ঘটক


ঘটক  বরপক্ষ ও কনেপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনপূর্বক  বিবাহ সম্পাদনে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি। ঘটকের আভিধানিক অর্থ ঘটনার সংঘটয়িতা। অতীতে ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি সমাজে যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশার সুযোগ ছিল না। তখন পূর্বপরিচয়-সূত্রে বর-কনের স্বেচ্ছায় বিবাহ সংঘটন সমাজিক বিধি-বিধানের পরিপন্থী বলে গণ্য হতো। তাই ঘটকের মাধ্যমে বিবাহ স্থির হওয়ার রীতি ছিল বহুল প্রচলিত এবং এজন্য সমাজে ঘটকের গুরুত্বও ছিল অনেক। কেউ কেউ এ পেশার দ্বারা জীবিকা নির্বাহও করত। বিবাহকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর উভয় পক্ষ থেকে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হতো।

প্রাচীনকালে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ঘটকের পেশা গ্রহণ করতেন। তাঁরা ‘কুলাচার্য’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং কুলজিগ্রন্থ রচনা করতেন, যার কোনো কোনোটি বাংলার ইতিহাস রচনার উপকরণ হিসেবেও ব্যবহূত হয়েছে। প্রাচীনযুগের কয়েকজন বিশিষ্ট ঘটক হচ্ছেন এডু মিশ্র, হরি মিশ্র (১৩শ শতক?), ধ্রুবানন্দ মিশ্র, দেবীবর ঘটক (১৫শ শতক) এবং নুলো পঞ্চানন (১৮শ শতক)। সমাজে এঁদের খুবই প্রাধান্য ছিল।

বাংলায় কৌলীন্য প্রথার উদ্ভবে এ ঘটকদের একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। পুত্র-কন্যার বিবাহ দেওয়ার সময় লোকে উচ্চবংশ সন্ধান করত, যার তথ্য পাওয়া যেত ঘটকদের কাছ থেকে। ঘটকরা বিভিন্ন বংশের মর্যাদা এবং বিশুদ্ধ কুলীনদের পরিচয় সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য অবগত থাকতেন। এমনকি তাঁদের কাছে বিভিন্ন কুলীন বংশের কুলজিও থাকত এবং তাঁদের মাধ্যমে বংশের কৌলীন্য বহুলাংশে প্রচারিত হতো।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পেশাদার ঘটক ছিল; তবে তাদের মধ্যে  ব্রাহ্মণ ঘটকের সংখ্যাই ছিল অধিক। হিন্দু ব্যতীত অন্যান্য ধর্মের লোকদের মধ্যেও ঘটক ছিল। মহিলা ঘটকের সংখ্যাও কম ছিল না। ঘটকরা পাত্র-পাত্রীর বংশ, গোত্র,  আত্মজীবনী ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহের মাধ্যমে সমাজের একটি গুরুদায়িত্ব পালন করত। পারিবারিক তথ্যাদি সরবরাহের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের অবদান ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শুভাশুভ নির্ণায়ক জন্মকালীন লগ্ন ও গ্রহাবস্থানযুক্ত জন্মপঞ্জিকা বা  কোষ্ঠী প্রবর্তনে এবং রাশিভিত্তিক ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্রের অগ্রগতিতে ঘটকদের বিশেষ অবদান রয়েছে। বিবাহের শুভ দিন-ক্ষণ নির্ণয় সাপেক্ষে পঞ্জিকার ক্রমোন্নতিতেও ঘটকরা অবদান রেখেছে।

বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে বিবাহের ক্ষেত্রে ঘটকের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। পেশাগত ঘটক এখন নেই বললেই চলে। শিক্ষিতদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মীয়তার সূত্রে কখনও কখনও এ দায়িত্ব পালন করেন। শহর এলাকায়, বিশেষত ঢাকায়, এখন এ উদ্দেশ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এমনকি ঘটকালির জন্য ওয়েবসাইট পর্যন্ত খোলা হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের ছবি ও পূর্ণ পরিচয়সহ ওয়েবসাইট বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েও ঘটকালি করা হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে হয় এবং উদ্দেশ্য সফল হলে প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য পরিশোধ করতে হয়।

সমাজ পরিবর্তনের এ ছোঁয়া গ্রামাঞ্চলেও পড়েছে। তাই সেখানেও আগের মতো ঘটক আর দেখা যায় না। তাছাড়া বর্তমানে অনেকেই পূর্ব পরিচয়সূত্রে পরিণয়াবদ্ধ হচ্ছে। এ কারণেও বাংলার এক সময়ের এ ঐতিহ্যবাহী ধারাটি এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনও ঘটকের ভূমিকা বিদ্যমান। পেশাদার ঘটক না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকে।  [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]

আরও দেখুন কুলজি