গালা


গালা (Shellac)  অ্যালকোহল অথবা অ্যাসিটোন দ্রাবকে লাক্ষার দ্রবণকে গালা বলা হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক জগতে দ্রবণটিকে গালা না বলে বরং তার  রজন সদৃশ বা আঠালো কঠিন (লাক্ষা) অবস্থাকেই গালা নামে আখ্যায়িত করা হয়। লাক্ষা হচ্ছে স্ত্রী  লাক্ষাকীট (Laccifer lacca)-এর দেহ থেকে নির্গত রজন জাতীয় একপ্রকার উপাদান। লাক্ষাকীট ডুমুর, অশ্বত্থ, কুল, পলাশ, কুসুম প্রভৃতি কতিপয় ক্রান্তীয় বৃক্ষের ডালপালায় আশ্রয় গ্রহণ করে এবং বৃক্ষের রস পান করে থাকে। লাক্ষা আহরণের উদ্দেশ্যে এসকল গাছে লাক্ষাকীটের চাষ করা হয়ে থাকে। স্ত্রী লাক্ষার দেহনিঃসৃত রস বায়ুর সংস্পর্শে এসে দেহের চারপাশে একটি সুরক্ষিত ও শক্ত আবরণ তৈরি করে যা পরবর্তীতে ডালপালায় বেষ্টিত হয়ে থাকে। এ আবরণটি সংগ্রহ করার জন্য ডালপালাগুলি ছোট ছোট টুকরো করে ফেলা হয়। এ টুকরোগুলির মধ্যে লাক্ষাকীটের দেহাবশেষ ও অন্যান্য অপদ্রব্য মিশ্রিত থাকে যাকে আঠালো লাক্ষা বলা হয়। এ আঠালো লাক্ষাকে চূর্ণ করে কাঠের ছোট টুকরো ও অন্যান্য অবাঞ্ছিত পদার্থসমূহ অপসারণ করে কীটপতঙ্গের দেহাবশেষসহ দ্রবীভূত করা হলে গাড় লাল রঙের পদার্থ উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন পদার্থকে শুকানো হলে তাকে বীজ লাক্ষা বলা হয়। বীজ লাক্ষাকে গলিত ও পরিস্রুত করে পাতলা পাতের ন্যায় বিছিয়ে দেওয়া হয় যাকে ঠান্ডা অবস্থায় ছোট ছোট টুকরোতে পরিণত করলে সেগুলিকেই গালা বলা হয়। এ ছোট ছোট টুকরোগুলিকে অ্যালকোহলে দ্রবীভূত করলে গালাদ্রবণ প্রস্ত্তত হয়। গালা বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে- গাঢ় পীতাভ থেকে প্রায় কালো পর্যন্ত। তবে সর্বাধিক শোভনীয় হচ্ছে কমলা রঙের গালা যা সবচেয়ে মূল্যবান। গালাকে ব্লীচ করা হলে তা সাদা রঙের গালায় পরিণত হয়। ব্লীচ করা গালা সুদৃশ্য বর্ণ ধারণ করে এবং  অলঙ্কার তৈরির জন্য এ গালাকে হলুদ রঙ করা হয়।  কাঠ, প্লাস্টার প্রভৃতির উপর গালা দ্রবণ প্রয়োগের পর বায়ুর সংস্পর্শে দ্রাবক শুকিয়ে গেলে এক ধরনের শক্ত আবরণ তৈরি হয়। স্পিরিট বার্নিশ, দামি দামি চিত্রকলা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্ত সংরক্ষণে আবরক ও পলেস্তারার ছাঁচ হিসেবে,  চামড়া শিল্প কারখানায় পণ্যকে কঠিন ও দৃঢ় করতে, সীলগালা প্রস্ত্তত ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী তৈরি প্রভৃতি কাজে গালা ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়।  গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরির জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। এ ছাড়া গালা দিয়ে কৃত্রিম ফুল, ফল ও বিভিন্ন ধরনের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করা হয়। ভারত বিশ্বের প্রধান লাক্ষা ও গালা উৎপাদনকারী দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ যেমন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি গালা উৎপাদন করে থাকে। বাংলাদেশের  নবাবগঞ্জ জেলার (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) স্থানীয় জনগণের কাছে লাক্ষা উৎপাদন একটি নিয়মিত পেশা। তবে এখানে মূলত আঠালো লাক্ষা উৎপাদিত হয়। রাজশাহী নগরীর তালাইমারী এলাকায় চাপাই নবাবগঞ্জে উৎপাদিত আঠালো লাক্ষা থেকে গালা প্রস্ত্ততের বেশ কিছু  কুটির শিল্প রয়েছে।  [মোঃ মাহবুব মোর্শেদ]

আরও দেখুন লাক্ষা; লাক্ষাকীট