চারু ও কারুশিল্প


চারু ও কারুশিল্প বাংলার ইতিহাসে নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন চারু ও কারুশিল্প। বগুড়ার মহাস্থান গড়, কুমিল্লার ময়নামতি এবং অতি সম্প্রতি ২০০১ সাল থেকে নরসিংদি জেলার ওয়ারি বটেশ্বরীর খনন কার্য এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খ্রিস্টপূর্ব আনু. ৫০০ অব্দ থেকে জনপদের প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীগণ মৃৎশিল্প, লৌহনির্মিত হাতিয়ার, কাঠের তৈরি বস্ত্তসামগ্রী, নানা প্রকার কৃষিসামগ্রী, ধর্মীয় ও গৃহকার্যের সামগ্রী প্রস্ত্তত করত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো ধরণের সংস্কৃতির পরীক্ষা নিরীক্ষায় জনসাধারণের তৈরিকৃত চারু ও কারুশিল্পের মূল বিষয়। জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, তাদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ এবং সামাজিক মূল্যবোধের মূল মানদন্ড হচ্ছে হস্তশিল্প সামগ্রী।

চিরায়ত উচ্চমাত্রার শিল্পকলা বাংলার ভাস্কর্য প্রায় হাজার বছর ধরে বাংলার হিন্দু-ভাস্কর্য সৃষ্টি হয় এবং তাঁরই ধারাবাহিকতায় এসময়ে ধর্মীয় ও পটশিল্পের/মূর্তিতত্ত্বের ধারণা উচ্চমাত্রায় পৌঁছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রকার ভাস্কর্য আবিষ্কারের ফলে নানা ধরণের জটিলতার অবসান হয়েছে এবং পাল ও সেন সাম্রাজ্যের ভাস্কর্য সম্পর্কিত গবেষণায় যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূরীভূত হয়ে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

তামা, ব্রোঞ্জ ও পিতলের দেবদেবীর মূর্তি ও হাতে তৈরি শিল্পকর্ম ধাতুবিদ্যায় বৈদিকজ্ঞানের উত্তরাধিকার আজো বাংলার সুন্দর তাম্রনির্মিত চারু ও কারুকলায় বিদ্যমান। ধাতব শিল্পের জন্য বিখ্যাত স্থানসমূহ- রাজশাহীর চাপাই নবাবগঞ্জ, ঢাকার সন্নিকটে ধামরাই, শিমূলিয়া ও সাভার, ময়মনসিংহের ইসলামপুর, দরিয়াবাদ ও টাঙ্গাইল। এছাড়া অন্যান্য স্থানের মধ্যে রয়েছে কাগমারি ও বাঘাইল। মন্দির ও ধর্মীয় উৎসবের জন্য নির্মিত উচ্চ নন্দনতাত্ত্বিক অলঙ্কারের মধ্যে রয়েছে পুষ্পপত্র বা ফুল ও অর্চনার জন্য তাম্রনির্মিত থালা ও বোল, মন্দির-প্রদীপ, পঞ্চপ্রদীপ, নারী আকৃতির প্রদীপ, দেবতাকে জাগ্রত করার জন্য ঘন্টা এবং গরুড়, হনুমান বা পাখির আকৃতি দিয়ে তৈরি হাতঘন্টা। ষাড় বা ময়ূর আকৃতির উপর স্থাপিত বারকোষ (tray), যা মানত রক্ষার্থে নিবেদিত অর্চনা। পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে বিশাল আকৃতির রথকে তামা ও পিতলের বস্ত্ত সামগ্রী দিয়ে সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করা হয়। বাংলার একটি বিখ্যাত চারু ও কারুশিল্পের নিদর্শন দেখা যায় মাদুর বোনা পদ্ধতিতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্মের মধ্যে। এই পদ্ধতিতে তামা ও পিতলের তার দিয়ে ভাতের বোল, ধূপতি ও গ্রাম্য দেবতা তৈরি করা হয় যা পূজা-অর্চনার সময় পাশে রাখা হয়।

বুদ্ধের ব্রোঞ্জমূর্তি, পাহাড়পুর

খোদাইকৃত চারু ও কারুশিল্প কালো পাথরের বিগ্রহ পূর্ব বাংলায় প্রাপ্ত এবং ১৯২০ সাল থেকে ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত পাথর, ব্রোঞ্জ ও কাদামাটি দিয়ে তৈরি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য মূর্তিগুলোকে এনকে ভট্টশালী ‘ঢাকা জাদুঘরে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ভাস্কর্য’ শিরোনামে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে নথিবদ্ধ করেছেন। তাছাড়া তিনি রাজশাহী, কোলকাতা, কুমিল্লা ও রংপুর জাদুঘরে এবং ব্যক্তিগতভাবে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ভাস্কর্যের বিশাল সংগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। শিল্পকলার ঐতিহাসিকগণ বাংলার বৌদ্ধ মূর্তিগুলিকে উচ্চমানের শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকার করেছেন। এগুলো সূক্ষ্ম ও মসৃণ শক্তকণা ও ‘ব্ল্যাক ক্লোরাইট’ নামক শক্ত স্লেটপাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে যা আর্দ্রতারোধক ও মসৃণ খোদাইয়ের জন্য উপযুক্ত।

বুদ্ধের ধাতব মূর্তি

ধাতব-খোদাইকৃত মূর্তি পূর্ব বাংলার চিরায়ত ধর্মীয় শিল্পকলার গঠন আকৃতির পাথর-ভাস্কর্যের সঙ্গে ধাতব-খোদাইকৃত মূর্তির সাদৃশ্য বিদ্যমান। এরূপ ভাস্কর্য ধাতব সামগ্রী, তামা, দস্তা, টিনের সঙ্গে সমানুপাতিক জিঙ্ক, লৌহা ও খাদের সংমিশ্রণে  তৈরি। এসব কাজে রুপার টুকরোগুলোকে খোদাই করে ব্যববহার করা হয় এবং খুব সামান্য ক্ষেত্রে স্বর্ণদন্ড ব্যবহার করা হয়।

ধাতব সামগ্রীর খোদাই কাজে লস্ট-ওয়াক্স পদ্ধতি সম্প্রতি বিস্তারলাভ করেছে এবং সুনামও অর্জন করেছে যা পাথর- খোদাইয়ের সমমানের। ধাতব-সামগ্রীর খোদাই কাজে সুন্দর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার জন্য মনুষ্য আকৃতির কোমলতা অংকন করা হয় হয়।

অলঙ্কার সামগ্রী  বাংলার জনগণের দক্ষ ও নিপুণ কাজের মধ্যে সোনা ও রূপার শিল্পকর্ম ও কামারশালা প্রাচীন যা খ্রি.পূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে শুরু হয়েছিল। অতীতে অলঙ্কার সামগ্রী তৈরি একটি পারিবারিক পেশা ছিল। কারিগররা মন্দির ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও সমৃদ্ধ পরিবার পরিজনের জন্য হাতে তৈরি সোনার সামগ্রী-আতরদানী, গোলাপজলের পাত্র, চামচ, জলের বোল বা গামলা ও তরবারির খাপ ইত্যাদি তৈরি করত।

অলঙ্কার সামগ্রী

বাংলায় বিশেষ দুই ধরণের অলঙ্কার শিল্পকর্মের বিকাশ ঘটে এক. সোনা, রূপা বা তামার তারের সূক্ষ্ম কারুকার্যশোভিত ঝালর যার মধ্যে রয়েছে বালা জাতীয় অলঙ্কার এবং সূক্ষ্ম সোনা ও রূপার পাত দিয়ে তৈরি মেয়েদের ঘাগরা বা স্কার্ট। গ্রামের কারিগর পাতা, ফুল, পাখি, মাছ, চাঁদ, তারা ইত্যাদির অবিকল নকল করে এক বিশেষ ধরণের অলঙ্কার তৈরির বিকাশসাধন করে। তাছাড়া তারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, যেমন, কান, নাক, ঘাড়, বাহু, কব্জি, আঙুল, কোমর, হাটু, গোড়ালি, কপাল, চুল ইত্যাদি রূপা বা সোনা দিয়ে সাজাতো।

চারু ও কারুশিল্পের শ্রেণীবিভাগ ও অবস্থান  ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে চারু ও কারুশিল্পের বস্ত্তসামগ্রী একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা হতো যেমন, ক. দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত সামগ্রী; খ. ধর্মীয় ও উৎসব অনুষ্ঠানের সামগ্রী; গ. ব্যক্তিগত সাজসজ্জার জন্য সামগ্রী; ঘ. সম্প্রদায় বিশেষের প্রয়োজনে স্থাপত্যশিল্প (যাযাবর, আদিবাসী, পশুপালন, কৃষি); ঙ. স্থায়ী গ্রামীণ সম্প্রদায়ের জন্য স্থাপনা; চ. ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দ্রব্য সামগ্রী (মুদ্রা হিসেবে ঝিনুক, ধাতবমুদ্রা ইত্যাদি); এবং ছ, দৃষ্টিনির্ভর আনন্দ, উৎসব ও উপভোগের জন্য সুন্দর সুন্দর দ্রব্যসামগ্রী। হাতে তৈরি এসব শিল্পকর্মের জন্য যাজক সম্প্রদায়, রাজা ও ধনাঢ্য শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।

হিন্দুসমাজ যে পুরোহিততান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি গ্রহণ করে তার প্রভাব চারু ও কারুশিল্পে লক্ষ করা যায়। এসব কাজের দক্ষতা উত্তরাধিকার সূত্রেই প্রাপ্ত হয়, কারণ প্রত্যেক জাতির বা বর্ণের কর্মপ্রণালী সুনির্দিষ্ট ছিল এবং এর কোনো ব্যতিক্রম হতো না। তৎকালীন বিশেষ একশ্রেণী নন্দনতাত্ত্বিক দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করতো। চারু ও কারুশিল্পকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়, যেমন-ধর্মীয় কারুশিল্প, আদিবাসী কারুশিল্প, লোকজ কারুশিল্প, প্রচলিত কারুশিল্প, চিরায়ত উচ্চমার্গের শিল্প, লোকায়ত শিল্প এবং সমকালীন কারুশিল্প।

ধর্মীয় কারুশিল্প  প্রাচীন জনগণের যে সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল সেগুলোই মরমি বিশ্বাসের আবরণে ধর্ম ও সামাজিক প্রথায়, অতিপ্রাকৃত সত্তায় ভীতি এবং দেবতাদের সন্তুষ্টি বিধান ইত্যাদি আকারে প্রবেশ করে। এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পরে এসব দ্রব্যসামগ্রীই পবিত্রবস্ত্ততে পরিগণিত হয়।

কর্মরত শাঁখারি

পূজা অর্চনার জন্য ঝুড়ি-সাজি-ডালা  বিগ্রহ ও মূর্তির উদ্দেশ্যে ফুল ও পাতা ছিটিয়ে দেওয়ার জন্য এক ধরণের ছোট পাত্র যা ফুলের সাঝি নামে পরিচিত। মহিলারা পূজার জন্য এই সাজিতে ফুলপাতা নিয়ে নদীর তীরে বা মন্দিরে যায়।

ঝাড়া বা চালার জন্য পাত্র  কুলা হচ্ছে বেতের তৈরি U আকৃতির পাত্র যা চাল থেকে তুষ ঝেড়ে ফেলা বা চালার জন্য কৃষি সমাজের একটি প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিবাহ ও শিশুর জন্মদিন উৎসবে ব্যবহূত সামগ্রী হিসেবে কুলা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

শঙ্খ-শাখা  হিন্দু বিবাহ অনুষ্ঠানে শঙ্খের তৈরি শাখা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি কনে বিবাহের সময় দাম্পত্যজীবনের শপথ রক্ষার জন্য একজোড়া শঙ্খ-শাখা দুই হাতে পরে।

সিন্দূর  সিন্দূর এক ধরণের লাল পদার্থ যা বিবাহিত মহিলারা বিবাহের প্রতীক হিসেবে সিঁথিতে ব্যবহার করে। এর ধর্মীয় নিহিতার্থ হচ্ছে, যৌনমিলনের মাধ্যমে বিবাহের পূর্ণাঙ্গতা প্রদান ও আইনসিদ্ধকরণ এবং সতীচ্ছদ ভাঙ্গা।

কর্মরত কাসারু

মুকুট/টোপড় শোলার কাঠি দিয়ে তৈরি বহুস্তর বিশিষ্ট মস্তকাবরণী। বিবাহের অন্যান্য পোষাক-পরিচ্ছদের সঙ্গে হিন্দু বরেরা এটি মাথায় ব্যবহার করে।

কনের টায়রা  বিবাহের সময় অবগুণ্ঠন হিসেবে কনে তার কপালে কপালি পরিধান করে। শোলার কাঠি দিয়ে তৈরি কপালির দুই পাশ দিয়ে ঝলমলে ঝুলন্ত ঝালর থাকে।

মালা  শোলা গাছের পাতলা কাঠি সূক্ষ্মভাবে টুকরা ও বাঁকা করে এবং তার মধ্যে ফুলের পাপড়ি আঠা দিয়ে লাগিয়ে মালাকার নামে পেশাজীবী শিল্পীরা মালা তৈরি করে যা বিবাহ উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিবাহের বর ও কনে উভয়ে মালা বদল করে বিবাহ কাজ সম্পন্ন করে।

কব্জী রাখি-বন্ধন  বিশ্বস্ততার শপথ হিসেবে হাতের কব্জিতে ব্যবহূত পাকানো সুতার বন্ধন। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি সাধারণত বিবাহের পূর্বে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে করা হয়।

শঙ্খ  হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান-বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু, বিজয়, পূজা ইত্যাদিতে শঙ্খধ্বনি করা হয়। বিবাহে শঙ্খ থেকে তৈরি কনের শাখাকে একটি পবিত্র বস্ত্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।

রথ ও মন্দির আচ্ছাদন রথকে সজ্জিতকরণের জন্য কাপড় কেটে সেলাই করে নকশি করা হয় এবং কাপড় দিয়ে দেবতার বেদীর চারপাশ ঢেকে দেওয়া হয়। কাপড়েরর এসব রেখাচিত্রের মূল শিল্পকর্ম যে দেবতাকে পূজা করা হয় তার মূল গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করেই অঙ্কন করা হয়। দেবতা জগন্নাথের সম্মানে ধামরাইয়ে বাৎসরিক রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের পূর্বে রথকে সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করা হয়।

পিতল, কাসা ও মিশ্রধাতু  ইন্দো-গঙ্গা উপত্যকার সভ্যতায় প্রথম সুসংগঠিত সমাজব্যবস্থার পত্তনের শুরু থেকে এই এলাকার শিল্পীদের একটি প্রাচীন পেশা ছিল মন্দিরের পূজার জন্য হাতে নির্মিত কারুশিল্প তৈরি করা। ধর্মীয় উৎসবের দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে ছিলা ঘন্টা, কাঁসি, সংগীতের বাদ্যাদি, জল-কলস, বোল, থালা, তৈল প্রদীপ, দন্ডায়মান প্রদীপ ও অগণিত ব্রোঞ্জের প্রদীপ, রূপা ও সোনার মালা।

আদিবাসী রমনীর বস্ত্র বুনন

উপজাতি কারুশিল্প উপজাতি সমাজের জনগণ পূজা ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন প্রকার চারু ও কারুশিল্প তৈরি করে। প্রতিটি উপজাতি সম্প্রদায়ের জনগণ ভিন্ন ভিন্ন চারু ও কারুশিল্প তৈরি করে। পবিত্র বস্ত্রসামগ্রী এবং এর বুনন কৌশলের কারণেই হাতে তৈরিকৃত ধর্মীয় দ্রব্যসামগ্রী হিসেবে এগুলোর মূল্য প্রদান করেছে। হাতে তৈরি কাপড়, প্রাকৃতিক রং, প্রাচীন তাঁত, এবং গুপ্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাংলাদেশের উপজাতি সম্প্রদায়ের বস্ত্রশিল্পের অন্যন্যতা প্রদান করেছে। প্রতিটি উপজাতি তাদের নিজস্ব চারু ও কারুশিল্প তৈরি করে যা তাদের পূজা অর্চনায় ব্যবহার করা হয়।

আদিবাসী সমাজের জনগণ প্রকৃতি থেকে ধারনা নিয়ে বিশেষ ধরনের অলঙ্কার ও অন্যান্য শিল্প সামগ্রীর আকার ও নকশা তৈরি করে। মাকড়সার জালের মতো কানের দুলকে ‘মাকড়’ এবং বৃশ্চিকের পায়ের মতো শত জোড়া বিশিষ্ট রূপার তারের কোমর বন্ধকে ‘বিচ্ছু’ বলে। হাজার বছর পূর্বে আসাম, তিববত, বর্মা ও মঙ্গোলিয়ার বংশোদ্ভূত উপজাতি সম্প্রদায়ের আগমনের ফলে এখানকার নকশায় বৈচিত্র্য লাভ করেছে। এসব কাজে পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পের বিশিষ্টতা থাকলেও কোনোটিতেই প্রতীক বা ধর্মীয় গুরুত্বের অভাব নেই।


বালি

নাগফুল (নাক ফুল)  নাক সাজাবার জন্য বা পাশের নাকের ছিদ্রে ব্যবহূত এক প্রকার অলঙ্কার বিশেষ। এর আকৃতি ক্ষুদ্র তারকার মতো।

সোনার নাকফুল/সোনা নথ  বাম দিকের নাকের ছিদ্রতে ব্যবহার্য বোতাম সদৃশ গুলিকা বা ঘন্টির মতো এক প্রকার অলঙ্কার বিশেষ। এর আকৃতি বিভিন্ন প্রকার ফুল বা জ্যামিতিক আকৃতির হয়ে থাকে। কানের শেষপ্রান্তে ছিদ্র করা স্থানে ব্যবহূত এক প্রকার কানের অলঙ্কার। এর আকৃতি সাধারণ আংটির মতো হয়ে থাকে।

কানের দুল উপমহাদেশের সর্বত্র ব্যবহূত সাধারণ কানের অলঙ্কারের মতো। এটি ছিদ্র করা অংশে বা হুক দিয়ে কানে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

হাজা ফুল  ফুলের পাপড়ি সদৃশ কানের দুল। এটি একটি স্ক্রু বা পুশ দিয়ে কানে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কান ফুল  তারা আকৃতির এক ধরণের কানের অলঙ্কার যা কানের ছিদ্র করা স্থানে পরিধান করা হয়।

ঝুংগা উপমহাদেশীয় ঝুমকা সদৃশ। এর আকৃতি ঘন্টার মতো, তবে ঝুলন্ত ছোট ছোট বল থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। এই অলঙ্কার কানে ঝুলিয়ে পড়তে হয়।

আদিবাসীদের অলঙ্কার ঝুমালি  চেপ্টা ফুল আকৃতির সোনা বা রূপার কানের দুল। একটি ছোট হুক দিয়ে কানের ছিদ্র করা স্থানে পরিধান করা হয়।

আজুলি/হনডুলি  চেপ্টা রূপার টুকরা দিয়ে তৈরি অর্ধচন্দ্রকার আকৃতি বিশিষ্ট কণ্ঠহার। এই অলঙ্কারকে বাড়িয়ে অর্ধ-বৃত্তাকারে গলার চারদিকে পরিধান করতে হয়।

টেংগা/টাকা চারা রূপার মুদ্রা দিয়ে তৈরি এক ধরনের কণ্ঠহার। এই অলঙ্কার পাকানো কাপড়ের সুতা দিয়ে বুনন করা হয়। এই ধরণের অলঙ্কারকে ‘আধূলি চারা ও সিকি চারা’ বলা হয়।

চিকচারা  সোনার বা রূপার তৈরি এক ধরণের গলবন্ধ জাতীয় গলার অলঙ্কার বিশেষ।

আলচারা এটি বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি অলঙ্কার। ছোট ফুলদার আকৃতির রূপার টুকরা দিয়ে তিনটি লম্বা শিকল তৈরি করে রূপার ত্রিমুখী টুকরা দিয়ে এর মাথাগুলো আটকানো হয়।

চন্দ্রহার চন্দ্রহার দেখতে প্রাচীন বৈদিক-হিন্দুদের তৈরিকৃত গলার হারের মতো। বক্ষ সজ্জার জন্য রূপা বা সোনার লম্বা তারের টুকরা দিয়ে তৈরি এই অলঙ্কার বড় গোলাকার পদকের মতো অর্ধবৃত্তাকারে গলা থেকে শিকলের সাহায্যে বক্ষে ঝুলে থাকে।

তাজজুর  বালা আকৃতির গোলাকার বাহু বন্ধনী। কিন্তু এর একটি অংশ চেপ্টা এবং মূল্যবান পাথর খচিত থাকে।

তেলুলি চারা  এটি তাজজুরের সদৃশ। উপমহাদেশে এই অলঙ্কারকে বাজুবন্ধ বলে। পৃথক পৃথক রূপার টুকরা দিয়ে বাহুবন্ধ তৈরি করা হয় ও কাপড়ের সুতা দিয়ে শক্ত করে বাধা হয়।

বাংগুরি বাংগুরি হচ্ছে মোটা রূপার বলয় বিশিষ্ট অলঙ্কার যা বালার মতো কব্জিতে পরা হয়।

চুড়ি মাঝারি ধরণের পুরু বিশিষ্ট নকশা খচিত স্বর্ণের তৈরি অলঙ্কার।

আংটি আঙুলে পরার জন্য পাথরখচিত বা সাধারণ গোলাকার অলঙ্কার বিশেষ।

থেংগাককারু/পেয়ার কারু  নূপুর বা মল জাতীয় পায়ের অলঙ্কার বিশেষ। এই অলঙ্কার রূপা দিয়ে তৈরি ও একজোড়া হয়। এর ওজন প্রায় ৪০ তোলা পর্যন্ত হয়। বৃত্তাকার অংশটি পায়ের আঙ্গুল থেকে গোড়ালি পর্যন্ত সহজেই পরা যায়।

জলতরঙ্গ এটি থেংগাককারু অলঙ্কারের সদৃশ, কিন্তু ওজনে হালকা। কারণ এটি পাইপের মতো ভিতরে ফাপা। এই অলঙ্কারের উপরিভাগ কারুকার্য খচিত।

ঝুনঝুনি রূপার বলয় আকৃতির। এর বাঁকানো শিকলের সঙ্গে রূপার ছোট গোলাকার বলসংযুক্ত থাকে যা শিশুরা কোমরে পরিধান করে।

গুণগুরু  শিশুদের পায়ের নূপুর বা মলের মতো অলঙ্কার বিশেষ। এই অলঙ্কারের রূপার বলয়ের সঙ্গে ছোট ছোট বল বা ঘন্টা যুক্ত থাকে। শিশু হাঁটার সময় বা হামাগুড়ি দিয়ে চলার সময় ঘন্টাগুলো শব্দ করে বেজে ওঠে।

চাকমা তাঁত চাকমাদের গৃহকার্যাদির মধ্যে নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্ত হচ্ছে বেন (baen) বা তাঁত। এই তাঁতের প্রধান ১২টি অংশ রয়েছে এবং প্রায় সবগুলো অংশই বাঁশ ও সুপারি গাছের ছাও (chhaw) থেকে তৈরি। প্রত্যেক চাকমা মেয়েকে তার মা ও জ্যেষ্ঠ আত্মীয়স্বজন তাঁতবুনন শিক্ষা দেয় এবং পরিবারের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই দক্ষতা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়। বেন দক্ষতাকে একজন ভাল স্ত্রী ও মায়ের গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বুনন শিল্পকলাকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক মূল্যও দেওয়া হয়।

প্রায় আট বছর বয়সের বালিকাকে বিভিন্ন প্রকার নকশা শিক্ষালাভের জন্য উৎসাহিত করা হয়। পুরুষ পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত পারিবারিক তাঁত বুনন তালিকা থেকে তার মা এই নকশাগুলো তাকে দেখায়। এই ব্যবস্থাকে আলুম (aalum) বলে।

সাঁওতাল কারুশিল্প প্রাকৃতিক গাছ, অাঁশ, পাতা, গাছের কান্ড, বাকল ইত্যাদি হচ্ছে হাতে তৈরি শিল্পসামগ্রীর উপকরণের অংশ বিশেষ। এই শিল্পসামগ্রী গৃহের বিভিন্ন কাজে উৎসব অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়।

আদিবাসীদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র

সাধারণত বাশের তাঁতে বস্ত্র বুনন করা হয় এবং মহিলারা তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার জন্য এটি করে থাকেন। মহিলাদের পোশাকের উপর অংশ ও নিচের অংশ এক ধরনের পুরু কাপড়ের সুতা দিয়ে তৈরি করা হয়। মহিলাদের এই ধরনের পোশাককে ফোটা (phota) বলা হয়। আর পুরুষদের পোশাকের নিচের অংশকে বলা হয় ধূতি (dhoti)।

ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের মতো সাঁওতালরা শরীরের বিভিন্ন অংশে রূপার অলঙ্কার পরিধান করে। কব্জির জন্য চুড়ি, নাকের জন্য নথ, কানের জন্য মাকড়ি, কোমরের জন্য বিছা, চুলের সিঁথি করার জন্য সিঁথি-পাটি, গলার জন্য হাঁসুলি বা মাঁদুলি, এবং পায়ের বুড়ো আঙুলের জন্য অঙ্গুরি। কব্জিবন্ধকে বলা হয় বাজু, পায়ের অলঙ্কারকে বলা হয় বাংকি, এবং কানের অলঙ্কারকে বলা হয় কানের দুল। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে মহিলারা উচ্ছ্বসিতভাবে ফুল দিয়ে এক বিশেষ ধরনের সাজে নিজেদের সজ্জিত করে। তারা কাজলি শিমূল ও চম্পা ফুল কানের পিছনে পরিধান করে এবং বিভিন্ন বন্য ফুল দিয়ে মালা তৈরি করে।

তারা মাটি দিয়ে রান্না করার বাসন-কোষণ তৈরি করে এবং বাশ, বড়পাতা দিয়ে উৎসবের পাত্র/বোল, এবং গাছের ছোট ডাল এবং পুষ্পবৃন্ত দিয়ে ঝুড়ি ও ট্রে তৈরি করে।

গারোদের আদি নিবাস ভারতের মেঘালয় রাজ্যে। খাসি উপজাতীয় সম্প্রদায়ের পরেই ভারতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আনুমানিক ৪০০ বছর পূর্বে তারা ভারত থেকে বর্তমান বাংলাদেশ এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। তারা টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, গাজিপুর জেলায় বসবাস করে, তবে তারা অধিক সংখ্যায় বসবাস করে রংপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায়।

গারোরা তাদের প্রাচীন বাঁশ ও রেশম-তাঁতে ব্যক্তিগত ও গৃহকার্যের জন্য বিভিন্ন প্রকার কাপড় বুনন করে। তাদের প্রধান পোশাক-ধোক-মান্দা, গান্না, ওড়নার বুটরং, এবং হোপিং বা মাথার পাগড়ি।

মহিলারা গুটিদার গলার মালা এবং মাথার সজ্জা তৈরিতে বিশেষভাবে পারদর্শী। রিক মাচু হচ্ছে কাঁচের তৈরি মাথার মালা বা লম্বা গলার মালা, রিববক হচ্ছে হাতির দাতের ছোট ছোট অংশ দিয়ে তৈরি গলার মালা, খোক কাশিল হচ্ছে রূপা দিয়ে তৈরি কপাল সজ্জার অলঙ্কার, ডেমগ গাছরু হচ্ছে রূপার মুদ্রা দিয়ে তৈরি গলার হার এবং পাখির পালক দিয়ে তৈরি বৈচিত্রময় মাথার মুকুটকে বলা হয় ডোমি মুরঘের। পুরুষের মাথার পাগড়িকে বলা হয় খাটুপ এবং এটি পাগড়ির মতো মাথার চারদিকে মুরিয়ে পড়তে হয়।

বিপদ থেকে রক্ষার জন্য গারোরা উত্তরাধিকারসূত্রে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিয় বস্ত্ত লাভ করেছে। এগুলোর আকৃতি তালিশমানোর মতো এবং প্রতিটি ব্যক্তিই এগুলো পরিধান করে। বিপদ বা অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্য পুরুষ ও মহিলারা অন্তিক সিলারা নামক এক প্রকার লোহার হাড় পরিধান করে। অন্য একটি রক্ষাকারী বস্ত্ত হচ্ছে নাকুড়ি। এটি লোহার তৈরি কান-ঢাকনি এবং হেলমেটের মতো মাথা থেকে পরতে হয়। স্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনের জন্য তারা জাকসিল, জাকচপ ও সামথং নামক লোহার তৈরি চুড়ি উপরের বাহু থেকে কব্জি পর্যন্ত পরে থাকে।

ঐতিহ্যবাহী চারু ও কারুশিল্প প্রাচীন পুঁথির চিত্রকর্ম বৌদ্ধতান্ত্রিক চিন্তাধারার ৫০০০ বছরের ইতিহাসের অংশ হচ্ছে লিখন ও রেখাচিত্র শিল্প। এ ধরণের শিল্পকর্মে তারা মূলবস্ত্ত হিসেবে তালপাতা, বাঁশের বাকল, প্যাপিরাস (প্রক্রিয়াজাত ও শুষ্ক পাতা বা মন্ড) এবং কাপড় ব্যবহার করে। বাংলার লোকজ শিল্পীরা প্রাচীন পুঁথি বা লম্ব কাপড়ের উপর লোককাহিনীর চিত্রকর্ম অঙ্কন করতো। ১৩ শতক থেকে ১৫ শতকের মধ্যে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে তারা এই লোককাহিনী সংগ্রহ করতো। এসব কাহিনী ইন্দো-গঙ্গার ঐতিহ্যবাহী রাসলীলা বা কৃষ্ণলীলা, রামলীলা ও ব্রাহ্মণদের দেবতার ধারণা থেকে সংগৃহীত। এসব কাহিনীর উৎস হচ্ছে রামায়ণ ও মহাভারতের মতো হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ। শত শত বছর ধরে এসব কাহিনী রূপান্তরিত হয়ে লোক কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ইসলাম ধর্মও কারবালা, বিবি ফাতেমা, হযরত হাসান হোসেন এবং আকর্ষণীয় লোকজ বীরদের কাহিনী প্রচার করেছে। বিখ্যাত গাজি পাঠের বিভিন্ন কাহিনীতে সুন্দরবন-জঙ্গলের বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষাকারী গাজিপীর ও সত্যপীর এবং বিপদ থেকে রক্ষার জন্য বনবিবির গল্প স্থান পেয়েছে।

লক্ষ্মীবাটি

লক্ষ্মীবাটি/টুকরি কড়ির বর্ম দিয়ে আবৃত ও লাল সালুর কাপড় দিয়ে জড়ানো বেতের ঝুড়ি। প্রতীকী এই বাটি কৃষি, সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর নামে উসর্গ করা হয়। প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যে টাকার বিনিময় হিসেবে ব্যবহার করা হত। লক্ষ্মীবাটিতে পদ্মফুলের আকারে কড়ি গেঁথে দেওয়া হয় যা দেবীর প্রতীক।

হাঁড়ের তৈরি শৌখিন দ্রব্যসামগ্রী

শিং ও হাড়ের শিল্প  ঢাকার বাই-লেনগুলো হচ্ছে মহিষের শিং কেটে, খোদাই করে বিভিন্ন আকৃতি প্রদানের জন্য অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান। ১৮ শতকে মুসলিম কারিগর সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দক্ষতার বিকাশ ঘটে। তারা আবিষ্কার করেন যে, মজবুত চিরুণি, বোতাম, চুলের ক্লিপ, কলমদানী, এবং অলঙ্করণের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির জন্য শিং কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। হাঁটার সময় ব্যবহূত লাঠি বা ছড়ি এবং প্রদীপ-দন্ড ধনী ও ভদ্র পরিশীলিত শ্রেণী ক্রয় করে থাকেন। প্লাস্টিক সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও এই কারুশিল্প বাড়ি ও অফিস আদালতে সুন্দর বার্ণিশ করা স্থানে শোভা পায়।

মসলিন ও জামদানি  বাংলার মূল্যবান তাঁতের বয়নশিল্প সূক্ষ্ম সূতা দিয়ে তৈরি সূক্ষ্মতম পণ্যসামগ্রী যা ‘মসলিন’ নামে অভিহিত। এসব সুন্দর স্বচ্ছ ও নির্মল মাকড়সার জালের মতো বস্ত্রসামগ্রী প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে শীতলক্ষ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় তৈরি হত। এসব এলাকার আর্দ্র আবহাওয়া সূক্ষ্ম সূতাকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করত। ধর্মীয় অনুষ্ঠান দিয়ে বুনন কাজ শুরু হত এবং বিভিন্ন প্রকার বার্ষিক রীতিনীতিও অনুসরণ করা হত। সূর্যের তাপ অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বেই তাঁতিরা খুব ভোরে বুনন কাজ শুরু করত। পরে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার বিখ্যাত মসলিন কাপড়ে বিভিন্ন প্রকার নকশা সংযোজিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় জামদানি (মদ বহনকারী পাত্র)। জামদানি হচ্ছে স্বচ্ছতা ও মনোমুগ্ধতার রূপক নাম যার সঙ্গে দীপ্তিমান বা আলো ঝলমলে মদের তুলনা করা হয়। তাঁতের প্রাচীন চারু ও কারুশিল্পের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানির মর্যাদা চিরায়ত ও ঐতিহ্যবাহী বয়ন শিল্পের বর্ষ বিবরণী বা বর্ষপঞ্জিতে স্থানলাভ করেছে। বর্তমানেও এই শিল্প জীবন্ত চারু ও কারুশিল্প হিসেবে বিবেচিত।

জামদানি তৈরি

বস্ত্র-স্থাপত্যশিল্প তোরণ, খিলানাকৃতির তোরণ, প্যান্ডেল, মঞ্চ, প্লাটফর্ম ইত্যাদি তৈরি করার জন্য কাপড়কে লম্বা, ভাজ ও বাঁশের কাঠামোকে আবৃত করা হয়। এই কারুশিল্পের একটি সনাতনী ও ঐতিহ্যমন্ডিত ইতিহাস রয়েছে। স্মরণাতীতকাল থেকে গ্রামেগঞ্জে বিবাহ ও বিভিন্ন প্রকার উৎসবে প্রবেশ করার পথে ও উৎসব স্থানে এগুলো নির্মাণ করা হয়।

গত দুই দশকে এই শিল্পের নতুন নামকরণ হয়েছে ‘বস্ত্র-স্থাপত্যশিল্প’। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা ‘ঘটনা ব্যবস্থাপনার’ প্রদর্শনী ও সাজসজ্জার জন্য ব্যবসায়িক সেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। নকশাবিদেরা শুধু বিবাহ বা পার্টির জন্য নয়, আলোচনা সভা ও বিক্রয় প্রসার উৎসাহ কর্মসূচিতে বাঁশ বা বেতের কাঠামো বা হালকা লোহার রড ব্যবহার করে এসব অনুষ্ঠান প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। এই প্রদর্শনীতে ফুল, ফিতা, ফোমের টুকরা ও বাতির মতো অনেক নতুন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার করে পূর্ণতা প্রদান করা হয়।

গণকারুশিল্প হিসেবে বিগত দশকে বস্ত্র-স্থাপত্যশিল্পের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তৎকালীন বস্ত্র-স্থাপত্যশিল্প উন্মুক্ত স্থানের গণঅনুষ্ঠান-মেলা এবং উরস ও ওয়াজ মাহফিলের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হতো। অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য মাযার, গম্বুজ, মিনার, কিল্লা ও ইসলামিক স্থাপত্যশিল্পের আকারে বড় বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়।

গ্রাম অঞ্চলে শত শত বছর ধরে হিন্দু পূজামন্ডপগুলোতে বাঁশের লাঠিকে কাগজ কাটা টুকরা দিয়ে নান্দনিকভাবে সজ্জিত করা হয়। ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার সময় মন্দিরগুলোকে কাগজ কাটা টুকরা দিয়ে খুব সুন্দর করে সজ্জিত করা হয়। গ্রাম অঞ্চলের কাপড় বেঁধে এবং কাপড় দিয়ে আবৃত করার সজ্জিতকরণের শৈল্পিক কৌশলের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং কাপড় দিয়ে নির্মাণ শিল্পকে একটি আধুনিক চারু ও কারুশিল্পের মর্যাদা দান করেছে।

বুনন শিল্প

বুননশিল্প এ শিল্পের মধ্যে টুকরি, ঝুড়ি, ধামা, মাদুর, হোগলা, পাটি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় ঝুড়ি একটি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী উত্তোলন ও মজুত করার জন্য এই ঝুড়ি ব্যবহার করা হয়। বাংলায় প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত বাঁশ, বেত, দুর্বা, নল খাগড়া, পাতা, তন্তু প্রভৃতি শিল্পীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার সুযোগ করে দিয়েছে। কারুশিল্প হিসেবে ঝুড়ি তৈরিতে বুনন, কুন্ডলীকরণ, পাকানো, বিভিন্ন বর্ণের চৌখুপিদ্বারা শোভিতকরণ বা শিরাতোলন পদ্ধতি গ্রহণ করা। এতে চটা বা বেত দিয়ে ঝুড়ি ও ধামা তৈরি করা হয়। এগুলো মাটি তোলার কাজে ব্যবহার করা হয়।

এগুলোকে মজবুত করার জন্য কচুরিপানার পুকুরে বা কর্দমাক্ত ডোবাতে ভিজিয়ে রাখা হয়, জীবাণুনাশক রঞ্জন ও গাব ফলের রস দিয়ে মোছা হয়। ফলে এগুলো ব্রোঞ্জের মতো উজ্জ্বল রং ধারণ করে এবং নির্ভরযোগ্য হয়। বাংলাদেশের সকল জেলা ও গ্রামে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরণের মাদুর-নিদ্রার জন্য, বসার জন্য, খাদ্য শুকানোর জন্য, ছায়া দেয়ার জন্য ছাদ/চালা মাদুর, দেয়াল-মাদুর বা দরমা, ফলস সিলিং মাদুর ও প্রার্থনার জন্য মাদুর ইত্যাদি তৈরি করা হয়। [পারভীন আহমেদ]