গোরাই মসজিদ


গোরাই মসজিদ  কিশোরগজ্ঞ জেলার নিকলি থানার গোরাই নামে একটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। থানা সদর থেকে প্রায় ৬ কিমি দক্ষিণে এবং এগারসিন্ধুর থেকে প্রায় ৩৫ কিমি পূর্ব দিকে এ গ্রামটির অবস্থান। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নদীর তীরে অবস্থিত এ এলাকা খুব নিচু বলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে মাটি ফেলে তৈরি করা একটি উচুঁ ঢিবির উপর। স্থানীয় লোকজন অনেকবারই মসজিদটি সংস্কার করেছে। এসব সংস্কারেরই অংশ হিসেবে মসজিদটির সামনের অংশে স্তম্ভের উপরে নির্মিত সমতল ছাদে ঢাকা একটি বাঁধানো বারান্দা এবং মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি নতুন মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

সম্পূর্ণ ইট দিয়ে নির্মিত এবং বর্গাকার পরিকল্পনাবিশিষ্ট এ মসজিদের চারকোণে রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ব বুরুজ। মসজিদের ছাদের সমান্তরাল বপ্র (Parapet) ছাড়িয়ে বুরুজগুলি উপরে উঠে গেছে এবং এগুলির শীর্ষে রয়েছে কলস নকশার শীর্ষচূড়া শোভিত ছোট গম্বুজে আচ্ছাদিত নিরেট ছত্রী। ইমারতটির পূর্ব দিকের সম্মুখ ভাগে রয়েছে খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ, উত্তর ও দক্ষিণ দিকেও একটি করে প্রবেশপথ রয়েছে। পশ্চিম দেওয়ালের ভেতরের অংশে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবটি দুপার্শ্বস্থ মিহরাবদুটি অপেক্ষা বড় এবং এটিতে একটি অতিরিক্ত খিলান ব্যবহূত হয়েছে। মিহরাবের বাইরের অংশে সংযুক্ত এ বড় আকারের খিলানটি বহুখাঁজবিশিষ্ট। এ মসজিদের চার দেওয়ালেরই মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে দেওয়াল থেকে সামান্য বহির্গত একটি করে প্রক্ষেপণ। পূর্ব দেওয়ালের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ, পশ্চিমের কেন্দ্রীয় মিহরাব এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালের প্রবেশ পথগুলি এ প্রক্ষেপণের মধ্যে অবস্থিত। সবগুলি প্রক্ষেপণেরই দুপ্রান্তে রয়েছে বপ্র ছাড়িয়ে উপরে উঠে যাওয়া সরু মিনার (turret)।

মসজিদের বর্গাকার প্রার্থনাকক্ষের উপর আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহূত একমাত্র গম্বুজটি বর্তমানে পুনর্নির্মিত হয়েছে। অষ্টকোণী পিপার (Drum) উপর স্থাপিত এ গম্বুজের শীর্ষে রয়েছে পদ্ম-কলস নকশা শোভিত শীর্ষচূড়া। ইট দিয়ে নির্মিত অর্ধ অষ্টকোণাকৃতির সংলগ্ন স্তম্ভের উপর থেকে নির্মিত বদ্ধ খিলান ও স্কুইঞ্চ গম্বুজটির ভার বহন করছে। বদ্ধ খিলান ও স্কুইঞ্চ মধ্যবর্তী ত্রিকোণাকৃতির শূন্যস্থানগুলি পূরণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাংলা পেন্ডেন্টিভ দিয়ে।

আদিতে এ মসজিদ পলেস্তারা ও পোড়ামাটির অলঙ্করণে সমৃদ্ধ ছিল। মিহরাব এবং কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপর ধ্বংসোন্মুখ পোড়ামাটির শিল্পে অলঙ্করণের কিছু কিছু চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ব বুরুজগুলি ছাঁচেঢালা ব্যান্ড নকশার সাহায্যে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। এর শীর্ষের ছত্রীগুলির প্রতি বাহুতে রয়েছে চতুর্কেন্দ্রিক বদ্ধ খিলানের নকশা। গম্বুজের পিপা এবং ছাদের অনুভূমিক বপ্রকে ঘিরে রয়েছে বদ্ধ পদ্মপাপড়ি নকশার সারি। চার দেওয়ালের বাইরের অংশে পলেস্তারা দিয়ে তৈরি ছাঁচে ঢালা উল্লম্ব ও অনুভূমিক ব্যান্ড নকশার সাহায্যে ছোট ছোট আয়তাকার ও বর্গাকার খোপ নকশা তৈরি করা হয়েছে। পূর্বদিকের সম্মুখ ভাগে অবস্থিত প্রবেশ পথটির শীর্ষে রয়েছে বিশাল আকারের একটি স্তরীভূত গোলাপ নকশা। এর ডানে-বাঁয়ে পোড়ামাটি দিয়ে তৈরী অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের দুটি গোলাপ নকশা রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ফ্রেমের উল্লম্ব অংশে এখনও অলঙ্কৃত পোড়ামাটির ফলক দেখতে পাওয়া যায়। পার্শ্ববর্তী মিহরাব দুটির শীর্ষে রয়েছে কলস-নকশা, আর এগুলির খিলানের স্প্যান্ড্রিলে রয়েছে স্তরীভূত গোলাপ নকশা। কেন্দ্রীয় মিহরাবের আয়তাকার ফ্রেমটিকে ঘিরে রয়েছে প্যাঁচানো ফুলেল নকশা। বর্তমানে এগুলিতে সাদা ও সবুজ রং করা হয়েছে। সমান্তরালভাবে স্থাপিত পাঁচটি ব্যান্ড নকশা কেন্দী্রয় মিহরাবের কুলুঙ্গিটিকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করেছে। এ ব্যান্ডগুলির মধ্যবর্তী অংশ এখন ফাঁকা, তবে আদিতে নিশ্চয়ই এখানে পোড়ামাটির অলঙ্করণ ছিল।

মসজিদ অভ্যন্তরে বদ্ধ খিলান ও স্কুইঞ্চগুলির উত্থান-বিন্দু (Springing point) এর সমান্তরালে পুরো মসজিদটিকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে একটি ব্যান্ড নকশা। এ ব্যান্ডের নিচে পলেস্তারা দিয়ে ফুলেল নকশা উৎকীর্ণ করা হয়েছে। ভেতরের দিকে গম্বুজের নিম্নাংশকে ঘিরে রয়েছে একটি ছাঁচেঢালা ব্যান্ড নকশা, আর শীর্ষে একটি চক্র নকশার ভেতরে রয়েছে স্তরীভূত গোলাপ নকশা।

এ মুগল মসজিদটি স্থানীয় পোড়ামাটি শিল্পের সঙ্গে মুগল রীতির এক চমৎকার সংশ্লেষণকে তুলে ধরেছে। পোড়ামাটির অলঙ্করণগুলি বাদ দিলে গোরাই মসজিদকে ঢাকার আল্লাকুরী মসজিদ-এর (আনুমানিক ১৬৮০) অনুকৃতি বলে মনে হয়। তাই এ মসজিদটি ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নির্মিত বলে মনে করা যায়।  [এম.এ বারি]