চন্ডাল


চন্ডাল  হিন্দুদের মধ্যে অত্যন্ত নিম্ন ও অস্পৃশ্য সম্প্রদায় বিশেষ। এদেরকে অতি নগণ্য কাজে বা চাকর-চাকরানি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রচলিত প্রথা অনুসারে, চন্ডাল পুরুষ বা মহিলা কোনো জনসমাবেশে বা গৃহে প্রবেশ করার সময় বা উপস্থিত হওয়ার আগে দুটি কাঠির মাধ্যমে এক ধরনের সাঙ্কেতিক শব্দ করে। এ শব্দ শুনে সাধারণ জনগণ সতর্ক হয়ে যায় এবং অস্পৃশ্যদের আগমনের কারণে একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে। চন্ডালদের একটা অন্যতম উপ-সম্প্রদায় হচ্ছে ডোম। মৃতদেহ দাহ করা অথবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা ডোমদের কাজ। আজকাল চন্ডালদের যে কোনো কাজে অংশগ্রহণে কোনো সামাজিক বাধা নেই। সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকজন আজকাল নিজেদের প্রয়োজনে তাদেরকে প্রয়োজনীয় যে কোনো কাজে লাগাচ্ছেন, অথবা চন্ডালরা নিজেরাই বাঁচার তাগিদে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র বেছে নিচ্ছে। আজকাল চন্ডালদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করা রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার এবং কোনো নগণ্য কাজ আর শুধু তাদের জন্যই নির্ধারিত একথা বলা যায় না। এখন তারা কৃষিকাজ, ব্যবসাবাণিজ্য, ঠেলাগাড়ি চালানো এবং  কামারকুমার ও স্বর্ণকারের কাজ করে। আবার এসবের পাশাপাশি তাদেরকে রেলওয়ে স্টেশন, সমুদ্রবন্দর, হাটবাজার ও দোকানপাটের টুকিটাকি কাজ করতেও দেখা যায়।

চন্ডালরা হতদরিদ্র এবং অশিক্ষিত, ফলে তাদের জীবনযাপন প্রণালী নিদারুণ কষ্টের। তাদেরকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অগোছালোভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় জীবজন্তুদের মতো বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। সমাজের অন্যান্যদের আচরণই তাদেরকে মনুষ্যবাসের অনুপযোগী পরিবেশে রেখে নোংরাভাবে পশ্চাৎমুখী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে। বাল্য বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় এবং বিয়ের কনের জন্য সাধ্যমতো উপঢৌকন ধার্য করা হয়। সাধারণত বিবাহবিচ্ছেদ প্রথা নেই বললেই চলে। বহুগামিতায় কোনো বাধানিষেধ নেই। পরিবারের একজন কর্তা এককভাবে অথবা অন্যদের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে পরিবারের দায়দায়িত্ব ও ব্যয়ভার বহন করেন।

চন্ডাল সমাজে একটি ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণের পর একজন মা-কে দশ দিনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অপরিচ্ছন্ন বা অশুচি বলে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু একজন মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণের পর মা-কে সাত থেকে নয় দিন অশুচি পালন করতে হয়। ছেলে সন্তান জন্মানোর ছয় দিন পর ষষ্ঠীপূজা নামক এক ধরনের পূজার আয়োজন করা হয়। চন্ডালদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব মতবাদের অনুসারী। তাদের মাঝে এখনও অনেক গোত্রীয় ও লোকায়ত ধর্মীয় প্রথার প্রচলন দেখা যায়, যেমন, মাটির দেবতার উপাসনা, বানসুরা পূজা বা নদীর দেবতার উপাসনা,  মনসা পূজা বা সর্পদেবতার উপাসনা ইত্যাদি। চন্ডালদের মধ্যেও ব্রাহ্মণ আছে, তারা বর্ণ ব্রাহ্মণ বা চন্ডালদের ব্রাহ্মণ নামে সুবিদিত। ব্রাহ্মণরা ধর্মীয় উৎসবাদি এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তবে নিম্ন সম্প্রদায়ভুক্ত বিধায় তারা সমাজে নিম্নমানের ব্রাহ্মণ হিসেবে চিহ্নিত।  [শারমিন নাজ]