গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ


গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ  মেয়েদের একটি পেশাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৬১ সালে আমেরিকার ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহামা স্টেট ইউনিভার্সিটির সহায়তায় ঢাকায় গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ স্থাপিত হয়। প্রথমে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও পরবর্তীকালে জীব বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে একটি উপাদানকল্প কলেজ হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। এই কলেজের একাডেমিক দিক তত্ত্বাবধান করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্থিক বিষয়াদি সমন্বয় করার দায়িত্ব ছিল পূর্ব পাকিস্তান সরকারের। গ্রাজুয়েশন কোর্সের সিলেবাস ও নির্দেশিকা তৈরি করা হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, লাহোর হোম ইকনমিক্স কলেজ এবং করাচি হোম ইকনমিক্স কলেজের কোর্সসমূহের অনুসরণে। ওকলাহামা স্টেট ইউনিভার্সিটির হোম ইকনমিক্স ডিপার্টমেন্টের ডীন ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হিসেবে কলেজটির একাডেমিক নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করতেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ দায়িত্ব পালন করছে।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক এবং ১৯৬৩ সাল থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাশাপাশি স্নাতক সম্মান (গার্হস্থ্য অর্থনীতি) কোর্স চালু হয়। বিষয়বস্ত্তর মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি, যুগের চাহিদা পূরণ এবং বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে সমন্বিত গার্হস্থ্য অর্থনীতি থেকে ৫টি বিভাগে ৫টি সম্মান কোর্স চালু করা হয়। বিভাগগুলি হলো খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান, গৃহব্যবস্থাপনা ও গৃহায়ণ, শিশুবিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক, ব্যবহারিক শিল্পকলা এবং বস্ত্র পরিচ্ছদ ও বয়ন শিল্প। ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান কোর্সে অনুরূপ ৪ বছর মেয়াদি স্নাতক সম্মান কোর্স এবং ১ বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা হয়। সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসরণ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও মেধা তালিকার ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়। উপরোক্ত ৫টি বিষয়েই শিক্ষার্থীকে তত্ত্বীয়, ব্যবহারিক ও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয় এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে  পরিবার, সমাজ ও পেশার জন্য প্রস্ত্তত করা হয়। গার্হস্থ্য অর্থনীতির ৫টি বিষয়ের শিক্ষা পাঁচ ধরনের পেশার দ্বার উন্মোচন করে।

খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীরা কমিউনিটি নিউট্রিশন, থেরাপিউটিক নিউট্রিশন, পাবলিক হেলথ এন্ড নিউট্রিশন, ডায়াটেটিকস, উচ্চতর পুষ্টি বিজ্ঞান, গবেষণা, খাদ্য বিজ্ঞান, খাদ্য রসায়ন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে বিভিন্ন পুষ্টি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান/ হাসপাতালে পুষ্টিবিদ ও পথ্যবিদের পেশা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, কমিউনিটি পর্যায়ে ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদ ও পথ্যবিদ হিসাবে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, গবেষণা, পুষ্টি পরামর্শ, মেনু প্ল্যানিং ও ক্যাটারিং ম্যানেজমেন্টভিত্তিক পেশায় প্রবেশ করতে পারে।

গৃহব্যবস্থাপনা ও গৃহায়ণ বিভাগের পাঠ্যক্রম একজন ছাত্রীকে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে সফলতা দেয়। এই পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান,  এনজিও, ব্যবসায় প্রশাসন ও পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইন ইনস্টিটিউট-এ কাজ করার সুযোগ পায়।

শিশুবিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের একজন ছাত্রী শিশুর সকল চাহিদা বুঝে শিশুকে সেরা সম্পদে তৈরি করার শিক্ষা পায়। শিক্ষার্থী শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং শিশু অধিকার রক্ষাসহ শিশুদের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সকল প্রতিষ্ঠানে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করে। এছাড়া শিশু কাউন্সেলিং, নীতি নির্ধারণ, ইসিডি কার্যক্রম, শিশুর সামাজিক সমস্যা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করার সুযোগ পায়।

ব্যবহারিক শিল্পকলা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি হলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প, নকশা, বুনন, প্রিন্টিং, মৃৎশিল্প, পাট শিল্প ইত্যাদি। শিক্ষার্থী এই সকল বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করে সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা সংস্থা, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প ও তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং নক্শা সেন্টারে কাজ করার সুযোগ পায়। বস্ত্র পরিচ্ছদ ও বয়ন শিল্প বিভাগের বস্ত্র ও পোশাক শিল্প বিষয় একটি কর্মমুখী শিক্ষা যা শিক্ষার্থীর আত্মকর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

বিশেষায়িত কলেজ হওয়ায় ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক ছাত্রী এই কলেজে অধ্যয়নে আগ্রহী থাকে। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ছাত্রী এখানে অধ্যয়ন করছে। প্রায় ৬০ জন শিক্ষক এখানে কর্মরত আছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি এ কলেজের ছাত্রীরা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, খেলাধুলা, গার্ল ইন রোভার ও বিএনসিসি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।  [লায়লা আরজুমান্দ বানু]