ঘোষ, শিশিরকুমার


ঘোষ, শিশিরকুমার (১৮৪০-১৯১১)  সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজসেবী। তাঁর জন্ম ১৮৪০ সালে যশোর জেলার পলুয়া-মাগুরা গ্রামে। পিতা হরিনারায়ণ ঘোষ ছিলেন যশোরের একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল । তাঁর মাতার নাম অমৃতময়ী।

শিশিরকুমার নিজ গ্রামের স্কুলেই বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পাঠ শেষ করেন। পরে তিনি পিতার কর্মস্থল যশোরের স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হন। যশোরে কিছুকাল অধ্যয়ন করার পর তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় যান। সেখানে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলে (বর্তমানে হেয়ার স্কুল) ভর্তি হন। ১৮৫৭ সালে তিনি উক্ত স্কুল হতে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে এক বৎসরের জন্য ‘হিন্দু স্কুল বৃত্তি’ লাভ করেন। ওই বৎসরই কলকাতা-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা গৃহীত হয়। পরে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পরার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে কিছুসময় অধ্যয়ন করেন।

ছাত্রজীবন শেষ করে তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যশোর ও নদীয়া তখন নীলকরদের দোর্দন্ড প্রতাপ। সেসময়ের হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রে তিনি ‘যশোহরের সংবাদদাতা’-রূপে প্রধানত MLL স্বাক্ষরে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী লিখে পাঠাতে শুরু করেন (১৮৫৯/৬০ সাল)। ১৮৬২ সালের শেষ দিকে পাদ্রী বসন্তকুমারের সহযোগীতায় তিনি কলকাতা থেকে একটি কাঠনির্মিত প্রেস ক্রয় করেন। এ প্রেস থেকে তিনি সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও কৃষিবিষয়ক অমৃত প্রবাহিনী নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। কম্পোজিটার, প্রেসম্যান ও এডিটরের কাজসহ অধিকাংশ রচনা তিনি নিজেই লিখতেন। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালের ডিসেম্বরে। পত্রিকাটি ১৮৬৮ সালে অমৃত বাজার পত্রিকা নামে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির মন্ত্র ছিল- ‘আমরা ইংরেজ হইতে স্বতন্ত্র, কাজেই আমাদের আদর্শ ও পন্থাও ভিন্ন’। ইংরেজসৃষ্ট প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ১৮৭৮ সালের ২১ মার্চ উক্ত অমৃত বাজার পত্রিকা-টি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু পত্রিকাটির বাংলা অংশের অভাব পূরণের লক্ষ্যে একই বছরের এপ্রিল মাসে আনন্দ বাজার পত্রিকা নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক প্রচারিত হতে থাকে। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার অভাব অনুভূত হওয়ায় ১৮৯১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হতে অমৃত বাজার পত্রিকা দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। শিশিরকুমারের অমৃত বাজার পত্রিকা-টি স্বদেশভক্তির প্রেরণা সঞ্চারে ব্যাপক সহায়ক হয়েছিল।

শিশিরকুমার গ্রামে উচ্চ-ইংরেজি বিদ্যালয়, নৈশ বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ডাকঘর, হাটবাজার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠিত করেন। পেশাগত জীবনের প্রথমে তিনি যশোরের কোন্নগর ও পরে সাতক্ষীরা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে তিনি ডেপুটি ইন্সপেক্টর ও ইনকাম ট্যাক্স এসেসরের দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভাব পূরণের লক্ষ্যে তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৮৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়ান লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতায় ‘এলবার্ট টেম্পল অব সায়েন্স’ নামক শিল্পবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটিতে নির্বাচন-প্রথা প্রবর্তন-এ লীগ প্রতিষ্ঠারই ফল। তিনি জাতীয় রঙ্গালয় (বঙ্গীয় নাট্যশালা) স্থাপনে সক্রিয় সহযোগীতা করেছেন। তৎকালীন সমাজের অবস্থা বিবেচনা করে তিনি নিজ পত্রিকায় বিধাব-বিবাহের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর Lord Gauranga  গ্রন্থটির মাধ্যমে পাশ্চাত্যে গৌরাঙ্গকথার প্রসার ঘটেছে। ফলে আমেরিকায় বহু শিক্ষিত নরনারী গৌরাঙ্গলীলা পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছে। শিশিরকুমারের চেষ্টায় আমেরিকার শিকাগোতে একটি বৈষ্ণব-মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত গৌরাঙ্গ-সমাজ তাঁরই যত্ন ও চেষ্টার ফল।

বহুমুখী কর্ম প্রচেষ্টায় সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য সাধনায়ও ব্যাপৃত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কাব্য শ্রীকালাচাঁদ-গীতা (১৮৯৬), সংগীত শাস্ত্র (১৮৬৯), প্রহসন নয়শো রুপেয়া (১৮৭৩) ও বাজারের লড়াই (১৮৭৪), নাটক শ্রীনিমাই-সন্ন্যাস (১৯০৯), শ্রীঅমিয়নিমাই-চরিত (১ম খন্ড-১৮৯২, ২য় খন্ড-১৮৯৩, ৩য় খন্ড-১৮৯৪, ৪র্থ খন্ড-১৮৯৬, ৫ম খন্ড- ১৯০১, ৬ষ্ঠ খন্ড- ১৯১১), Lord Gauranga (Vol.1-1897, Vol. 2-1898)। তাঁর সম্পাদিত ও পরিচালিত সাময়িকপত্র: অমৃত বাজার পত্রিকা, পাক্ষিক শ্রীশ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া, মাসিক শ্রীশ্রীগৌর-বিষ্ণু, Amrita Bazar Patrika, Hindu Spiritual Magazine। ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।  [শামীমা আক্তার]