খেদা


খেদা (Kheda)  বন্যহাতি ধরার লক্ষ্যে নির্মিত ঘের। সম্ভবত আফ্রিকার হাতি প্রজাতিকেই প্রথম পোষ মানানো হয়। সংস্কৃত রচনায় ভূসংস্থানের নিরিখে হাতি ধরার পাঁচটি পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে: খোঁয়াড় বা খুঁটি/গোঁজ দিয়ে তৈরী খেদায়; স্ত্রী হাতিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার; প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতির পিঠে বসে ফাঁস ছোঁড়া; মাটির নিচে গোপন ফাঁদ পাতা; এবং গর্তে ফেলা। প্রাচীনকালের লেখকগণ সর্বপ্রথম খেদা পদ্ধতি বর্ণনা করলেও এটি আসলে আর্যদের উদ্ভাবন। জানা যায়, গোটা এশিয়ায় গত শতকে লক্ষাধিক হাতি ধরা হয়েছে। সম্ভবত সামরিক কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যেই মূলত হাতি পোষা হতো। প্রতিরোধী অস্ত্র হিসেবে হাতির ব্যবহার অবশ্যই সুবিধাজনক ছিল। পুরাকালে যুদ্ধে প্রথম হাতি ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত হলো খ্রিস্টপূর্ব ৩০১ অব্দে ইপসাসের যুদ্ধ। বর্তমানে হাতি অধ্যুষিত ১১ দেশে প্রায় ১৬,০০০ পোষা এশীয় হাতি আছে; সর্বাধিক মায়ানমারে, প্রায় ৬,৫০০ (বুনোহাতির সংখ্যা ৫,০০০), তারপর থাইল্যান্ডে প্রায় ৪,০০০ (বুনোহাতি প্রায় ১৫০০) ও ভারতে প্রায় ৩,০০০ (বুনোহাতি প্রায় ২৬,০০০)। এ সংখ্যা বর্তমানের বন্যহাতির (মোট সংখ্যা ৪৩,০০০) ৪০%।

মাত্র ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে, এমনকি ঢাকার অদূরে মধুপুরেও প্রচুর বুনো হাতি ছিল। ঢাকার একটি সড়কের নাম এলিফ্যান্ট রোড। পিলখানা থেকে হাতি আনার জন্য সড়কটি ব্যবহূত হতো। ঢাকার আজিমপুরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পিলখানা অর্থাৎ রাজকীয় হাতিশাল নামের জনপদটিতে সাবেক বাংলার বিভিন্ন অংশ থেকে সংগৃহীত হাতিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের নানা স্থানে কাজ করানোর জন্য পাঠানো হতো। মুগল আমলে জমিদাররাও প্রদেয় অর্থের বিনিময়ে পিলখানায় ব্যক্তিগত হাতি রাখতেন। এমনকি উনিশ শতকের শেষদিকেও এখানে হাতি ধরার কৌশল প্রদর্শিত হতো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বন্দুক, খাদ্য ও অন্যান্য সম্ভার বহনের জন্য হাতির প্রয়োজন হতো। তারা ১৯০০ সালে নিয়মিত হাতি ধরার সংস্থাটি ঢাকা থেকে মায়ানমারে স্তানান্তরিত করে, কেননা অধিক হাতি ধরার ফলে গারো পাহাড়ে হাতির পাল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার মাহুতটুলি জনপদে পিলখানার হাতির মাহুতরা থাকত। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক বছর আগে এ এলাকা থেকে সবগুলি হাতি সরিয়ে নেয়া হয়।

১৯১৫-১৬ সালে বন বিভাগ খেদায় হাতি ধরার পদ্ধতি শুরু করে। বাংলাদেশে উনিশ ও বিশ শতকে পোষার জন্য বিপুল সংখ্যক হাতি ধরা হয়।

যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত খেদায় প্রতিটি হাতি ধরা বাবদ প্রদেয় অর্থ উল্লেখ করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সিলবদ্ধ খামে দরপত্র আহবান করত। খেদায় হাতি ধরার জন্য হাতি পিছু অর্থের পরিমাণ ৭৫০ টাকা পর্যন্ত উঠত (চট্টগ্রাম জেলা গেজেটিয়ার ১৯৬৭)। সাধারণত শীত মৌসুমে বনাঞ্চল অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকাকালে খেদায় হাতি ধরার আয়োজন হতো।

সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের পর ঠিকাদার ১০০-১৫০ জন দক্ষ ও সাধারণ শ্রমিকের দল নিয়ে আসত আর দলে থাকত খেদায় হাতি ধরায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ৪০-৫০ জন দক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিকরা সাধারণ শ্রমিকদের খেদা নির্মাণে নির্দেশ দিত ও কাজ তদারক করত। স্থান নির্বাচনের ওপর খেদার সাফল্য নির্ভর করত। অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকের ৮-১০ জনের একটি দল স্থান নির্বাচন করত। সাধারণত হাতিরা পাল বেঁধে তাদের খাবার অর্থাৎ নানা ধরনের ঘাস, বাঁশের পাতা ও ডালপালা খোঁজে। হাতির দুই বা ততোধিক চলার পথ একত্রে মিশে শেষাবধি একটি বড় পথে পরিণত হলে তা খেদা নির্মাণের সর্বোত্তম স্থান বিবেচিত হতো। সে সময় খেদার নির্মাণস্থলের কাছাকাছি চারণরত হাতির পালের ওপর নজরদারির জন্য একটি দল নিয়োগ করা হতো যাতে নির্মীয়মাণ খেদা শেষ হওয়ার আগে হাতিগুলি খুব দূরে সরে যেতে না পারে। বাংলাদেশে ১৯৬৫ সাল থেকে খেদায় হাতি ধরা বন্ধ রয়েছে।

উনিশ ও বিশ শতকে পোষ মানানোর জন্য ধরা ও গুলি করে মারা হাতির সংখ্যা বর্তমানের বুনো হাতির মোট সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। প্রামাণ্য দলিলসূত্রে জানা যায় যে, ১৮৬৮-১৯৮৫ সালের মধ্যে সর্বমোট ধৃত হাতির সংখ্যা ছিল ১৫৩৪ (সারণি)।

সারণি উনিশ ও বিশ শতকে বাংলাদেশে ধৃত হাতির আংশিক পরিসংখ্যান।

স্থান ধৃত হাতির সংখ্যা ধরার সময়কাল
ঢাকার পাহাড় (মধুপুর) ৪১৩ ১৮৬৮-৭৬
চট্টগ্রাম ৮৫ ১৮৭৫-৭৬
ঢাকার পাহাড় ৫০৩ ১৮৭৬-৮০
জয়াল্লা (চুনতি, চট্টগ্রাম) ৩৬ ১৯৩৮
সিলেট  ০৩ ১৯৪৭-৬২
চট্টগ্রাম ১৫১ ১৯৪৭-৬২
পার্বত্য চট্টগ্রাম ৩২০ ১৯৪৭-৬২
উখিয়া (কক্সবাজার) ১০ ১৯৬৫
রামগড় (চট্টগ্রাম) ০২  ১৯৮৪
মাটিরাঙ্গা (খাগড়াছড়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম) ০৩ ১৯৮৫
কাপ্তাই (পার্বত্য চট্টগ্রাম) ০৩ ১৯৮৫
রামগড় (পার্বত্য চট্টগ্রাম) ০৩ ১৯৮৫
ইদগাঁও (কক্সবাজার) ০১ ১৯৮৫
কাপ্তাই (পার্বত্য চট্টগ্রাম) ০১ ১৯৮৫
মোট = ১৫৩৪

আঠারো শতকের গোড়ার দিকে রংপুরের পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম বিভাগগুলিতে অসংখ্য হাতি ছিল এবং শস্যক্ষেতে নিয়মিত হামলা করত। বর্ষার মাসগুলিতে শালবন ছিল হাতিদের প্রধান আস্তানা এবং শুষ্ক মৌসুমে ঢুকত নলখাগড়ার ঘন বনে। হাতি তাদেরই পায়ের ভারে তৈরি একটি নির্দিষ্ট পথে চলে। মাড়ানো পথটি দ্রুত মসৃণ হয়ে ওঠে। কিছু ভূমি মালিক বুনো হাতি ধরায় টোপ হিসেবে স্ত্রী হাতি পুষতো। স্ত্রী হাতির শ্রোণীচক্রে জড়িয়ে ও পিঠের উপর গুটিয়ে একটি লম্বা রশি রাখা হতো আর রশির শেষপ্রান্তে থাকত আলগা গেরো একটি ফাঁস। মাহুত বুনো হাতির গলায় ফাঁস ছুঁড়ে দিলেই তার হাতিটি চলতে শুরু করত আর ফাঁসটি বুনো হাতির গলায় আটকে যেত। ফাঁসবদ্ধ হাতি প্রায় শ্বাসরুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁস টানা চলত। গ্রামবাসীরা অতঃপর হাতির পায়ে রশি বাঁধত এবং কিছুটা পোষ না মানা পর্যন্ত গাছের মোটা গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখত। এ পদ্ধতিতে ধরা হাতি আকারে ছোট এবং সাধারণত ২ মিটারের বেশি উঁচু হতো না। খেদায় ধরা হাতির তুলনায় শেষোক্তভাবে ধরা হাতির বেশির ভাগই মারা পড়ত। মাঝে মধ্যে চোরা গর্তে ফেলেও হাতি ধরা হতো।

বাংলাদেশের অনেক জমিদারের নিজস্ব হাতি ছিল। অতীতে কোনো কোনো জমিদার প্রতি বছর অনেকগুলি হাতি ধরে ভূমিকর হিসেবে সেগুলি সরকারকে দিতেন। কালেক্টরেরা হাতিগুলি বিক্রি করতেন এবং হাতির দাম মাঝে মধ্যে গড়ে ৫ পাউন্ডে নেমে আসত। অবশ্য প্রথাটি টিকে নি এবং তখন টাকার মাধ্যমেই খাজনা আদায় হতো। কেউ কেউ কোম্পানিকে উপহার হিসেবে হাতি দিতেন।  [মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম]