চার্টার অ্যাক্ট


চার্টার অ্যাক্ট  ব্রিটিশরাজ কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রদত্ত বাণিজ্যিক সনদ। এ সনদ কোম্পানিকে ‘পূর্ব ভারতে’ একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার প্রদান করে এবং এর বলে কোম্পানি ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ভারত শাসন করে। সতেরো ও আঠারো শতকে অনেকগুলি কারণে ব্রিটেনের কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানিকে দূরদেশে ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য সরকার থেকে সনদ (চার্টার) অর্জন করতে হতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বিদেশের ভূমিতে ও সমুদ্রে সকল জলদস্যু ও আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর সহযোগিতা লাভ। এ ছাড়া মহাসাগরীয় বাণিজ্য ইংল্যান্ডের রাজার জন্য ছিল একটি আয়ের উৎস। ব্রিটিশ কোম্পানিকে দূরদেশে যেতে হলে তাদেরকে খাঁটি কোম্পানি হিসেবে ব্রিটিশ রাজ্যের নিকট আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ কর প্রদান পূর্বক রেজিস্ট্রি করতে হতো। এ কর ছিল রাজ্যের জন্য একটি বড় আয়ের উৎস। বিনিয়োগকারীদের নিকট দূরদেশে ব্যবসায়-বাণিজ্য আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্রিটিশ রাজা স্বদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যসংক্রান্ত কোম্পানিগুলিকে একচেটিয়া অধিকার প্রদান করার নীতি গ্রহন করা হয়। কোনো কোম্পানিকে একচেটিয়া সনদ মঞ্জুর করার অর্থ হলো, সনদভুক্ত ভূখন্ডসমূহে অন্যান্য ব্রিটিশ বেসরকারি কোম্পানিকে ব্যবসায়ের অধিকার থেকে দূরে রাখা।

১৬০০ সালের শেষ দিনে, ‘দ্য গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব লন্ডন ট্রেডিং ইন্টু দি ইস্ট ইন্ডিজ’ নাম ধারণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি কোম্পানি হিসেবে সনদভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে মূলধন লগ্নিকারীর সংখ্যা ছিল ২১৭। সনদে প্রথম গভর্নর টমাস স্মাইথ ও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ২৪ জনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা ছিল। সনদে বলা হয় যে, প্রতি বছর কমিটিকে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ভারতের সাথে একচেটিয়া ব্যবসায়-বাণিজ্যের অধিকার ১৫ বছরের জন্য প্রদান করা হয়েছিল। এভাবেই একটি বেসরকারি সনদপ্রাপ্ত কোম্পানি কর্তৃক পূর্বদিকে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু হয়। ১৬০৯ সালে কোম্পানি ভারতে স্থায়ী ব্যবসায়-বাণিজ্যের অধিকার অর্জনের জন্য রাজার নিকট আবেদন জানায়। প্রাচ্যদেশে কোম্পানিটির ক্রমশ অগ্রগতি অর্জন ও লাভজনক কার্যনির্বাহের কথা মাথায় রেখে রাজা কোম্পানিটিকে একচেটিয়া অধিকার দিয়ে সনদ প্রদান করতে রাজি হন, যদিও এটা রাজ্যের জন্য অলাভজনক প্রমাণিত হয়। অবশ্য এ অধিকার তিন বছরের নোটিশ দিয়ে প্রত্যাহার করে নেওয়া যাবে বলে বিধান রাখা হয়।

ক্রমওয়েলের শাসনামলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হয়। ক্রমওয়েল কোম্পানির সনদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার এবং ‘পূর্ব ভারতের ব্যবসায়-বাণিজ্য’কে সকলের নিকট উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা চিন্তা করছিলেন। কিন্তু পরিশেষে এটা ‘লং পার্লামেন্টে’র নিকট থেকে একটি নতুন সনদ আদায়ে সমর্থ হয়। এ সনদের শর্ত অনুযায়ী কোম্পানি একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডের সিংহাসনে স্টুয়ার্ট রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা কোম্পানির জন্য শুভ প্রতিপন্ন হয়। স্টুয়ার্ট রাজন্যবর্গ প্রায়শ কোম্পানির নিকট থেকে অর্থ ধার নিতেন কিন্তু তা ফেরৎ দিতেন না। ১৬৬১ থেকে ১৬৮৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যে সনদসমূহ প্রদান করা হয়েছে সেগুলি অনেক দিক থেকে কোম্পানির অবস্থা অধিকতর শক্তিশালী করে। এগুলি কোম্পানিকে মুদ্রাঙ্কন, দুর্গ স্থাপন, প্রাচ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ জনগণের উপর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধ ঘোষণা অথবা শান্তি স্থাপন এবং অ-খ্রিস্টান জনগণের সাথে মৈত্রীচুক্তি গড়ে তোলার ব্যাপারে আইনাী অধিকার প্রদান করে। এ সনদের আওতায় সতেরো শতকের আশির দশকে কোম্পানি মুগল বাংলার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, সতেরো শতকের নববইয়ের দশকে কলকাতায় বসতি স্থাপন করে ও সেখানে দুর্গ গড়ে তোলে এবং আঠারো শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে একটি বিশ্ব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

কোম্পানি কর্তৃক বাংলায় আধিপত্য স্থাপনের পর প্রথম সনদ আইনটি ছিল টাউনশেন্ডের ১৭৬৭ সালের আইন। এ আইন ব্রিটিশ রাজস্ব-দফতরে অধীনতার নিদর্শনস্বরূপ বার্ষিক কর পরিশোধ সাপেক্ষে মুগল সরকার থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানিঅর্জনকে স্বীকৃতি দেয়। কোম্পানি এখন থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এখন থেকে ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত সকল সনদ আইনের লক্ষ্য ছিল ক্রমান্বয়ে কোম্পানির রাজনৈতিক শক্তি ও বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা ক্রমশ ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা। ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাসের দ্বারা পার্লামেন্ট উপনিবেশিক রাজ্যটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ আইনের পরিচালনাধীনে ফোর্ট উইলিয়মএর গভর্নরকে অন্য দুই প্রেসিডেন্সীর গভর্নরের চেয়ে অধিক মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁকে উপাধি দেওয়া হয় ‘বাংলায় ফোর্ট উইলিয়ম প্রেসিডেন্সির গভর্নর জেনারেল’। গভর্নর জেনারেলকে সাহায্য করার জন্য পার্লামেন্ট চার সদস্যের একটি কাউন্সিল বা পরিষদ নিয়োগ করে।

কোম্পানির ওপর ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৭৮১, ১৭৮৪ ও ১৭৯৩ সালের সনদ আইনের আওতায় কোম্পানির রাজনৈতিক কর্মকান্ড হ্রাস পেতে থাকে। ১৭৮৪ সালের সনদ আইনের (পিট-এর ভারত আইন ১৭৮৪) আওতাধীনে গভর্নর জেনারেল বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হন। এ আইনের ধারায় গভর্নর জেনারেলের পদবি পরিবর্তন করে ‘গভর্ণর জেনারেল এ্যান্ড কাউন্সিলের পরিবর্তে ‘গভর্ণর জেনারেল ইন কাউন্সিল করা হয়’ এবং কাউন্সিলেরে ওপর তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি পদাধিকার-বলে কাউন্সিলের সদস্য পদ লাভ করেন। কোনো বড় ধরনের প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না চালিয়ে কলকাতা কর্তৃপক্ষকে একটি স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দেওয়া হয়। এ আইনের মাধ্যমে লডট্ট কর্নওয়ালিসকে গভর্নর জেনারেল-ইন-কাউন্সিল নিয়োগ করা হয়। পার্লামেন্ট কর্তৃক সরাসরি গভর্নর জেনারেলের নিয়োগ ব্যবস্থা কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট খর্ব করে। ১৮১৩ সালের সনদ আইনের ধারা অনুযায়ী ভারতকে অবাধ বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করা হলে কোম্পানি একচেটিয়া অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কোম্পানি অবশ্য তখনও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে একচেটিয়া সুবিধা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ফলে এ অবশিষ্ট সুবিধাটুকুও বিলুপ্ত করা হয়। অতঃপর ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অন্যদের সঙ্গে একই সমতলে অবস্থান করে প্রতিযোগিতা করার পরিবশে সৃষ্টি করা হয়। ১৮৫৩ সালের সনদ আইন কোম্পানির বাণিজ্য অধিকার ও পৃষ্ঠপোষকতাজনিত বিশেষ সুবিধা সব বিলোপ করা হয়। এখন থেকে কোম্পানির সিভিল সার্ভিসের বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগদানের ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৫৩ সাল থেকে কোম্পানি পার্লামেন্ট কর্তৃক বেঁধে দেওয়া নিয়মানুযায়ী ইংল্যান্ডের রাজা ও পার্লামেন্টের পক্ষে ভারত শাসন করার বিধান হয়। কোম্পানির প্রকৃত ক্ষমতা বলতে এখন তেমন কিছু রইলো না। পরিশেষে, ১৮৫৮ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোম্পানিকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে কোম্পানি শাসিত ভারতকে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে আনা হয়। এ আইনের ধারা অনুযায়ী ভারতের গভর্নর জেনারেলের উপাধি পরিবর্তন করে ‘ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয়’ করা হয়। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ভারত সচিব খেতাব নিয়ে  গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয়ের মাধ্যমে ভারত শাসন শুরু করে।  [সিরাজুল ইসলাম]