গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ


গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (১৩৮৯-১৪১০/৭৯২-৮১৩ হিজরি)  বাংলার প্রথম ইলিয়াস শাহী বংশের তৃতীয় সুলতান। রাজ্যের বিস্তৃতির চেয়ে তিনি রাজ্যকে সুদৃঢ় করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। তিনি তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকে শুধু কামরূপএ অভিযান করে তা দখল করেন এবং কামরূপের উপর কয়েক বছর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। আসাম বুরুঞ্জীতে উল্লেখ আছে যে, তিনি কামতা রাজার রাজ্য আক্রমণ করেন। কিন্তু তা অবান্তর বলেই মনে হয়।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ তাঁর আদর্শ চরিত্র, শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা এবং সুশাসনের জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। আইনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল।

সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ নিজে বিদ্বান ও কবি ছিলেন। তিনি বিদ্বান লোকদের খুব সমাদর করতেন। মাঝে মাঝে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। একবার তিনি হাফিজের নিকট কবিতার একটি চরণ লিখে পাঠান এবং কবিতাটিকে পূর্ণ করার জন্য কবিকে অনুরোধ জানান। তিনি তাঁকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণও জানান। হাফিজ দ্বিতীয় চরণটি রচনা করে কবিতাটি পূর্ণ করে পাঠান। তিনি সুলতানের নিকট একটি গজলও লিখে পাঠান। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ বাংলা সাহিত্যের উন্নতির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ মুহম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘ইউসুফ জোলেখা’ রচনা করেন। সম্ভবত সুলতান কৃত্তিবাসকেও বাংলায় রামায়ণ লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ তাঁর পিতা (সুলতান সিকান্দার শাহ) ও পিতামহের (সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ) মতোই আলেম ও সুফিদের অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বিদ্বান ও ধার্মিকদের উদার পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে শেখ আলাউল হকনূর কুতুব আলম খুবই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি বিহারের শেখ মুজাফফর শামস বলখীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। মুজাফফর শামস বলখীর সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তিনি পবিত্র মক্কা ও মদীনার তীর্থযাত্রীদের সব ধরনের সাহায্য দিতেন। তিনি একাধিকবার মক্কা ও মদীনা শহরের অধিবাসীদের জন্য প্রচুর উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের জন্য মক্কার উম্মে হানির ফটকে একটি এবং মদীনার ’বাব আল-সালামে’র (শান্তির দ্বার) নিকটে অপর একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করান। এ প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য তিনি প্রয়োজনীয় অর্থও প্রদান করেন। এ দুটি মাদ্রাসা ’গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত। তিনি আরাফা নদীর সংস্কারের জন্য ত্রিশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা (মিছকাল) প্রেরণ করেন।

বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য গিয়াসউদ্দীন বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পারস্যের কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ পত্রালাপ ছিল এবং তিনি বেশ কয়েকবার মক্কা ও মদীনায় দূত পাঠিয়েছিলেন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ জৌনপুরের সুলতান খাজা জাহানের নিকট দূত প্রেরণ করেন এবং উপঢৌকন স্বরূপ তাঁকে কয়েকটি হাতিও পাঠান। তিনি সমসাময়িক চীন সম্রাট ইয়ংলোর সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে চীনে দূত পাঠিয়েছিলেন। চীন সম্রাট দূতদেরকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান এবং প্রতিদানে তিনিও বাংলার সুলতানের নিকট দূত ও উপঢৌকন প্রেরণ করেন।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, তাঁর সময় হিন্দুরা তাঁর দরবারে বেশ প্রাধান্য লাভ করে ছিল। এর ফলে ভাতুরিয়ার (দিনাজপুর জেলায়) জমিদার রাজা গণেশের উত্থান ঘটে। ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে (৮১৩ হিজরি) গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ এর মৃত্যু হয়। রাজা গণেশ সুলতানকে হত্যা করেন বলে ধারনা করা হয়। [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]