গৌড়, জনপদ


গৌড়, জনপদ  প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল। গৌড় নামটি সুপরিচিত হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে নির্দিষ্ট ধারণা করা কষ্টসাধ্য। তবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ, পুন্ড্র ও কামরূপের সাথে গৌড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ জনপদের ভৌগোলিক সীমার যথার্থ উল্লেখ পাওয়া না গেলেও, বঙ্গ ও পুন্ড্রের সঙ্গে একত্রে এগুলির উল্লেখের কারণে এর অবস্থান পূর্বভারতে ছিল বলে ধরা যায়। বাৎসায়ন (তিন-চার শতক) এ জনপদের উল্লেখ করেছেন। পুরাণেও গৌড়কে পূর্বদেশের জনপদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বরাহমিহিরের (খ্রি. ছয় শতক) বৃহৎসংহিতাতেও গৌড়ের উল্লেখ লক্ষণীয়। এখানে গৌড়ক, পুন্ড্র, বঙ্গ, সমতট, বর্ধমান এবং তাম্রলিপ্তি নামে ৬টি জনপদের নাম পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনানুযায়ী মুর্শিদাবাদ, বীরভূম এবং পশ্চিম বর্ধমান নিয়ে ছিল প্রাচীন গৌড় রাজ্য। আদি অভিলেখ-র মধ্যে খ্রিস্টীয় ৫৫৪ অব্দে উৎকীর্ণ মৌখরি বংশীয় রাজা ঈশান বর্মণের হরাহ লিপিতে গৌড়বাসীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ লিপি থেকে জানা যায় যে, ঈশাণ বর্মণ সমুদ্র তীরের অধিবাসী গৌড়দের পরাস্ত করেন (গৌড়ান্-সমুদ্রাশ্রয়ান্)। প্রবোধশিবের (খ্রি. এগারো শতক) গুর্গি লিপি থেকেও এ উক্তির সমর্থন মেলে। এতে গৌড়ের রাজাকে সমুদ্রের জলদুর্গে বসবাসকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে (জলনিধি জলদুর্গম গৌড়রাজ ধিশেতে)। উক্ত দুটি প্রমাণ থেকে অন্তত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, কোনো একসময় গৌড়ের অবস্থান উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

মূলত সময় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সাথে সাথে গৌড় নামের অর্থেরও পরিবর্তন হয়। সাত শতকের প্রথম দিকে গৌড়ের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা শশাঙ্কের উত্থান নিশ্চয়ই গৌড়ের রাজ্যসীমার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনিকর্ণসুবর্ণ থেকে উপকূলীয় উড়িষ্যা পর্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন এবং ওই এলাকায় শশাঙ্ক শাসন করতেন। তাই বলা যায় যে, কর্ণসুবর্ণ রাজ্য উপকূলীয় পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উল্লেখ্য, বাণভট্টের হর্ষচরিত-এ গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ককে ‘গৌড়-ভুজঙ্গ’ (ভয়ঙ্কর গৌড় সর্প) বলে তিরস্কার করা হয়েছে। তাই দেখা যায় যে, খ্রিস্টীয় সাত শতকের প্রথমার্ধে গৌড় ও কর্ণসুবর্ণ সমার্থক হয়ে ওঠে। হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণকাহিনী এবং কর্ণসুবর্ণ উপকণ্ঠে অবস্থিত রক্তমৃত্তিকা বিহারের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন সমর্থন করে যে, গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ছিরুটি অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। আর একারণেই মুর্শিদাবাদ গৌড়ের কেন্দ্রবিন্দু বলে পরিগণিত হয়।

এরপর গৌড়ের রাজনৈতিক পরিধি আরও একধাপ বৃদ্ধি পায়; উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ পুন্ড্রবর্ধন পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটে। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পের বর্ণনানুযায়ী পুন্ড্রবর্ধন রাজা শশাঙ্ক কর্তৃক শাসিত হতো। ভাস্কর বর্মণের দুবি তাম্রফলকে বর্ণিত কামরূপের সুস্থিত বর্মণ এবং ভাস্কর বর্মণের সঙ্গে গৌড়ের রাজার সংঘর্ষের কাহিনী উক্ত মতকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে। পক্ষান্তরে ভাস্কর বর্মণের (আনুমানিক খ্রি. সাত শতক) সমসাময়িক শাসক হিসেবে শশাঙ্ককে নির্ধারণ করা হয়। আলোচ্য সংঘর্ষ সম্ভবত উত্তরবঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল। হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, পুন্ড্রবর্ধন ও কামরূপ রাজ্য দুটি পরস্পর সংযুক্ত ছিল। এভাবে শশাঙ্কের শাসনাধীন গৌড় সমুদ্রোপকূলীয় অঞ্চলসহ পশ্চিমবঙ্গের কিয়দংশ এবং অন্তত কিছু সময়ের জন্য উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।

পক্ষান্তরে তৎকালীন বঙ্গের সীমানার বাইরেও গৌড়ের বিস্তৃতি ঘটেছিল। যশোবর্মণের সভাকবি বাকপতি রচিত গৌড়বহো গ্রন্থে গৌড়ের রাজনৈতিক অস্তিত্বের আভাস পাওয়া যায়। বাকপতির পৃষ্ঠপোষক ও কনৌজের শাসক যশোবর্মণের (হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর প্রায় ৭৫ বছর পরে সিংহাসনে আরোহণ করেন) শাসনামলে মগধ (বর্তমান বিহার) গৌড় শাসকের সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

আদি মধ্যযুগে গৌড়ের ভৌগোলিক ধারণার আরও ব্যাপ্তি ঘটে। রাষ্ট্রকূট ও প্রতিহারদের বিভিন্ন সূত্রে পাল নরপতিগণ গৌড়েশ্বর, গৌড়েন্দ্র, গৌড়রাজ প্রভৃতি উপাধিতে আখ্যাত হয়েছেন। এ তথ্য নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টীয় আট এবং নয় শতকে গৌড়ের, যা এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের একাংশ হিসেবে চিহ্নিত ছিল, পরিব্যাপ্তি ঘটে। কখনও কখনও সমগ্র পাল সাম্রাজ্যকেই গৌড়রাজ্য বলা হতো।

কাশ্মীরের বিখ্যাত ইতিহাস, কলহনের রাজতরঙ্গিণীতে প্রথম ‘পঞ্চগৌড়’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ তথ্য আলোচ্য অঞ্চলের পরিসীমার ব্যাপকতাই নির্দেশ করে। বঙ্গ দেশিয় গৌড়, সারস্বত দেশ (পাঞ্জাবের পূর্বভাগ), কান্যকুব্জ, মিথিলা ও উৎকল এ পাঁচটি দেশ একত্রে পঞ্চগৌড় বলে অভিহিত হয়েছে।

এসব তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃতপক্ষে মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে গৌড় জনপদটি পশ্চিম ভাগীরথীর নিকটে গড়ে উঠেছিল। সাত শতকের আদিপর্বে গৌড়ের প্রথম স্বাধীন সম্রাট শশাঙ্কের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গৌড়ের রাজনৈতিক সীমা অর্থাৎ দক্ষিণে উপকূলীয় উড়িষ্যা ও উত্তরে পুন্ড্রবর্ধন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। কখনও কখনও অঞ্চলটি সমগ্র পাল সাম্রাজ্য রূপেও চিহ্নিত হয়েছিল। তেরো শতকে বাংলার মুসলমান সুলতানদের শাসনাধীন সমগ্র অঞ্চলই গৌড় নামে পরিচিত ছিল। একই নামাভিষিক্ত রাজধানী গৌড় মুসলমান যুগের প্রারম্ভে মালদহ জেলার লক্ষ্মণাবতী নামে পরিচিত ছিল; পরবর্তীকালে তা লখনৌতি নামে অভিহিত হয়। [সুচন্দ্রা ঘোষ]

গ্রন্থপঞ্জি DC Sircar, ‘Gauda’, Indian Historical Quarterly, 28, 123-34; Amitabh Bhattacharyya, Historical Geography of Ancient and Early Medieval Bengal, Calcutta, 1977.