত। এ আখ্যানমূলক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে চৈতন্যের জীবনবৃত্তের প্রধান প্রধান ঘটনার বিস্তৃত বর্ণনা, যেমন তাঁর জন্ম, টোলে গমন, প্রথম বিয়ে এবং চৈতন্যকে ঘিরে ভক্ত সম্প্রদায়ের ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠা। দ্বিতীয় ধরনের আখ্যান হলো ওই  বর্ণনাত্মক কাঠামোর মধ্যে ইতস্তত ছড়ানো চৈতন্যের জীবনের প্রতিনিধিত্বমূলক ঘটনার নির্দেশক ক্ষুদ্র কাহিনিমূলক রচনা। এ ক্ষুদ্র উপাখ্যানগুলি ভক্তিবাদের প্রাথমিক পাঠ হিসেবে উপযোগী। এতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে কিভাবে ভক্তিবাদী কর্মের মূল রূপগুলি ফুটে উঠল, যেমন চৈতন্যের সহচর শ্রীবাসের বাড়ির উঠোনে কীর্তনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটে; অথবা কিভাবে ভক্তরা বিভিন্ন পন্থায় মূর্ত প্রেমের নির্ভুল প্রতীককে বরণ করে।

চৈতন্য ভাগবতের তাৎপর্য চৈতন্যের আদি জীবনলীলা বর্ণনার প্রাথমিক উৎস হিসেবে এর ভূমিকাকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে। গ্রন্থটি সন্তজীবনী রচনার এমন এক মান তৈরি করেছে যা কেবল এর মৌল উপাদান ও সংগঠনের দিক থেকে নয়, ধর্মতত্ত্বের দিক থেকেও পরবর্তী অসংখ্য চৈতন্য চরিতকারের দ্বারা অনুকৃত হয়েছে। বৃন্দাবন দাস দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন চৈতন্য কেবল একজন অবতার নন অর্থাৎ পৃথিবীতে কৃষ্ণের সাধারণ কোনো আগমন ঘটে নি; বরং তিনি স্বয়ং ভগবান, ঈশ্বর, যিনি যুগের প্রয়োজনে ভক্তির নতুন আদর্শ স্থাপন করেছেন। পরবর্তী সকল লেখক চৈতন্যকে ভক্তির রূপাদর্শ ও একই সঙ্গে ভক্তির পাত্র হিসেবে ওই  দাবি মেনে নিয়েছেন।

বৃন্দাবন দাসের অনুসারীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ যিনি চৈতন্য ভাগবতের গঠন বিন্যাস অনুকরণ করেছেন, বৃন্দাবন দাস প্রদত্ত চৈতন্যের আদি জীবন লীলার ঘটনাক্রম পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো যে, তিনি দাবি করেন, বৃন্দাবন দাস যে কাহিনী শুরু করেছিলেন তার সমাপ্তি ঘটেছে তাঁর নিজের রচনায়। এ প্রত্যক্ষ অনুকরণ ও জোড়া মেলানোর কাজ একটি সম্প্রদায় যে ভাবে চৈতন্যের জীবন পাঠ ও বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিল তার উপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। চৈতন্য ভাগবতে পাওয়া গেল অবিমিশ্র সারল্যে চৈতন্যের আদি জীবন, ভক্তির উদয় এবং একটি সম্প্রদায়ের আদি অবস্থা যখন সে সম্প্রদায় মাত্র আবিষ্কার করছিল যে, সে একটি নতুন ধর্মীয় ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, চৈতন্য চরিতামৃত চৈতন্যের অন্ত্য জীবনলীলার আলেখ্য, তীর্থ ভ্রমণে চৈতন্যের কঠোর সন্ন্যাসব্রত যাপনের বছরগুলি, পরবর্তী সময়ে পুরীর বৈষ্ণবনগরে ভক্তি-উন্মাদনা এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চৈতন্যের জীবনের একটি সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত ব্যাখ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে। দু’টি গ্রন্থ যুগপৎ চৈতন্য চরিতাখ্যানের কার্যকর সূচনা করেছে এবং এ সাহিত্যের সৃষ্টিশীল সময়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, প্রত্যক্ষ ও স্পন্দিত ভাষায় চৈতন্যের আবির্ভাবের অলৌকিক বিস্ময় বর্ণনা চৈতন্য ভাগবতকে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অধিগম্য ধর্মজীবনী গ্রন্থে পরিণত করেছে। কৃষ্ণদাস নিজেই বার বার বৃন্দাবন দাসকে চৈতন্যের জীবন কথার ব্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সেভাবে তিনি আজও বিশিষ্ট হয়ে আছেন। ভাগবত পুরাণ চৈতন্যের আত্মস্বরূপ কৃষ্ণের জন্য যা করেছে চৈতন্য ভাগবত চৈতন্যের জন্যও তা-ই করেছে।

মূল পাঠটি ইতস্তত ছড়ানো প্রায় একশ সংস্কৃত শ্লোকসহ বারো হাজার তিনশরও (১২, ৩০০) বেশি বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী চরণ বিশিষ্ট এবং এটি তিন খন্ডে বিভক্ত। আদি খন্ডে শুরু হয়েছে ওই  এলাকায় ভক্তিবাদের বিলুপ্তিতে অদ্বৈত আচার্যের দুঃখ প্রকাশ এবং এ ভাবে তা পাঠককে নিয়ে যায় চৈতন্যের জন্ম ও শৈশব জীবনে যা কৃষ্ণের শৈশব মনে করিয়ে দেয় (১. ১-৩), তারপর তরুণ বিশ্বম্ভরের টোলে পাঠ গ্রহণ (১. ৪-৫) লক্ষ্মীপ্রিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে (১.৭) এবং বহু পন্ডিতকে ধরাশায়ী করার (১. ৮-৯) বিবরণ। চৈতন্য পূর্ববঙ্গে তাঁর সে বিখ্যাত ভ্রমণে যান, ফিরে আসেন বিপত্নীক হিসেবে এবং পরে বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করেন। খন্ডটি শেষ হয়েছে পিতার পিন্ড দান করার জন্য চৈতন্যের গয়া ভ্রমণে। এ ভ্রমণে তিনি ঈশ্বরপুরীর সঙ্গে দেখা করেন এবং দিব্যোন্মাদ (১.১২) হয়ে যান। পাশাপাশি অন্য আখ্যানে নিত্যানন্দের অতীত পটভূমি ও হরিদাসের দুঃখ দুর্দশার (১. ১১) বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

মধ্য খন্ডে আছে ভক্তির জাগরণের তথ্য বিবরণ এবং ধর্মানুরাগী অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দ, হরিদাস, শ্রীবাস, মুরারি, বিদ্যানিধি প্রমুখের এক এক করে যোগ দেওয়াতে এবং কীর্তনের নাচে ও গানে উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে নবদ্বীপে যে বৈষ্ণব সম্প্রদায় ক্রমশ একীভূত হচ্ছিল সে বিশেষ কালের বর্ণনা। মধ্য খন্ডের শেষ অর্ধাংশে রয়েছে দুই দুষ্কৃতকারী জগাই-মাধাইয়ের সে বিখ্যাত রূপান্তর (১. ১৫) এবং কীর্তনের শোর গোল নিয়ে স্থানীয় কাজীর সঙ্গে চৈতন্যের দ্বন্দ্বের কথা; তবে এ খন্ড শেষ হয়েছে চৈতন্যের অস্থিরতা প্রকাশে এবং পরিণামে তাঁর সংসার ত্যাগের প্রসঙ্গ দিয়ে। অন্ত্য খন্ডে চৈতন্যের মা শচীর শোক, চৈতন্যের সংসার ত্যাগের পরপরই সাধারণ কিছু বিভ্রান্তি (৩.১), এবং দক্ষিণে তীর্থযাত্রা শুরু করার আগে তাঁর পুরীভ্রমণ ও সার্বভৌমের সঙ্গে প্রাথমিক সাক্ষাৎকার (৩. ২-৩) ইত্যাদির বর্ণনা আছে। পুঁথিটির বাকি অংশে প্রথাগতভাবে যাঁরা পুরীতে চৈতন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করেছিলেন, বিশেষ করে নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈত আচার্য রাঘব, গদাধর, শ্রীবাস প্রমুখও; এবং পুরীতে ভক্তবৃন্দের বার্ষিক তীর্থযাত্রা ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে (৩. ৯-১১)।

পুঁথিটি আকস্মিকভাবে পরিসমাপ্ত হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এ হাতে লেখা পান্ডুলিপি চমৎকারভাবে সবকিছুর সঙ্গতি বজায় রেখেছে। মুদ্রিত সংস্করণ বিষয়গত দিক থেকে প্রায় অনুরূপ; যদিও সর্গগুলি, বিশেষ করে আদিখন্ডে, প্রায়শ একটু অন্যরকম ভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থটি সর্বত্র পাওয়া যায় এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সকল দলের মধ্যে সুস্পষ্ট ভূমিকা রাখে।  [টনি কে. স্টুয়ার্ট]

গ্রন্থপঞ্জি  Bhakti Siddhanta Sarasvati Gosvami (ed), Chaitanya Bhùgavata of Vrndavana Dasa (Gaudiya bhasya), 3rd. edn, Calcutta, 475 GA; Radhagovinda Natha (ed), Chaitanya Bhagavata of Vrndavana Dasa, 6 vols, Calcutta, 1373 BS; Bimanbihari Majumdara, Sri Chaitanyacharitera Upadana, Calcutta, 1959.