গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী


গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী (১৮৮৯-১৯৪৫)  ব্রাহ্মসমাজবাদী, শিক্ষাব্রতী, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী। ১৮৮৯ সালের ২৫ জানুয়ারি কলকাতায় তাঁর জন্ম। পিতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন খ্যাতনামা জাতীয়তাবাদী, সাংবাদিক, সমাজ সংস্কারক এবং ব্রাহ্মসমাজের নেতা। মা কাদম্বিনী দেবী ছিলেন  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রথম বাঙালি মহিলা স্নাতক। জ্যোতির্ময়ী কুমারী জীবন অতিবাহিত করেন।

কলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল এবং বেথুন কলেজে জ্যোতির্ময়ী শিক্ষালাভ করেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ পাস করে তিনি বেথুন কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর তিনি কটক র‌্যাভেনশ কলেজে যোগ দেন এবং তারপর সিংহল উইমেনস কলেজে যোগ দিয়ে অধ্যক্ষ পদে উন্নীত হন। ক্রমান্বয়ে তিনি জলন্ধর কন্যা মহাবিদ্যালয় (১৯২০), ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল (১৯২৫), বিদ্যাসাগর বাণীভবন (১৯২৬) এবং বুদ্ধিস্ট কলেজ, সিংহল (১৯২৯)-এর অধ্যক্ষ হন। জ্যোতির্ময়ী ছিলেন শিক্ষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। আমৃত্যু তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

জ্যোতির্ময়ী অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০-২১) যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসে তিনিই প্রথম মহিলা স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী গঠন করেন এবং পরবর্তীতে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল কংগ্রেস কমিটির সদস্যা হন। এরপর তিনি সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দেন এবং মহিলা সত্যাগ্রহী কমিটির সহসভানেত্রী নির্বাচিত হন। মহিলা সত্যাগ্রহীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ১৯৩০ ও ১৯৩২ সালে দুবার কারারুদ্ধ হন। ১৯৩৩ সালে তিনি ক্যালকাটা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে ভারতছাড় আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে তিনি আবার গ্রেফতার হন।

জ্যোতির্ময়ী  বর্ণপ্রথা ও অস্পৃশ্যতা জাতীয় সামাজিক কুসংস্কারের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি নারীমুক্তি, বিধবাবিবাহ এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রবল সমর্থক ছিলেন। তিনি নারীকল্যাণ সংগঠন হিরণ্ময়ী বিদ্যা শিল্পাশ্রম, পুরী বসন্তকুমারী বিদ্যাশ্রম, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সমাজসেবার উদ্দেশ্যে ১৯২৬ সালে তিনি একটি ছাত্র সংস্থা গঠন করেন। তিনি আধুনিক ধারায় শিল্পায়িত নব্যভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তিনি ‘আর্যস্থান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী’ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। তাঁর দেশাত্মবোধ তাঁকে ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে উৎসাহিত করেছিল। তিনি লেখালেখি, বক্তৃতা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাঙালি মহিলাদের চিন্তাধারায় জাতীয় চেতনার উন্মেষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শিক্ষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ চিন্তা-ভাবনা মডার্ণ রিভিউ ও প্রবাসীর  মতো পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর রচনাবলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৪৫ সালের ২২ নভেম্বর একটি শোক মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তাঁর করুণ মৃত্যু হয়।  [সমবারু চন্দ্র মহন্ত]