গলগন্ড


গলগন্ড (Goiter)  খাদ্য ও খাবার পানিতে আয়োডিনের অভাব, সংক্রমণজনিত প্রদাহ, টিউমার, অথবা গলগ্রন্থির কম কার্যকারিতার কারণে গলগ্রন্থির (thyroid) অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ফুলে ওঠা গলগ্রন্থি গলার সামনে সহজদৃষ্ট হয়ে ওঠে। বেশির ভাগ গলগন্ড গলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলি বুকের উপর দিকে বা কদাচিৎ অন্তর্বক্ষীয়ও হতে পারে।

বৃহদাকার গলগন্ড

গলগন্ড কয়েক রকমের: মৃদু, গন্ডিল (nodular), গ্রন্থিল (adenomatous) এবং ব্যাপ্ত-কলাবৃদ্ধিজনিত (diffusely hyperplastic)। রোগের তীব্র (acute) অবস্থায় গলগন্ড দ্রুত বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে গ্রন্থিল ধরনের গলগন্ড গড়ে ওঠে আবৃত গ্রন্থিঅর্বুদ (adenoma) বৃদ্ধির ফলে। গ্রন্থিল ধরনের গলগন্ডে থাকে গোলাকৃতি পিন্ড, অন্য দিকে ব্যাপ্ত গলগন্ডে থাকে গলগ্রন্থির ছড়ানো কলা। একটি বা একাধিক থলি থাকলে গলগন্ড থলিযুক্ত হতে পারে এবং সম্ভবত কোষকলার অবক্ষয়ের জন্যই তা ঘটে। মানুষের একটি স্বাভাবিক গলগ্রন্থির ওজন মাত্র ২০-৩০ গ্রাম, কিন্তু একটি বৃহদাকার গলগন্ড প্রায় ১ কেজিও হতে পারে।

বিশ্বের যেসব অঞ্চলে খাদ্যে আয়োডিনের পরিমাণ কম এবং পানিতে আয়োডিনের কিছুটা বা অত্যধিক ঘাটতি সেসব ভৌগোলিক এলাকার জনগণের অপেক্ষাকৃত বৃহৎ অংশের মধ্যে স্থানীয় গলগন্ড বেশি হয়ে থাকে। যেখানে গলগন্ড কোনো আঞ্চলিক রোগ নয় সেখানে গ্রন্থিল গলগন্ড বিক্ষিপ্তভাবে হয়। খাদ্যে আয়োডিনের ঘাটতি ছাড়াও আরও কয়েকটি কারণ গলগ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সূচনা ঘটতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বংশানুসৃত থাইরয়েড হরমোনের জৈব সংশ্লেষণের ত্রুটির দরুনও গলগন্ড হয়ে থাকে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো রকমের গলগন্ড আছে, কিন্তু ভারত উপমহাদেশে, বিশেষত হিমালয় সংলগ্ন দেশগুলিতে এ রোগের প্রার্দুভাব অত্যধিক। প্রাচীন ভারত, মিশর ও চীনের শিল্প-সাহিত্যে গলগন্ডের উল্লেখ আছে। তৎকালে গলগন্ড চিকিৎসায় সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল ব্যবহূত হতো। আয়োডিনের ঘাটতির জন্য চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১০ কোটি লোক গলগন্ডে ভুগছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা, বিশেষত রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও দিনাজপুর গলগন্ডপ্রবণ এলাকা হিসেবে গণ্য। ১৯৮১-৮২ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দেশে আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগের পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিচালিত এক জরিপে জানা যায় যে, দেশে তিন কোটির বেশি লোক মৃদু গলগন্ড এবং অন্যান্য আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগে ভোগছে। দৃশ্যমান গলগন্ডে আক্রান্ত প্রায় ১১% লোকের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার বাসিন্দাদের প্রায় ৩০ শতাংশের গলগন্ড আছে। চট্টগ্রাম, খুলনা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলেও সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় গলগন্ড আয়োডিন প্রয়োগে ক্রমাগত ছোট হয়। তবে কোনো কোনো গলগন্ডে থাইরয়েড গ্রন্থির নির্যাস প্রয়োগে সুফল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে গলগন্ড ও আয়োডিনঘটিত অন্যান্য অসুস্থতা প্রশমনের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় ৯টি জেলার প্রায় ৯৫,০০০ লোককে লেপিওডল ইনজেকশন দেওয়া হয়। একইভাবে ১৯৮৩ সালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ইউনিসেফের সহযোগিতায় রংপুর জেলার জলঢাকা উপজেলায় ৮০,০০০ লোককে ইনজেকশন দেয়। ১৯৮৫ সালে খাবার লবণে আয়োডিন মিশ্রণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বর্তমানে আয়োডিন মিশ্রিত লবণ বাজারজাত করা বাধ্যতামূলক এবং প্রায় দু’ডজন উদ্যোক্তা এ ধরনের খাবার লবণ তৈরি করছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলের খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট এ পণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে এবং এ কর্মসূচির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে থাকে।  [এস.এম হুমায়ুন কবির]