গ্র্যান্ট, স্যার জন পিটার


গ্র্যান্ট, স্যার জন পিটার (১৮০৭-১৮৯৩)  একজন বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর (১৮৫৯-১৮৬২)। ইতঃপূর্বে বেসামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও আইনজীবী হিসেবে বেশ কয়েকজন পিটার বাংলায় এসেছিলেন। এদের মধ্যে তাঁর পিতা স্যার জন পিটার গ্র্যান্ট (১৭৭৪-১৮৪৮) একজন। তাঁর পিতা ১৮৩৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের জুনিয়র জজ (Puisne judge) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইটন এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভের পর পিটার গ্র্যান্ট ১৮২৮ সালে কোম্পানি সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। একত্রিশ বছর বিভিন্ন পদে চাকুরি করার পর ১৮৫৯ সালের ১ মে তিনি বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নিযুক্ত হন। লেফটেন্যান্ট গভর্ণর পদে যোগদানের অব্যবহিত পূর্বে তিনি ১৮৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত ভারত সরকারের সচিব পদে এবং ১৮৫৪-৫৯ সাল পর্যন্ত গভর্ণর জেনারেলর কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সরকারি নথিতে জন পিটার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তাঁর বহুমুখী কর্মক্ষমতা, বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতাবোধ, যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর নিরপেক্ষ মতামত এবং জনগণের প্রতি তাঁর সহানুভূতি তাকে ওই সময়ের যথার্থ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।’ বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর হিসেবে জন পিটার গ্র্যান্ট এর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল নীল চাষীদের ব্যাপারে তাঁর গৃহীত নীতি যা তাঁকে বাংলার কৃষকদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সাহায্য করেছিল। তিনি নির্যাতিত নীল চাষীদের পক্ষ নিয়ে তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা অভিযোগ করে যে, ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ ছিল জন পিটার গ্র্যান্ট কর্তৃক প্রদত্ত নীলকরদের অধিকার সংকোচনমূলক সার্কুলারের প্রত্যক্ষ ফল। ১৮৬০ সালের নীল কমিশন এর প্রতিবেদন অনুসারে দেখা যায় যে, নীল চাষীরা (রায়ত) গ্র্যান্টের প্রশাসনিক নীতি থেকে একটা বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যদি নীলকরদের জবরদস্তি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রতিবাদ করে তাহলে সেটা সরকারের প্রতি কোনো প্রকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে না। রায়তদের প্রতি গ্র্যান্টের প্রত্যক্ষ ও ইতিবাচক সমর্থন তাঁকে কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীর নিকট খুবই অপ্রিয় করে তুলেছিল। বলা হয় যে, ইন্ডিগো প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চাপের কারণে স্বাভাবিক মেয়াদ পূর্তির আগেই তাঁকে অবসর গ্রহণ করতে হয়েছিল। ১৮৬২ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি অবসর নেন।

নীল বিদ্রোহ ছাড়া অন্য যে সব কারণে স্যার জন পিটার গ্র্যান্ট-এর শাসনকাল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিল সেগুলি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারসহ অনেক দেশিয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, সংঘবদ্ধ ডাকাতি বন্ধের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ, চা ও সিঙ্কোনাসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কৃষির সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপজাতিদের উত্থান ও খাসিয়া বিদ্রোহ দমন, মহকুমা পদ্ধতির সম্প্রসারণ, পুলিশ বিভাগ পুনর্গঠন, বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সূচনা প্রভৃতি। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি জ্যামাইকার গভর্নর হিসেবে ছয় বছর (১৮৬৬-৭২) দায়িত্ব পালন করেন। জন পিটারের ১৮৯৩ সালের ৬ জানুয়ারি পঁচাশি বছর বয়সে মৃত্যু হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]