চাটমোহর মসজিদ


চাটমোহর মসজিদ  পাবনা জেলার চাটমোহর বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। একসময় মসজিদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। ১৯৮০’র দশকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সম্পূর্ণরূপে পুনঃনির্মাণ করে। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত ইমারত। মসজিদটিতে চমৎকার তুগরা লিপিতে উৎকীর্ণ একটি ফারসি শিলালিপি ছিল। বর্তমানে শিলালিপিটি রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরএ সংরক্ষিত আছে। এ শিলালিপি অনুসারে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে জনৈক খান মুহম্মদ বিন তকি খান কাকশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন।

চাটমোহর মসজিদ, পাবনা

একটি নিচু বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মসজিদটি সামান্য উঁচু একটি মঞ্চের (platform) পশ্চিম-অর্ধ জুড়ে অবস্থিত। সম্পূর্ণ ইটের তৈরী এ মসজিদ পরিকল্পনায় আয়তাকার। বাইরে থেকে এর পরিমাপ ১৮.১৪ মি × ৮.২৩ মি। দেয়ালগুলি ১.৯৮ মি পুরু। বাইরের দিকের চারটি কোণকে অষ্টভুজ পার্শ্ববুরুজের নির্মাণের মাধ্যমে মজবুত করা হয়েছে। বুরুজগুলি ছাদ পর্যন্ত উঁচু।

মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে দ্বিকেন্দ্রিক সুচালো খিলানযুক্ত প্রবেশ পথুপূর্ব দিকের সম্মুখভাগে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে। পূর্ব দিকের তিনটি প্রবেশপথের মধ্যে কেন্দ্রীয়টি অপেক্ষাকৃত বড়। কিবলা দেয়ালের ভেতরের দিকে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার অবতল মিহরাব। এখানেও কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অন্য দুটি অপেক্ষা বড় এবং এর পেছনের দিকে রয়েছে আয়তাকার একটি প্রক্ষেপণ। মসজিদের ভেতরে অবস্থিত দুটি দ্বি-কেন্দ্রিক সুঁচালো আড়খিলান (transverse arch) এর সাহায্যে এর অভ্যন্তরভাগকে তিনটি সমান বর্গাকার ‘বে’তে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি ‘বে’র উপরে রয়েছে সমান আকৃতির একটি করে অর্ধগোলাকার গম্বুজ। আড়খিলান এবং মিহরাব ও প্রবেশপথগুলির উপর থেকে নির্মিত বদ্ধ খিলান গম্বুজগুলির ভার বহন করছে। গম্বুজগুলি নির্মাণে ব্যবহূত হয়েছে বাংলা পেন্ডেনটিভ। সুলতানি রীতিতে মসজিদটির কার্নিশ সামান্য বাঁকানো। খিলানগুলির স্প্যানড্রিলে এখনও গোলাপ নকশার চিহ্ন রয়েছে। প্রতিটি খিলান পথেরই দুপাশে রয়েছে উপর্যুপরি স্থাপিত দুটি করে আয়তাকার খোপ নকশা (panel)। খোপ নকশাগুলি বর্তমানে ফাঁকা, তবে আদিতে হয়ত এখানে অলঙ্করণ ছিল। দেওয়ালের মাঝামাঝি অংশে ছাঁচে ঢালা ব্যান্ড নকশার একটি সারি রয়েছে। যে কারণে মসজিদটিকে বাইরে থেকে দেখতে দ্বিতল বলে মনে হয়। মিহরাবগুলি আয়তাকার ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত এবং আদিতে এগুলিতে পোড়ামাটির অলঙ্করণ ছিল যার চিহ্ন এখনও খুঁজে পাওয়া যায়। গোলাপ নকশা, পুষ্পলতা এবং জ্যামিতিক নকশার মতো নানা রকম মোটিফ এখানে ব্যবহূত হয়েছিল।

পাবনার এ মসজিদ এবং বগুড়ার শেরপুরে অবস্থিত খেরুয়া মসজিদ দুটিই ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এবং হুবহু একই পরিকল্পনা বিশিষ্ট। বাংলায় বিদ্যমান মুগল ইমারতের মধ্যে এ দুটি সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। যদিও ইমারত দুটি মুগল আমলে নির্মিত কিন্তু এগুলির বর্তমানরূপে এ অঞ্চলে প্রচলিত সুলতানি স্থাপত্য রীতির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। বক্র কার্নিশ, দ্বিকেন্দ্রিক সুচাঁলো খিলান, অর্ধবৃহত্তাকার মিহরাব স্কন্ধ (drum) ও শীর্ষ চূড়া (finial) বিহীন  গম্বুজ, ছাদ পর্যন্ত উঁচু পার্শতবুরুজ, গম্বুজ নির্মাণে বাংলা পেন্ডেনটিভের ব্যবহার প্রভৃতি সবই সুলতানি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য। তবে সুলতানি রীতির এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেও অন্ততপক্ষে মসজিদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় এ রীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাংলায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল এখানেই। পরবর্তীকালে এ পরিকল্পনার সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত রূপ দীর্ঘ দিন এ অঞ্চলের স্থাপত্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল।

মসজিদ স্থাপত্যের এ রীতিতে অবশ্যই উত্তর ভারতের প্রভাব রয়েছে। এর উদাহরণ প্রথম পাওয়া যায় লোদি ও শূর আমলে। পরবর্তীসময়ে এ পরিকল্পনার আরও বিকাশ ঘটে এবং মুগল আমল জুড়েই তার প্রয়োগ দেখা যায়। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ এবং তাকে ঘিরে রিওয়াকবিশিষ্ট পরিকল্পনার পরিবর্তে উত্তর ভারতীয় রীতিতে নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকার প্রার্থনাকক্ষ নির্মাণের এ মুগল রীতি মসজিদ পরিকল্পনার একটি পরিপূর্ণ রূপ হিসেবেই বিবেচিত হয়। দিল্লির সুন্হেরী মসজিদ কিংবা আগ্রার তাজমহলের পাশে নির্মিত মসজিদ (১৬৩৪ খ্রি) এর উদাহরণ। এ ধরনের ভারতীয় মসজিদ পরিকল্পনাকে বলা যেতে পারে পারস্যের মুহম্মদিয়ায় অবস্থিত ইওয়ান-ই-কারখা (Iwan-i-karkha) কিংবা মাসহাদে অবস্থিত মুসাল্লা (Musalla) এর পরিবর্তিত রূপ।  [এম.এ বারি]