চট্টগ্রাম বন্দর


চট্টগ্রাম বন্দর  বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্বে পর্বতশ্রেণী থেকে উৎপন্ন এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। সমুদ্র হতে কয়েক মাইল অভ্যন্তরে গভীর সমুদ্রে নোঙ্গর করার সুবিধাই এ বন্দরের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বঙ্গোপসাগরের বাইরের দিকে বালুচর হতে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে প্রধান ঘাট পর্যন্ত চলমান দূরত্ব হচ্ছে ১৬ কিলোমিটার।

চট্টগ্রাম বন্দর

বন্দরের অবস্থান এবং এর স্বাভাবিক পোতাশ্রয় একে খ্রিস্টীয় নয় শতক হতে ব্যবসা-বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ঐসময় আরব বণিকদের নিকট এটি ছিল লাভজনক বাণিজ্য কেন্দ্র। পনেরো শতকের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। চৈনিক পর্যটক মাহুয়ান এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ১৪০৫ সালে চট্টগ্রাম আসেন। তিনি চট্টগ্রামকে (চিট-লে-গান) একটি বন্দর হিসেবে উল্লেখ করেছেন যেখানে চৈনিক বাণিজ্যিক জাহাজ প্রায়শ যাতায়াত করত। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম চট্টগ্রামে আগমন করে। পর্তুগিজরা প্রথমে জন দ্য সিলভিরার নেতৃত্বে ১৫১৭ সালে এবং পরে আলফন্সো দ্য মিলোর নেতৃত্বে ১৫২৭ সালে চট্টগ্রাম দখলের ব্যর্থ চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত তারা শেরশাহ শূরের বিরুদ্ধে বাংলার সুলতান মাহমুদ শাহকে সাহায্য করার বিনিময়ে তার কাছ থেকে চট্টগ্রাম ও সাতগাঁওয়েরও অধিকার লাভ করে। পর্তুগিজদের অধীনে চট্টগ্রামের সমৃদ্ধি ঘটে এবং একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ‘পোর্টো গ্র্যান্ডে’ (‘porto grande’) বা বিশাল বন্দর নামে পরিচিত হয়। পক্ষান্তরে সাতগাঁও বন্দরের নামকরণ হয় ‘পোর্টো পেকুইনে’ (porto pequene)। ১৬৬৫-৬৬ সালে বাংলার মুগল সুবাহদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম অভিযান করে অতর্কিত আক্রমণে বন্দরটি দখল করে নেন।

এ সময়ের মধ্যে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৫১ সালে হুগলিতে তাদের প্রথম কুঠি প্রতিষ্ঠা করে। তবে দীর্ঘকাল তা নিছক বণিকের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। কোম্পানি একটি সুরক্ষিত ঘাটি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু সে ঘাঁটি কোথায় হবে সেটাই ছিল প্রশ্ন। উইলসন লিখেছেন, শিল্প-বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর জন্য হুগলিই ছিল প্রকৃষ্ট স্থান, আর সামরিক উচ্চাভিলাষ উদ্বুদ্ধ করেছিল বলপূর্বক গুরুত্বপূর্ণ মুগল নগরী চট্টগ্রাম দখলে। কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স ঘন ঘন পরামর্শ দিচ্ছিলেন এবং ১৬৮৫ সালে অ্যাডমিরাল নিকলসনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে একটি অভিযানের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা হয়। নিকলসনের প্রতি নির্দেশ ছিল চট্টগ্রাম দখল করে ইংরেজদের জন্য এটিকে সুরক্ষিত করার। এ অভিযান কখনই চট্টগ্রাম পৌঁছায়নি। কিন্তু লন্ডনে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স তাদের এ মত কখনই পাল্টায় নি যে, চট্টগ্রাম দখল করতে পারলে উপসাগরে তাদের সব রকমের সুবিধা এসে যাবে। ১৬৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স চট্টগ্রাম দখলের জন্য ক্যাপ্টেন হিথের নেতৃত্বে একটি নৌবহর প্রেরণ করে। তাদের এ দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। হিথ চট্টগ্রাম দখলের অসুবিধাগুলি উপলব্ধি করেন এবং  প্রায় এক মাসকাল সেখানে নোঙ্গর করে থাকার পর উদ্যোগটি পরিত্যক্ত হয়।

এ প্রত্যাগমন একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চট্টগ্রাম আরও একশ বছর বাংলার মুগল শাসকদের অধীনে থাকে। ইতোমধ্যে ইংরেজগণ মুগল সম্রাট  আওরঙ্গজেব এর নিকট তাদের পূর্ব শত্রুতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় ১৬৯০ সালে তাদের বাণিজ্যিক সুবিধার নবায়ন মঞ্জুর করা হয় এবং ১৬৯৮ সালে সুতানটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটির জমিদারি অধিকার প্রদান করা হয়। এর পর থেকেই কলকাতা ধীরে ধীরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঝোপঝাড় পরিবেষ্টিত নিচু ধানীজমি থেকে বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র এবং পূর্বাঞ্চলে একটি সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়।

এটা লক্ষণীয় যে, দু শতকের বেশিরভাগ সময় ধরে মুগল, পর্তুগিজইংরেজগণ ভারত সাগরের নৌবাণিজ্যের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামকে নিজেদের আয়ত্তে আনার জন্য লোভাতুর হয়ে উঠেছিল। চট্টগ্রাম দখল করে সেখানে বসতি স্থাপনে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই ইংরেজরা শেষ পর্যন্ত কলকাতায় ঘাঁটি স্থাপন করে। পরিকল্পনা বা লক্ষ্য নয়, প্রয়োজনীয়তাই ইংরেজদের কলকাতায় ঘাঁটি স্থাপন করতে বাধ্য করে। কলকাতায় ইংরেজ ঘাঁটি স্থাপন চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়।

আঠারো ও ঊনিশ শতকে কলকাতা ক্রমান্বয়ে বাংলার প্রধান বন্দরে উন্নীত হয় এবং চট্টগ্রাম একটি উপবন্দর (feeder port) হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে আসে। চট্টগ্রাম বন্দরের এ গুরুত্ব হ্রাস এবং এখানে বন্দর সুবিধার অনুপস্থিতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং ১৮৮৮ সালে চিটাগাং পোর্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য প্রশাসনিক এবং নীতি নির্ধারণী ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রথম প্রচেষ্টা ১৮৮৭ সালে গৃহীত হয় এবং ওই  বছরই চিটাগাং পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট-এর অধীনে একটি পোর্ট ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ১৮৮৭ সালে যেনতেন ভাবে ট্রাস্টের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বন্দরের কার্যাবলি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলা সরকারের ১৮৮৮ সালের ১৫ মে তারিখের ৩৫ ও ৩৬ নম্বর বিজ্ঞপ্তির দ্বারা বৈধভাবে পোর্ট ট্রাস্ট গঠিত হয়। ১৮৮৭ সালের চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনারস অ্যাক্টে নয় জন কমিশনারের বিধান রাখা হয়। এদের মধ্যে ছয়জন স্থানীয় সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন এবং তিনজন নির্বাচিত হবেন গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের পূর্ব অনুমোদন অনুসারে বাংলা সরকারের মনোনীত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচক মন্ডলীর দ্বারা। কমিশনারদের কার্যকালের মেয়াদ দুবছর। মনোনীত ছয়জন সদস্যের সকলেই ছিলেন ইউরোপীয়। নির্বাচিত তিন সদস্য ছিলেন ভারতীয়। কালক্রমে বোর্ড গঠনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে এবং অংশত এর কারণ ছিল মনোনীত সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি। কিন্তু প্রশ্নাতীতভাবেই ইউরোপীয়দের প্রাধান্য অব্যাহত থাকে এবং সরকার কর্তৃক মনোনীত নির্বাচকমন্ডলীতে পরিবর্তনের ফলে এ প্রাধান্য আরও জোরদার হয়। ১৮৮৭ সালের চিটাগাং পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট কমিশনারদের সীমিত ক্ষমতা প্রদান করে এবং পোর্ট ট্রাস্টকে ভারত সরকার ও বাংলা সরকারের দ্বৈত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করে। কমিশনারদের সকল কার্যক্রম এবং কার্যপ্রণালী স্থানীয় সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষ ছিল এবং স্থানীয় সরকার কমিশনারদের যে কোনো কাজ বা কার্যবিবরণী বাতিল, স্থগিত বা সংশোধন করতে পারত। ১৯০৩ সালে জেটিগুলির নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন থেকে পোর্ট ট্রাস্ট ও রেলওয়ে কোম্পানির মধ্যে কর্তৃত্বের বিভাজন প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করে। পোর্ট ট্রাস্টের দায়িত্ব ছিল নদী সংরক্ষণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং রেলওয়ে কোম্পানির দায়িত্বে ছিল সমুদ্রগামী জাহাজের জেটিসমূহ ও উপকূলীয় সুযোগ সুবিধা। পোর্ট ট্রাস্ট বোর্ডে বহু সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতিতে এর প্রশাসন চরমভাবে বিঘ্নিত হয়, এরা কেউ এর কাজে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দেয় নি। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন পোর্ট ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত পোর্ট কমিশনারদের চেয়ারম্যান। তার বহুমুখী কর্ম ব্যস্ততার কারণে পোর্টের দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব অন্য কারও উপর ন্যস্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৮৮৮ সালে পোর্ট ট্রাস্ট গঠিত হবার আগে একজন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন যিনি একাধারে ছিলেন কাস্টম কালেক্টর ও পোর্ট অফিসার।

পোর্ট রেলওয়ে ও পোর্ট কমিশনার্সের দ্বৈত প্রশাসনের জন্য ১৯৬০ সালে জারিকৃত এক অধ্যাদেশ দ্বারা সংশোধিত ১৯১৪ সালের পোর্ট অ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী ১৯৬০ সালের ১ জুলাই একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে পোর্ট ট্রাস্ট পুনর্গঠিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বন্দরের ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। বন্দরের দ্রুত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ জারি করে এবং পোর্ট ট্রাস্ট ভেঙ্গে দেয়। তখন থেকে বন্দরের ব্যবস্থাপনা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে আসে।

বন্দরের সুযোগ সুবিধা  উনিশ শতকের শেষার্ধে চট্টগ্রাম পোর্টে যাত্রীদের জন্য একটি এবং লবণ খালাসের জন্য কয়েকটি ছোট জেটি ছিল। তাদের কোনো পন্টুন বা ক্রেন ছিল না, ছিল না কোনো গুদাম। নিজেদের মালামাল রাখার জন্য কোনো গুদাম না থাকায় এদের অধিকাংশ খোলা জায়গায় পড়ে থাকত। চট্টগ্রামে সরকারি বা বেসরকারি কোনো কাঠের তৈরী ঘাটও ছিল না। একমাত্র লোহার জেটি ১৮৭৯ সালে সদরঘাটে নির্মিত হয়েছিল। বস্ত্তত এ জেটির তেমন কোনো উপকারিতা ছিল না, কারণ এটি জলের যথেষ্ট গভীরে প্রসারিত না থাকায় সমুদ্রগামী জাহাজের এবং এমনকি উপকূলে চলাচলকারী কোস্টারগুলিরও ব্যবহারোপযোগী ছিল না। ১৮৯১ সালে সরকারি লবণগোলা বা গুদাম ঘরের উল্টা দিকে চারটি লবণ জেটি নির্মিত হয়। এগুলি নিতান্তই ছিল ছোটখাট কাজ। তথাপিও চারটি লবণ জেটি নির্মাণ খুবই কাজে এসেছিল। পূর্বে জাহাজে লবণ বোঝাই কাজে নিয়োজিত লোকদের কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবিয়ে অতি কষ্টে লবণের বস্তা নিয়ে জাহাজ পর্যন্ত যেতে হতো। ১৮৮৮ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট গঠিত হবার সময় বন্দরে প্রয়োজনীয় যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল বন্দরের সঙ্গে সংযোগ পথে আলোর ব্যবস্থা, অগভীর বয়া অপসারণ, উপকূলবর্তী ভূমি অধিগ্রহণ ও নদী তীরবর্তী সড়ক নির্মাণ, নদী মোহনার সঙ্গে টেলিগ্রাফ সংযোগ প্রতিষ্ঠা, একটি বাষ্পচালিত টাগবোটের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কর্মচারী নিয়োগ এবং হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো ও স্থান সম্প্রসারণ।

এ তালিকা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলা সরকার চট্টগ্রামকে একটি ছোট উপকূলীয় বন্দররূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। জেটি নির্মাণ বা কর্ণফুলী নদীতে নৌযান চলাচলের প্রধান অন্তরায় ভেতর ও বাইরের দিকে জমাট বালুর চড়া ড্রেজিং করার বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না। অগভীর রিং বয়া অপসারণের প্রস্তাব অবশ্য ছিল, কিন্তু রিং বয়াটি ছিল উজানে সদরঘাট জেটির নিকটে, যা তখন উপকূলীয় নৌযান পরিচালনার যোগ্যও ছিল না।

দুটি উদ্যোগ এ অবস্থা পরিবর্তনে বাস্তব অবদান রাখে। একটি হচ্ছে আসামের চা-বাগানগুলির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরকে সংযুক্ত করে রেলপথ নির্মাণের জন্য ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত এবং অপরটি হচ্ছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি।

প্রশাসনিক দিক থেকে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ত্রিপুরা, সিলেট, কাছাড়, পার্বত্য ত্রিপুরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাসমূহ মেঘনা নদীর পূর্বদিকে অবস্থিত এলাকার অর্ন্তভুক্ত ছিল। ১৮৯১ সালে এ জেলাগুলির মোট আয়তন ছিল ২৪,০৯০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল ৫৫,৫৪,১৪৭। পাট, ধান ও চা উৎপাদনে এলাকাটি ছিল সমৃদ্ধ। জনবহুল এবং উর্বর এলাকা সত্ত্বেও এখানে এক মাইল রেলপথও ছিল না। বহু বছর যাবৎ চট্টগ্রাম বিভাগে একমাত্র রেলপথ ছিল হস্তচালিত ট্রামওয়ে। এ রেলপথ বরকলের নিকটে কর্ণফুলী নদীর প্রপাতের পাশ দিয়ে বন্দর এলাকার দেড় মাইলব্যাপী বিস্তৃত ছিল।  ফলে চট্টগ্রাম যে পূর্ববঙ্গ ও আসামের উৎপাদনের বহির্গমনের প্রাকৃতিক পথ, চট্টগ্রামের অবস্থান রক্ষা না করা সত্ত্বেও প্রচুর পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্য বর্তমান বন্দর সুবিধার চেয়ে উন্নততর বহিঃর্পথের অপেক্ষায় ছিল।

চট্টগ্রামের পশ্চাদভূমির সঙ্গে এর বন্দরকে সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ১৮৭৩ সালের দিকে চট্টগ্রামের কাস্টম কালেক্টর জল বা স্থলপথে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে কিছুই করা হয় নি। ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ হতে পূর্ববঙ্গে পাট ব্যবসার উন্নয়নের ফলে মেঘনা নদী জরিপ ও নৌচলাচলের জন্য একে নিরাপদ বলে ঘোষণা করতে ব্যবসায়ীগণ বাংলা সরকারকে অনুরোধ জানায়, যাতে ভারতের ও বিদেশি বন্দরগুলি থেকে সমুদ্রগামী জাহাজ পূর্বাঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের ব্যবসার জন্য নারায়ণগঞ্জে প্রবেশে সক্ষম হয়। ব্রিটেন হতে আগত জাহাজগুলির মেঘনা নদীতে চলাচল অত্যন্ত দুরূহ মনে করে বাংলা সরকার ঘোষণা দেয় যে, পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলির উৎপাদিত পণ্যের চালানের জন্য চট্টগ্রাম সবচেয়ে সুবিধাজনক বন্দর বিধায় উৎপাদিত পণ্য স্টিমারে টানা টাগবোটে করে মেঘনা নদী পথে চট্টগ্রাম পাঠানো হবে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার প্রস্তাব একবার উত্থাপিত হওয়ায় আরও তদন্ত ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৮৮১ সালে বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম হতে দাউদকান্দি পর্যন্ত একটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনা হয়। ১৮৮২ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কমিশনারগণ অনুরূপ একটি রেলপথ নির্মাণের পক্ষে দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে প্রতিবেদন পেশ করেন। একই বছর বাংলার ছোটলাট মত প্রকাশ করেন যে, চট্টগ্রামকে এর পশ্চাদ্ভূমির সঙ্গে সংযুক্ত করে রেলপথ নির্মিত হলে ‘গুরুত্বের দিক হতে এটা হবে বাংলায় অদ্বিতীয়’। ১৮৮২ সালের জুন মাসে বাংলা সরকার চট্টগ্রাম হতে দাউদকান্দির পরিবর্তে চাঁদপুর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের জন্য ভারত সরকারের নিকট এক পরিকল্পনা পেশ করে।

প্রায় একই সময়ে ভারত সরকারও রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাকে উন্মুক্ত করার গুরুত্ব আলোচনা করছিল। তিনটি বিকল্প পথ বিবেচনা করা হয়। প্রথমটি ছিল একটি রেলপথ নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাকে নর্দান-বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদীতে অপ্রতিরোধ্য জলস্রোতে সেতু নির্মাণ এবং নদী শাসন দুরূহ বিবেচনা করে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায় নি। পরবর্তী প্রস্তাব গোয়ালন্দের বিপরীত কোনো স্থান হতে ঢাকা হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত একটি রেলপথ নির্মাণ কর্তৃপক্ষকে ঢাকা-ময়মনসিংহ লাইন সম্প্রসারিত করে গারো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় নিয়ে যাবার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে উদ্বুদ্ধ করে। তৃতীয় সম্ভাবনাটি পূর্বোল্লিখিত পূর্ববঙ্গ-চট্টগ্রাম রেলপথের আলোচনার মাধ্যমে সূচিত হয়। সে সময়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় রেলওয়ে জরিপ কার্যের প্রধান প্রকৌশলী জে.ডব্লিউ বায়ার্স (JW Buyers)  ১৮৮২ সালে পূর্ববঙ্গের মধ্য দিয়ে উত্তর কাছাড় পর্বতশ্রেণী অতিক্রম করে চট্টগ্রাম বন্দর হতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা পর্যন্ত রেলপথের সম্প্রসারণের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি কলকাতার চেয়েও চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু সুনির্দিষ্ট সুবিধার বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে,  ‘বাণিজ্য চট্টগ্রামমুখী হবে’ এবং এতদুপলক্ষে বন্দরটির সংগে সংযোগ স্থাপনকে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ১৮৮২ সালে থেকে চট্টগ্রাম হতে আসাম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ ভারত সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ১৮৮৫-১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে অনুসন্ধান চলাকালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুবিধা এতই সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ১৮৯১ সালের মে মাসে ভারত সরকার উত্তর আসাম হতে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের মঞ্জুরি প্রদান করে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম উভয়ের প্রয়োজনেই আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নির্মিত হয়।

কাজেই বলা যায় যে, তিনটি প্রধান লক্ষ্যকে সামনে রেখে রেলপথটি নির্মিত হয়েছিল: নিকটতম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা প্রদান করে পূর্ববাংলার বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা, স্থলপথে যোগাযোগ সহজতর করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উন্নয়ন সাধন, কলকাতার সঙ্গে দীর্ঘ জলপথের যোগাযোগের পূর্ণ নির্ভরতা হ্রাস করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, সিলেট ও কাছাড়ে চা-শিল্পের আরও উন্নয়নের সুবিধা প্রদান।

আসাম বেঙ্গল কোম্পানি গঠিত হওয়ার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দরে পর্যাপ্ত ও স্থায়ী অবতরণ সুবিধার প্রতি ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওই  দাবির ফলে এতদুদ্দেশ্যে কাজ শুরু করা হয় যার ফলে উপকূলীয় ভূমি অধিগ্রহণ, জেটি নির্মাণ এবং সমুদ্রগামী জাহাজগুলিকে বন্দরে স্থান দেবার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধাদির ব্যবস্থা করা হয়।

১৮৮৭ সালের চিটাগাং পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্টের ১৯ ধারায় পোর্ট কমিশনারদের ঘাট ও জেটি নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। প্রায় চার বছর পর আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির আগমনের পর পোর্ট কমিশনারগণ এ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন যে, সমুদ্রগামী জাহাজের উপযোগী জেটি নির্মাণের জন্য তাদের উপকূলীয় ভূমি নেই। অতএব ১৮৯২ সালের আগস্ট মাসে ট্রাস্ট পণ্যাগার ও জেটি নির্মাণের জন্য কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীরে ৩৫০০ ফুট দীর্ঘ ও ৬৬০ ফিট প্রস্থবিশিষ্ট একখন্ড ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদনের জন্য বাংলা সরকারের নিকট আবেদন জানায়। কমিশনারগণ উল্লেখ করেন যে, প্রার্থিত ভূমিতে মাত্র চারটি জাহাজ রাখার স্থান সংকুলান হবে এবং অনতিবিলম্বে নদীর সম্মুখদিকে ব্যাপক এলাকা অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন। এর জন্য তারা আরও বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের আবেদন জানান। ইতোমধ্যে রেলওয়ের উপদেষ্টা প্রকৌশলীও তীর সম্মুখস্থ, দৈর্ঘ্যে ৮০০০ ফুট এবং প্রস্থে ১৫০০ ফুট, ভূমি অধিগ্রহণের নিমিত্ত নোটিশ প্রদানের জন্য সরকারের নিকট একটি প্রস্তাব প্রেরণ করেন। প্রস্তাবগুলি পাওয়ার পর চট্টগ্রামে মাল খালাস ও জাহাজযোগে প্রেরণের উপযুক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণের বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করার জন্য ১৮৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা সরকার একটি কমিটি নিয়োগ করে। ১৮৯৩ সালের মে মাসে এ কমিটি প্রস্তাব দেয় যে, কমপক্ষে ৬টি জাহাজের জন্য জেটির (প্রতিটির জন্য ৫০০ ফুট করে) ব্যবস্থা করা উচিত এবং বন্দর ও রেলওয়ের যৌথ প্রয়োজনে ডবল মুরিং জেটি হতে গুপ্তখালি খালের মোহনা পর্যন্ত ২০০০ ফুট চওড়া জমি সংগ্রহ করতে হবে।

বাংলা সরকার এ কমিটির বক্তব্য ভারত সরকারের কাছে প্রেরণকালে মত প্রকাশ করেন যে, তীরবর্তী সমগ্র ভূমি, চট্টগ্রামের সকল ঘাট ও জেটি পোর্ট ট্রাস্টের মালিকানায় থাকবে এবং ট্রাস্টই গুদামঘর, মাল খালাস ও মালবোঝাই কাজ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং রেলওয়ে কোম্পানিকে যথাযথ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবে। বাংলা সরকার আরও উল্লেখ করেন যে, এ দূরদর্শী পরিকল্পনার জন্য ভারত সরকার ঋণ আকারে অর্থ সরবরাহ করবে। পরিকল্পনাটির আর্থিক সংশ্রব নির্ণয় করার জন্য ভারত সরকার একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। এ সুপারিশ পরিকল্পনাটির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। অর্থ বিভাগের সহকারী সচিব জে.ই ও’ কোনোর এবং কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী জে.এইচ অ্যাপজন এ দুজন বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হয়। প্রথম জন আর্থিক বিধিমালা চরম কঠোরতার সঙ্গে প্রয়োগ করেন এবং অ্যাপজন তার নিজের বন্দর কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বী এ বন্দরের শ্রীবৃদ্ধি নিরোধ করতে না পারলেও সীমিত করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেন। এ দুই বিশেষজ্ঞ তাদের প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করেন যে, রেলপথ চালু হওয়া থেকে অন্তত বিশ বছরের জন্য দুটি জাহাজের ঘাট সুবিধা প্রদানই বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হবে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, পোর্ট কমিশনারগণ চারটি এবং বাংলা সরকারের কমিটি ছয়টি ঘাটের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। তারা ভবিষ্যতে বাণিজ্য বৃদ্ধি বা ভবিষ্যতে ভূমির প্রয়োজন সম্পর্কে আগাম ধারণার বিরুদ্ধেও মত প্রকাশ করেন। তারা অবশ্য সুপারিশ করেন যে তীরবর্তী ভূমি পর্যন্ত রেলওয়ের প্রবেশাধিকার এবং মালামাল খালাস ও গুদামজাত করার সুযোগ সুবিধা থাকা উচিত। রেলওয়ের দ্রব্য সামগ্রী খালাসের নিমিত্ত পাকা মঞ্চ নির্মাণের জন্য ১৫০০ বা ১৬০০ ফুট দীর্ঘ এক খন্ড ভূমি অধিগ্রহণের অনুমতি কোম্পানিকে দেওয়া যেতে পারে, তবে শর্ত থাকে যে যদি কখনও পোর্ট ট্রাস্ট এ ভূমি এবং এর উপর নির্মিত পাকা মঞ্চ নিজেদের আয়ত্তে নেওয়া প্রয়োজন মনে করে তাহলে রেলওয়ে কোম্পানিকে অর্থ প্রদান করে তারা তা নিতে পারবে। ভারত সরকার কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করেন এবং রেলওয়ে কোম্পানির ভূমি অধিগ্রহণে সম্মত হয়। কিন্তু এ মতের প্রতি অটল থাকে যে, পোর্ট ট্রাস্ট বন্দরে মাল খালাস ও মাল বোঝাইয়ের সকল কাজ সম্পাদন করবে এবং সাধারণ রেলওয়ে পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় মঞ্চ বা জেটির ব্যবস্থা পোর্ট ট্রাস্ট করবে এবং পোর্ট তহবিল থেকে এর ব্যয় নির্বাহ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য তীরভূমি অধিগ্রহণে ভারত সরকারের কার্যক্রম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ও’ কোনোর ও অ্যাপজনের রিপোর্ট ছিল। যখন দেখা গেল যে, পোর্ট ট্রাস্ট জেটি নির্মাণের জন্য অর্থায়ন করতে পারছে না তখন ভারত সরকার তার পক্ষে এবং সরকারি ব্যয়ে কাজটি সম্পন্ন করতে রেলওয়ে কোম্পানিকে নির্দেশ প্রদান করে। রাজকীয় তহবিল হতে জেটিগুলির নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয় এবং তা সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয়। জেটিগুলির নিয়ন্ত্রণ পোর্ট কমিশনারদের উপর ন্যস্ত করা হয় এবং বস্ত্তত তারা সরকারের এজেন্টে পরিণত হয়। অবশ্য ব্যবস্থাপনা আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হাতে থেকে যায়। জেটিগুলির ব্যবস্থাপনা সম্প©র্ক আলোচনা চলাকালে ডবল মুরিং-এ প্রথম জেটিটি নির্মিত হয় এবং ১৮৯৯ সালে চালু করা হয়। ১৯০২ সালের মে মাসে বাংলা সরকার দ্বিতীয় জেটি নির্মাণের অনুমোদন প্রদান করে। ১৯০৪-১৯০৫ সালে জেটিটি পূর্ণভাবে চালু হয়। ইতোমধ্যে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি ভারত সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, পোর্টের জেটিগুলির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ রেলওয়ের নিকট হস্তান্তর  করা উচিত এবং ১৯০৩ সালের ২৭ মার্চ জেটিগুলি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারত সরকার অবশ্য জেটিগুলি পুনর্গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করেন। ১৯০৩ সালে জেটিগুলি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কারণ এ হস্তান্তর রেলওয়ের কার্যক্রমকে সহায়তা করলেও বন্দরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। তখন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কমবেশি কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকারে পরিণত হয় এবং প্রাত্যহিক কাজকর্মে পোর্ট কমিশনারদের তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না।

অতি শীঘ্র দেখা যায় যে, বন্দরের বাণিজ্যিক চাহিদা মেটাতে দুটি জেটি যথেষ্ট নয়। সর্বমোট পাঁচটি জেটির জন্য একটি পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই ভারত সরকারের বিবেচনাধীন থাকায়, তৃতীয় জেটি নির্মাণের অনুমোদন প্রদান করা হয় এবং ১৯০৬-০৭ সালে রেলওয়ের কাজ হিসেবে জেটিটি নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য পরিচালনা পর্ষদ উপলব্ধি করে যে, পাঁচটি জেটি বন্দরের জন্য অপর্যাপ্ত হবে এবং তারা একমত হন যে, মোট সাতটি জেটির প্রয়োজন। এগুলি এক সঙ্গে নির্মাণ না করে পরিবহন সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জেটিগুলি নির্মাণের জন্য এজেন্ট একটি পরিকল্পনা পেশ করে।

ব্রিটিশ আমলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে বন্দরটির ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়। বঙ্গ বিভাগের পূর্বে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গ বিভাগের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য পোর্ট কমিশনারদের আর্থিক সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বন্দরের সুযোগ সুবিধা উন্নয়নের জন্য (জেটিগুলি ছাড়া, যার অর্থায়ন করা হয়েছিল রেলওয়ে উন্নয়ন বাজেট হতে) কার্জনের প্রতিশ্রুতি মতো রাজকীয় বাজেট হতে দশ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করা হয়। রাজকীয় বাজেট হতে আরও অনুদানের জন্য দাবি ১৯১০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল এবং ওই  বছর আরও পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়। বন্দরের দ্রুত উন্নয়ন কাজে খুব শীঘ্রই এ অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।

নতুন প্রদেশ পূর্ববাংলা ও আসামের সরকার এর প্রধান বন্দরের প্রতি যথার্থ গুরুত্ব আরোপ করে এবং নিজস্ব উৎস হতে উল্লেখযোগ্য তহবিল নিয়ে বন্দরের উন্নয়নের কাজে হাত দেয়। ১৯০৭ সালে তারা নিম্নলিখিত আর্থিক প্রতিশ্রুতি প্রদান করে: (ক) ১৯০৭ হতে রিবেটমেন্টে সর্বোচ্চ নয় লক্ষ টাকার অর্ধেক অর্থ বিনিয়োগ (রিবেটমেন্ট ও ড্রেজারের জন্য প্রাক্কলিত মোট ত্রিশ লাখ ব্যয়ের উপর);  চূড়ান্ত মোট ব্যয়ের হিসাব ত্রিশ লাখ অতিক্রম করলে বর্ধিত প্রাদেশিক সাহায্যের প্রস্তাব ঔদার্য্য সহকারে বিবেচিত হবে; (খ) ড্রেজারের পরিচালনা ব্যয় বাবদ পাঁচ বছরের জন্য বছরে ৫৯,৬২৪ টাকা পর্যন্ত প্রাদেশিক অনুদান।

পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের নতুন সরকার জেটিগুলির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ব্যর্থ চেষ্টা করে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম বিভাগ ১৯১১ সালে বাতিল করা হয়। নতুন সরকার কর্তৃক বন্দরের উন্নয়নে গৃহীত উদ্যোগের অবসান ঘটে। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের মর্যাদা একটি প্রদেশের প্রধান বন্দর হতে কলকাতার সহায়ক বন্দর না হলেও দ্বিতীয় অবস্থানে চলে আসে এবং তা ঘটে এমন এক সরকারের অধীনে যে সব সময়ই পরবর্তী বন্দরের স্বার্থকে চট্টগ্রামের আগে বিবেচনা করত। বঙ্গ-বিভাগ বাতিলকরণের ফলে বন্দর উন্নয়নের জন্য সরকারি তহবিলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী স্থানগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ১৯০৬ সালে গৃহীত সাতটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চতুর্থটির পরে আর কোনো জেটি নির্মিত হয় নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বন্দরে পরিণত হয় এবং এর যথাযোগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বন্দর হিসেবে এর প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯৯ সালের জুন মাসের মধ্যে এর জেটি সংখ্যা ২২ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য নিয়ে বর্তমান চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হয়ে থাকে। এ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে- বন্দরে কর্মরত সকলে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত; প্রশাসনের অধীনে মোট বিভাগ রয়েছে পনেরোটি (১৫); মোট (অনুমোদিত) কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৮৬৫৫ জন; বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৫৭৮৪ জন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের চার জন সদস্য চারটি নির্বাহী বিভাগের প্রধান।  বিভাগসমূহ হলো:

সদস্য       -   প্রকৌশল

সদস্য       -   পোতাশ্রয় ও জাহাজ

সদস্য       -   অর্থ

সদস্য       -   প্রশাসন ও পরিকল্পনা

তাছাড়াও যান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য রয়েছে পৃথক বিভাগ।

চট্টগ্রাম বন্দরের ৪৫,৫৩৯ বর্গমিটার আয়তনের একটি অঙ্গন আছে এবং এর কন্টেইনারের ধারণ ক্ষমতা ১০০০ টি.ই.ইউ.এস। এর একটি টাগ বহর রয়েছে যার সর্বোচ্চ শক্তি ২২৫০ বি.এইচ.পি এবং ২৫০০ ঘনমিটার ক্ষমতাসম্পন্ন হোপার ড্রেজার আছে। ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত পনের লক্ষ টন পণ্যসহ বন্দরটি বার্ষিক এক কোটি পঁচাশি হাজার টন পণ্য খালাস করেছে।

সারণি ১  ১৯৪৬-৪৭ হতে ২০০৮-০৯ পর্যন্ত বন্দরে মালামাল বহনের চিত্র নিম্নরূপ:

বছর  আমদানি রপ্তানি
১৯৪৬-৪৭ ১,৫৫,৯০৭ ৮৭,১৭৭
১৯৫০-৫১ ৪,২৬,৪৩১ ১২,৬৮,৬০০
১৯৬৩-৬৪ ৫,৬৩,৪৮৩ ৩২,৯৭,৭৯০
১৯৭০-৭১ ৩৭,৫৫,১০০ ৪,১১,৮৪৪
১৯৭৪-৭৫   ৪২,৪০,৬১৬ ২,৫৭,৯২৪
১৯৮০-৮১   ৪৯,৩৫,৯৩৬ ৫,৩৮,৯৩৩
১৯৯৪-৯৫ ৮৯,২৮,৫১৪ ১৩,৫৪,৩৬০
১৯৯৬-৯৭   ৯১,১৭,২৫৯ ১৪,৩৬,৯৯০
১৯৯৮-৯৯   ১,২২,০৫,৯০৬ ১৬,৯৭,৩৬২
২০০৩-০৪ ১,৯৪,১৩,৪৬০ ২৪,৫৮,৯৭২
২০০৪-০৫ ২,২৯,৮৯,১২২ ২৮,৯৫,৭৬৯
২০০৫-০৬ ২,৩৯,৩৬,১০৩ ৩০,৮৯,৫৫০
২০০৬-০৭ ২,৪২,৩৬,২৬১ ৩৩,৯২,৯৭৪
২০০৭-০৮ ২,৪৪,৯২,৭০৭ ৩৭,০৪,৮৬২
২০০৮-০৯ ২,৬৭,১৮,৮৩৪ ৩৭,৬৩,৭৪৭

সূত্র  চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ২০১০।

বন্দরটির একটি ড্রাইডক আছে যেখানে ১৬,৫০০ ডি.ডব্লিউ.টি ওজনের জাহাজ মেরামত করা হয়। তাছাড়া ব্যক্তিমালিকানাধীন কয়েকটি জাহাজ মেরামতের ডকও রয়েছে। আগুন মোকাবেলা করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত একটি পূর্ণ অগ্নি নির্বাপক ইউনিট, জেটি সংলগ্ন এলাকায় এবং সামুদ্রিক অগ্নিকান্ড মোকাবেলার জন্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি সজ্জিত দুটি জাহাজ সর্বদা তৈরি রাখে। ছাউনি, পণ্যাগার ও অঙ্গনগুলি পানি ছিটানোর যন্ত্র, পানির কল, বিভিন্ন প্রকার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং ফায়ার বাকেট প্রভৃতি দ্বারা সজ্জিত। বন্দরটি এর পশ্চাদ্ভূমির সঙ্গে সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ দ্বারা সংযুক্ত।

সারণি ২ চট্টগ্রাম বন্দরে অভ্যন্তরীণ এবং আই.সি.ডিতে  হ্যান্ডলিং করা মোট মালামালের পরিমাণ (টন) প্রদর্শিত হলো।

অর্থ বৎসর আমদানি (টন) রপ্তানি (টন) অভ্যন্তরীণ (টন) আইসিডি (টন) সর্বমোট (টন)
১৯৯৭-৯৮ ৯৫,৫৯,৬৯৯ ১৫,২৬,৭৩১ ১০,৪০,৪৬৩ ২,৫৮,০০৮ ১,২৩,৮৪,৯০১
১৯৯৮-৯৯ ১,২২,০৫,৯০৬ ১৬,৯৭,৩৬২ ৯,৬৫,০৬০ ৩,১৭,১৯৩ ১,৫১,৮৫,৫২১
২০০৪-০৫ ২,২৯,৮৯,১২২ ২৮,৯৫,৭৬৯ ৩২,০০,০৯৪ ৪,৮৩,৪৪০ ২,৯৫,৬৮,৪২৫
২০০৫-০৬ ২,৩৯,৩৬,১০৩ ৩০,৮৯,৫৫০ ২৬,৩৩,৫৬৫ ৪,৮০,৪৩৯ ৩,০১,৩৯,৬৫৭
২০০৬-০৭ ২,৪২,৩৬,২৬১ ৩৩,৯২,৯৭৪ ২৬,৭৭,৫০৯ ৪,৯২,৬৪৪ ৩,০৭,৯৯,৩৮৮
২০০৭-০৮ ২,৪৪,৯২,৭০৭ ৩৭,০৪,৮৬২ ২৫,১৮,৫৬৪ ৪,৩৪,৬২৮ ৩,১১,৫০,৭৬১
২০০৮-০৯ ২,৬৭,১৮,৮৩৪ ৩৭,৬৩,৭৪৭ ২৮,৩০,০২৫ ৪,৯৪,৫২৫ ৩,৮১,৬৯,১২৪

সূত্র  চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ২০১০।

বাংলাদেশের আমদানী রপ্তানী পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে।  চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, কাঁচা ও পাকা চামড়া, চা, ন্যাপথালিন, চিটাগুড়, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, তৈরী পোশাক ও সার। প্রধান আমদানি দ্রবা্যদি হচ্ছে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম, চিনি, লবণ, সার, সাধারণ মালামাল, লৌহ, দ্রব্যসামগ্রী ও রাসায়নিক দ্রব্য। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বার্ষিক হার ১২-১৪ শতাংশ। বিশ্বের আধুনিক বন্দর সমূহের সাথে সঙ্গতি রেখে চট্টগ্রাম বন্দরকে অত্যাধূনিক বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে নিউমুড়িং এলাকায় নতুন টার্মিনাল এর ৪ ও ৫ নং বার্থের পিছনে পশ্চাত সুবিধাদি নির্মাণ, কর্ণফুলি নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, চট্টগ্রাম বন্দর ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন প্রকল্পের আওতায় এর সার্বিক কার্যক্রম আধুনিকায়ন, ব্যাপক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও লিংক রোড নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

সারণি ৩  চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডেলকৃত জাহাজের সংখ্যা দেখানো হয়েছে।

অর্থ বছর জাহাজের সংখ্যা
১৯৯৪-৯৫ ১৩৬০
১৯৯৫-৯৬ ১৪০৯
১৯৯৬-৯৭ ১৪৮২
১৯৯৭-৯৮ ১৩৮৯
১৯৯৮-৯৯ ১৪২৫
২০০৩-০৪ ১৭৬৪
২০০৪-০৫ ১৮৯২
২০০৫-০৬ ১৯৫৭
২০০৬-০৭ ১৯৪৫
২০০৭-০৮ ২০৯৯
২০০৮-০৯ ২১৬৭

সূত্র  চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ২০১০।

সারণি  ৪ চট্টগ্রাম বন্দরের আয় ব্যয়ের পরিসংখ্যান (কোটি টাকা)।

অর্থ বছর আয় ব্যয় উদ্বৃত্ত
২০০০-০১ ৪৭৭.০১ ৩০২.২৯ ১৭৪.৭২
২০০১-০২ ৫৩১.৩৭ ৩৫১.০১ ১৮০.৩৬
২০০২-০৩ ৫৩০.৬৬ ৩৭৩.৭৫ ১৫৬.৯১
২০০৩-০৪ ৫৫৭.৩৬ ৩২৫.৬০ ২৩১.৭৬
২০০৪-০৫ ৬৪৯.৭৮ ৩১৯.৬৫ ৩৩০.১৩
২০০৫-০৬ ৭৪১.১৩ ৩৭৬.১১ ৩৬৫.০২
২০০৬-০৭ ৮৩০.০২ ৪৫১.২৬ ৩৭৮.৭৬
২০০৭-০৮ ১০৫৭.০৪ ৪৪৭.১৬ ৬০৯.৮৮
২০০৮-০৯ ১১২৬.৭৮ ৫০২.৬৬ ৬২৪.৩২

সূত্র  চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ২০১০।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্গত প্রকল্পসমূহ:

সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পসমূহ:

২০০৮ সালে নিউ মুড়িং এ একটি কনটেইনার এর কাজ

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে এডিবি এর অর্থ সহায়তায় পোর্ট এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট

২০০৯ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে টেকনো-ইকোনোমি ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ, প্রভৃতি।

চলমান প্রকল্পসমূহ ২০১১ পর্যন্ত):

এডিবি এর অর্থ সহায়তায় আনু: ১৩০০০ লাখ ব্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বানিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির প্রকল্প

নিউ মুড়িং কনটেইনার টার্মিনালের ৪ ও ৫ নং বার্থের পেছনে ব্যাকআপ সুবিধার জন্য নির্মাণ কাজ

তৃতীয় কর্ণফুলি সেতু থেকে সদরঘাট  জেটি পর্যন্ত সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি ও নদী তীরবর্তী অঞ্চল রক্ষা এবং নদী ড্রেজিং এর কাজ, প্রভৃতি।

কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পণাসমূহ:

বন্দর এলাকার অভ্যন্তরে একটি ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ

একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ

বহুতল বিশিষ্ট মটর যান পার্কিং ছাউনি নির্মাণ

বন্দরের জন্য বন্দর এলাকার বাইরের সংরক্ষিত এলাকায় পতেঙ্গা কনটেইনার ডিপো নির্মাণ

চট্টগ্রাম ইপিজেড ও বারোপাল এর মধ্যবর্তী সংযোগ রাস্তা নির্মাণ, প্রভৃতি।

উক্ত পরিকল্পনাসমূহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ- এ তিন মেয়াদে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ কাজের মান ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সম্প্রতি পূর্ববর্তী কার্য দিবসের সময় পুণর্বিন্যাস করেছে। দুই সিফ্ট-এ ডিউটির পরিবর্তে বর্তমানে তা তিন শিফ্ট-এ আনা হয়েছে। বন্দরের কনটেইনার জট কমানোর লক্ষে তার দ্রুত বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, খালি কনটেইনার ডকের বাইরে সরিয়ে নেয়া, গ্রীন চ্যানেল সংযোজন করা, রপ্তানীর উদ্দেশ্যে আসা কন্টেইনার অবতরণের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া প্রভৃতি নতুন নিয়ম আরোপিত হয়েছে। তাছাড়াও বন্দরের সকল অর্থ লেনদেনের কাজ বর্তমানে কম্পিউটারের মাধ্যমে, অর্থাৎ যান্ত্রিক উপায়ে সম্পন্ন করার নিয়ম চালু হয়েছে।

বন্দরের নিউ মুড়িং কনটেইনার টার্মিনালে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ থেকে ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৪০০ থেকে ২৩১৯১টি ই.ইউ করা হয়েছে। কার্গো নিয়ন্ত্রণ ব্যায় ৩০% কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে মার্চ ২০০৭ থেকে ব্যক্তি মালিকানাধীন অপারেটর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বন্দরে বর্তমানে (২০১১ পর্যন্ত) ৩২ টি ট্রেড ইউনিয়নের অস্তিত্ব থাকলেও ২০০৬ সালের বাংলাদেশে শ্রমিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তাদের সকল প্রকার কর্মকান্ড বন্ধ রয়েছে।  [শিরীন হাসান ওসমানী এবং মোহাম্মদ আবদুল মজিদ]