চলচ্চিত্র সংসদ


চলচ্চিত্র সংসদ  চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন মাধ্যম নয়, এটি ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনের রূপশিল্প। যন্ত্রনির্ভর হলেও চলচ্চিত্র সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, চিত্রকলা এবং নৃত্যকলার মতোই জীবনবোধ ও শৈল্পিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে সক্ষম। বাণিজ্যিক বৃত্তের বাইরে চলচ্চিত্রের নান্দনিক ও মননশীল উপলব্ধি আলাদা দর্শক শ্রেণি তৈরি করেছে। এ আলাদা দর্শকরাই গড়ে তুলেছে চলচ্চিত্র সংসদ বা ফিল্ম সোসাইটি। সাংগঠনিকভাবে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক মর্যাদা বৃদ্ধি, শিল্প ও জীবনধর্মী চলচ্চিত্রের উপলব্ধি, প্রচার, প্রসার, সমীক্ষণ ও অনুশীলন করাই চলচ্চিত্র সংসদ চর্চার অন্যতম লক্ষ্য।

বিশ শতকের বিশের দশকে ফ্রান্সে সিনে ক্লাব দ্য ফ্রান্স, ১৯২৫ সালে লন্ডনে দ্য ফিল্ম সোসাইটি, ১৯৪২ সালে বোম্বে ফিল্ম সোসাইটি, ১৯৪৫ সালে শ্রীলঙ্কায় ফিল্ম সোসাইটি, ১৯৪৬ সালে ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি ও ১৯৫০ সালে বেঙ্গল ফিল্ম সোসাইটি গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে ঢাকায় গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান শিশু চলচ্চিত্র সমিতি। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির পূর্বাঞ্চলীয় শাখার উদ্যোগে ঢাকায় গঠিত হয় একটি ফিল্ম ক্লাব। কলিম শরাফী এর সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৩ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় স্টুডেন্টস ফিল্ম ফেডারেশন। এসব চলচ্চিত্র সংসদের স্থায়িত্বকাল ও কার্যক্রম ছিল খুবই সীমিত। ১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর ঢাকায় গঠিত হয় পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ সংসদের কোনো সভাপতি ছিল না, পরে সভাপতি হন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আনোয়ারুল হক খান। পরে সাধারণ সম্পাদক হন  আলমগীর কবির। স্বাধীনতার পর সংগঠনের নাম পাল্টে রাখা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংসদই দেশে প্রথম সক্রিয় চলচ্চিত্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র আলোচনা-সেমিনার-অধিবেশন-ওয়ার্কশপের আয়োজন, ধ্রুপদী নামে উঁচুমানের সংকলন প্রকাশ, বুলেটিন প্রকাশ, স্টাডি গ্রুপ সংগঠন,  গ্রন্থাগার স্থাপন, ফিল্ম কো-অপারেটিভ চালু, ঢাকা ও চট্টগ্রামে শাখা স্থাপন, শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা শাখা স্থাপন, ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্স চালু প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে সংসদ সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান চালু, ফিল্ম আর্কাইভ ও ফিল্ম ইনস্টিটিউট স্থাপনেরও দাবি তোলে।

দেশের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র সংসদ ঢাকা সিনে ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে আলমগীর কবির ও লায়লা সামাদের উদ্যোগে। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যা বেড়ে হয় ১৫টি। চলচ্চিত্র সংসদগুলি নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন (১৯৭৩)।  আলমগীর কবির এ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হন। ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে চলচ্চিত্র সংসদ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন পাস হয়। এর ফলে চলচ্চিত্র সংসদগুলির সংখ্যা ও কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশনের উদ্যেগে ঢাকায় ২০০৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।  [অনুপম হায়াৎ]