গোপালগঞ্জ যুগলমন্দির


গোপালগঞ্জ যুগলমন্দির  দিনাজপুর জেলা সদর থানার গোপালগঞ্জ গ্রামের যুগলমন্দির দিনাজপুর জেলা সদর থেকে ৬ কিমি উত্তরে পাকা রাস্তার পূর্ব দিকে অবস্থিত। এ যুগলের একটি বারোভুজ বিশিষ্ট পঁচিশরত্ন মন্দির, অপরটি চতুর্ভুজ বিশিষ্ট পঞ্চরত্ন মন্দির।

গোপালগঞ্জ যুগলমন্দির

মন্দির দুটির সঠিক সময়কাল নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। ডেভিড জে. ম্যাককাচ্চান তাঁর গ্রন্থে, একটির নির্মাণকাল ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে এবং অন্যটির ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো উৎসের উল্লেখ করেন নি। মন্দির দুটির সময় নির্দেশক একটি শিলালিপি দিনাজপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। লিপিটি কোন মন্দিরে স্থাপিত ছিল, তা জানা যায় না। লিপির মাধ্যমে এটুকু জানা যায় যে, রাজা রামনাথ (১৭২২-১৭৬৩ খ্রি.) ১৬৭৬ শকাব্দে, (১৭৫৪ খ্রি.) একটি মন্দির নির্মাণ করেন। এ লিপিতে উল্লিখিত মন্দির, আলোচ্য মন্দিরের মধ্যে কোনোটি, তা জানা না গেলেও উভয় মন্দিরই যে কান্তজীউ মন্দিরের (১৭২২-১৭৫২ খ্রি.) সমসাময়িক ছিল তা এ লিপি থেকে প্রতীয়মান হয়।

প্রায় ০.৯১ মিটার উঁচু বারোভুজ বিশিষ্ট ভিত্তিবেদীর উপর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। মূল মন্দিরটিও বারোভুজ বিশিষ্ট। প্রথম স্তরের প্রতিবাহু ৪.০৪ মিটার প্রশস্ত ছিল। মন্দিরের ভেতরে ঢোকার জন্য প্রতিদিকে একটি করে মোট বারোটি বহু ভাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। মন্দিরের বহির্ভাগ টেরাকোটা দিয়ে অলংকৃত ছিল। টেরাকোটাগুলি আর দেখা যায় না।  মন্দিরটির ভেতরে রয়েছে ১.৮৩ মিটার প্রস্থ প্রদক্ষিণ পথ। এরপর মূলগর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে দুটি এবং পশ্চিম দিকে একটি খিলানপথ রয়েছে।

মন্দিরটি ক্রমহ্রাসমান তিনটি স্তরবিশিষ্ট। প্রথম স্তরের ছাদের প্রতিকোণে একটি করে বারোটি চূড়া ছিল। সর্বোচ্চ স্তরের উপরে কেন্দ্রীয় শিখরটি অবস্থিত। দ্বিতীয় স্তরের অনুরূপ প্রতিকোণে একটি করে বারোটি চূড়া রয়েছে। শিখরগুলি ছিল ফ্লুটেট (fluted) এবং টেরাকোটা দিয়ে অলংকৃত। প্রতিটি শিখর ছিল অষ্টকোণী ও প্যারাপেটগুলি বাঁকানো।

দ্বিতীয় মন্দিরটি প্রথম মন্দির থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে অবস্থিত। এ মন্দির বর্গাকৃতি। এর প্রতিবাহুর দৈর্ঘ্য ১২.৫০ মিটার। মন্দিরটি আনুমানিক ০.৯১ মিটার উঁচু ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনটি স্তরে এ মন্দির গঠিত। প্রথম স্তরের প্রতিদিকে তিনটি করে খিলান পথ রয়েছে। এরপর  রয়েছে ১.৪৫ মিটার প্রশস্ত একটি বারান্দা এবং বর্গাকার একটি অংশ, এর প্রতিবাহুর দৈর্ঘ্য ৭.৬২ মিটার। এর প্রতিদিকেও আবার তিনটি করে খিলানযুক্ত পথ রয়েছে। গর্ভগৃহের পূর্ব উত্তর দিকের সিঁড়ি পথ দিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে যাওয়া যায়। প্রথম স্তরের অনুরূপ দ্বিতীয় স্তরটি। দ্বিতীয় স্তরের পরেই  রয়েছে ০.৭৫ মিটার বর্গাকার মূলগর্ভগৃহ। গর্ভগৃহ ছাড়া মন্দিরের বাইরের অংশ সুন্দরভাবে প্যানেল করা এবং টেরাকোটা শোভিত ছিল। মন্দিরের শিখরগুলি সাজানো ছিল নিম্নরূপে প্রথম স্তরের বর্গের প্রতিবাহুতে একটি করে মোট চারটি শিখর এবং মন্দিরের সর্বোচ্চে একটি চূড়া অবস্থিত।

মন্দিরযুগল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ এবং এর খুব কম অংশই অক্ষত রয়েছে। মন্দিরের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতি, এর নির্মাণে ব্যবহূত হয়েছে মন্দিরের ইট। [সানিয়া সিতারা]

গ্রন্থপঞ্জি  David J Mccutchion, Late Mediaeval Temples of Bengal, Calcutta , 1972; আ.ক.ম যাকারিয়া, দিনাজপুর মিউজিয়াম, দিনাজপুর, নভেম্বর ১৯৮৯।