গ্রুপ থিয়েটার মুভমেন্ট


গ্রুপ থিয়েটার মুভমেন্ট  ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ নাট্যআন্দোলন। তৎকালীন শিক্ষিত ও সচেতন সংস্কৃতিকর্মী এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে এটি গড়ে ওঠে। তাঁরা নাটকের বিষয়বস্ত্ত, বক্তব্য, উপস্থাপনা ও অভিনয়রীতি এবং আঙ্গিকগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নাটককে করে তোলেন সমাজ ও জীবনঘনিষ্ঠ। এ গ্রুপ থিয়েটার বা সংঘনাট্যচর্চা দেশের নাটকের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করে এবং লাভ করে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ফলে নাটক হয়ে ওঠে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাগরণের মাধ্যম।

গ্রুপ থিয়েটারের উদ্ভব মূলত বিদেশে। রুশ সাহিত্যিক গোগোল জীবনঘনিষ্ঠ নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে প্রথম এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, আর এর সফল বাস্তবায়ন ঘটে স্তানিপাভস্কির মাধ্যমে। বিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁর প্রচেষ্টায় গঠিত ‘আর্ট থিয়েটার’ গোষ্ঠী নাট্য-আন্দোলনে বিরাট পরিবর্তন আনে। এক সময় ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব বিস্তৃত হয়। বিশ থেকে চল্লিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এলিয়া কাজানের ‘দি গ্রুপ থিয়েটার’, লন্ডনের ‘ইউনিটি থিয়েটার’ এবং ফ্রান্সের ‘ক্যাম্পেন ডি কুইজঁ’ নাট্যজগতে নবজাগরণের সৃষ্টি করে।

ভারত উপমহাদেশে গ্রুপ থিয়েটার ধারণার জন্ম হয় চল্লিশের দশকে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’-এর (আইপিটিএ) মাধ্যমে। এ সময় কলকাতায় নবধারায় রচিত ও মঞ্চস্থ নবান্ন, ছেঁড়া তার, উলুখাগড়া  নাটক দর্শকচিত্তে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পঞ্চাশের দশকে ঢাকাতেও গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সূচনা হয়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষিত তরুণরা ১৯৫৬ সালে গঠন করেন  ড্রামা সার্কল। এর নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ মকসুদুস সালেহীন, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, তৌফিক আজিজ খান,  বজলুল করিম প্রমুখ। ড্রামা সার্কল নাটক নির্ধারণ, মঞ্চায়ন ও প্রযোজনায় নবতর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। এর উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয় কবর, মানচিত্র, কেউ কিছু বলতে পারে না, রক্তকরবী, বহিপীর, কালবেলা প্রভৃতি নাটক। ১৯৬৮ সালে জিয়া হায়দার ও আতাউর রহমানের উদ্যোগে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়  নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। পরে আলী যাকের, সারা আমিন, আসাদুজ্জামান নূর এতে যোগ দেন। এ গোষ্ঠী ১৯৭২ সালে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দর্শনীর বিনিময়ে বাকি ইতিহাস মঞ্চস্থ করে। এ গোষ্ঠী প্রযোজিত  অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে সৎ মানুষের খোঁজে, বিদগ্ধ রমণীকুল ও তৈল সংকট, দেওয়ান গাজীর কিস্সা, নূরুলদীনের সারাজীবন, ভেঁপুতে বেহাগ প্রভৃতি।

গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নাটক রচনা, প্রযোজনা, নির্দেশনা, অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা ও সংগঠন তৎপরতায় প্রতিটি সদস্যের অংশগ্রহণের সার্থক বাস্তবায়ন। এ ধারার সম্প্রসারণ ঘটে স্বাধীনতাত্তোর পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক  নাট্যচক্র (১৯৭২),  বহুবচন (১৯৭২) প্রভৃতি গোষ্ঠীর কর্মকান্ডে। নাট্যচক্রের মাধ্যমে গ্রুপ থিয়েটারচর্চা সুসংহত হয়। এ গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন ম হামিদ। গোষ্ঠীর তরুণ কর্মীরা নাটক রচনা থেকে শুরু করে মঞ্চায়ন পর্যন্ত প্রতিটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। এ গোষ্ঠী প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা, রেভ্যুলিউশন, সম্রাট ও প্রতিবন্ধী, বিদায় মোনালিসা, পেন্ডুলামের খুন প্রভৃতি।

ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে গঠিত বহুবচন স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এ গোষ্ঠী প্রযোজিত নাটকের মধ্যে রয়েছে প্রজাপতির লীলালাস্য, সভাপতি বলবেন, সাড়ে সাতশো সিংহ, নন্দিত নরকে প্রভৃতি। প্রবীণ নাট্যকর্মীদের নিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন ও রামেন্দু মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত হয়  থিয়েটার (১৯৭২)। এ গোষ্ঠী মুনীর চৌধুরীর কবর (১৯৭২) মঞ্চায়নের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। এর প্রধান কীর্তি দেশের প্রথম ও নিয়মিত নাট্যপত্রিকা থিয়েটার (১৯৭২) প্রকাশ। গোষ্ঠী প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে সুবচন নির্বাসনে, এখন দুঃসময়, কোকিলারা  প্রভৃতি। মামুনুর রশীদের নেতৃত্বে গঠিত  আরণ্যক নাট্যদল (১৯৭২) প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটক ওরা কদম আলী, ইবলিশ, গিনিপিগ প্রভৃতি। নাসিরউদ্দিন ইউসুফের নেতৃত্বে গঠিত  ঢাকা থিয়েটার (১৯৭৩) লোকজ ঐতিহ্য ও লোকনাট্যের আদলে নাটক রচনা, প্রযোজনা ও পরিবেশনার মাধ্যমে  গ্রুপ থিয়েটারচর্চার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। এ গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে মুনতাসীর ফ্যান্টাসী, শকুন্তলা, কীত্তনখোলা, ফণিমনসা, হাত হদাই, যৈবতী কন্যার মন  প্রভৃতি। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে এ গোষ্ঠীর উদ্যোগে গঠিত হয় ‘গ্রাম থিয়েটার’ নামে একটি নতুন সংগঠন, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে আরও যেসব নাট্যগোষ্ঠী অবদান রাখছে সেসবের মধ্যে রয়েছে ঢাকার ঢাকা নাট্যদল (১৯৭৫),  নান্দনিক নাট্য সম্প্রদায় (১৯৭৭),  পদাতিক নাট্য সংসদ (১৯৭৮),  লোকনাট্যদল (১৯৮১), ঢাকা ড্রামা (১৯৮৫), মহাকাল (১৯৮৩); চট্টগ্রামের  তির্যক নাট্যগোষ্ঠী (১৯৭৪),  গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় (১৯৭৫),  অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায় (১৯৭৫), কণক (১৯৮২); রাজশাহীর  অনুশীলন নাট্যদল (১৯৭৯), রাজশাহী থিয়েটার (১৯৮৫); কুষ্টিয়ার  অনন্যা’৭৯, সিলেটের  সন্ধানী নাট্যচক্র (১৯৮১), বরিশালের  শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার (১৯৮১), কুমিল্লার  জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায় (১৯৭৮), গাইবান্ধার পদক্ষেপ (১৯৮৬), খুলনার  খুলনা থিয়েটার (১৯৮১) প্রভৃতি।

রামেন্দু মজুমদার প্রমুখের উদ্যোগে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে গঠিত হয়  বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এবং পরবর্তী বছর আগস্টে অনুষ্ঠিত হয় এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলন। এতে ৬৭টি নাট্যগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৯-এর সেপ্টেম্বরে ফেডারেশনের পঞ্চদশ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ফেডারেশনভুক্ত নাট্যগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৫টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফেডারেশন দেশের নাট্যচর্চার  উন্নয়ন ও সমন্বয় সাধনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে আসছে।  [অনুপম হায়াৎ]