চন্ডীদাস


চন্ডীদাস (আনু.১৪শ শতক)  মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধ কবি। এ নামে চারজন কবির পরিচয় পাওয়া যায়; তাঁরা হলেন: বড়ু চন্ডীদাস, দ্বিজ চন্ডীদাস, দীন চন্ডীদাস ও চন্ডীদাস। এঁদের রচিত পদের ভণিতায় এ নামগুলি পাওয়া যায়। এ চারজন পরস্পর পৃথক ব্যক্তি, নাকি একজনেরই চারটি নাম; পৃথক হলে কে কখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, একজন হলেই বা তাঁর সঠিক সময় কোনটা এসব নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যা ‘চন্ডীদাস সমস্যা’ নামে পরিচিত। আজ অবধি এ সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে এঁদের মধ্যে বড়ু চন্ডীদাসকে মোটামুটিভাবে চিহ্নিত করা গেছে। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নান্নুর গ্রামে (মতান্তরে ছাতনা-বাঁকুড়া)। তাঁর পিতা দুর্গাদাস বাগচী ছিলেন বরেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ।

চন্ডীদাস ছিলেন বাশুলী (বিশালাক্ষী) দেবীর ভক্ত এবং তাঁর মন্দিরের পুরোহিত। রামী নামে এক রজকিনী ছিল তাঁর প্রণয়সঙ্গিনী বা সাধনসঙ্গিনী। তিনি তার মধ্যে শ্রীরাধার রূপদর্শনে তার সঙ্গে লীলায় রত হন। এ সংবাদ স্থানীয় জমিদারের গোচরীভূত হলে চন্ডীদাসকে সমাজচ্যুত ও একঘরে করা হয় এবং মন্দির থেকে তাঁকে বিতাড়িত করা হয়।

বড়ু চন্ডীদাসের প্রধান পরিচয়  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা হিসেবে। বসন্তরঞ্জন বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া থেকে এ কাব্যের  পুথি আবিষ্কার করে ১৯১৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। তাতে তিনি চন্ডীদাসের জন্ম ১৩৩৯ এবং মৃত্যু ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করেন। এ কাব্যের ভাব ও ভাষা বিচারে চন্ডীদাসকে চৈতন্য-পূর্ববর্তী, সম্ভবত চৌদ্দ শতকের প্রথমার্ধের লোক বলে মনে করা হয়।

চন্ডীদাসের নামযুক্ত পদসমূহ দীর্ঘকাল বাংলার ঘরে ঘরে গীত হয়েছে। তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম মানবতাবাদী কবি। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ বাঙালির দর্শনচিন্তা এবং মানবতাবোধের অপূর্ব নিদর্শন। চন্ডীদাসের নামাঙ্কিত পদের সংখ্যা ন্যূনাধিক এগারশ।

বীরভূমের নান্নুর গ্রামে চন্ডীদাসের নামে স্কুল, হাসপাতাল   ইত্যাদি স্থাপিত হয়েছে। তাঁর কারণে নান্নুর আজ কবিতীর্থে পরিণত হয়েছে। চন্ডীদাসকে নিয়ে অনেক নাটক ও চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।  [সমরেশ দেবনাথ]