খুলনা জিলা স্কুল


খুলনা জিলা স্কুল  এ বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অস্পষ্ট। কারও মতে ১৮৫৬ সালে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে হিসেবে এটি খুলনা শহরে প্রতিষ্ঠিত  প্রথম স্কুল। আবার কারও মতে- এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৩ সালে। এ হিসেবে খুলনা জিলা স্কুল শহরের প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় স্কুল এবং প্রথমটি হলো খুলনার দৌলতপুরস্থ মুহ্সিন হাই স্কুল (১৮৬৭ ইং)। প্রতিষ্ঠাকালে এর নাম ছিল খুলনা হাইস্কুল। বাবু সাতুরাম মজুমদার তার নিজ অর্থ দিয়ে স্কুলের প্রথম পাকা ভবন তৈরি করেন। সেই সময় খ্যাতিমান শিক্ষক সারদা চরণ মিত্র ছিলেন প্রধান শিক্ষক।

১৮৮৩ সালের হান্টার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাসে ইংরেজ সরকার এ বিদ্যাপীঠের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। তখন প্রতিষ্ঠিত একটি লাল ভবনে ‘খুলনা জিলা স্কুল’ নামে এর নতুন পরিচয় হয়। ভবনটি সাতুরাম মজুমদারের স্মৃতিফলক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটিই খুলনা জিলা স্কুলের মূল ভবন। মূল কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে ভবনটিকে ১৯৯৫ সালে সংস্কার করা হয়। এ বিদ্যালয়টিতে এক কালে আরবি, ফারসি ও উর্দু  ভাষাও চালু ছিল। ১৯৬৩ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার টেকনিক্যাল শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের মাঠের উত্তর পার্শ্বে তিনতলাবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করেন। এটি বর্তমানে প্রশাসনিক ভবন। হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদের জন্য আলাদা ছাত্রাবাস নির্মিত হয়।

খুলনা জিলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু জারুকু নাথ সরকার। তিনি মার্চ ১৮৮৫ থেকে সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যিক আবুল ফজল এই স্কুলে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। কাজী ইমদাদুল হক, কবি ফররুখ আহমদ, পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী খান-এ-সবুর, বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জনাব এস. এ করিম, বিচারপতি মকসুমুল হাকিম, কথাশিল্পী আনিস সিদ্দিকী, অভিনেতা নাদিম, গোলাম মোস্তফা, ছাত্রনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম মোহাম্মদ সিরাজুল আলম খান প্রমুখ খুলনা জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

এই বিদ্যালয়ের এস.এস.সি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে পর পর ছয় বার প্রথম স্থান অধিকার করে। ৫ম শ্রেণির বৃত্তি ও সমাপনী পরীক্ষা এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে মেধাতালিকার শীর্ষে অবস্থান করেছে। ২০১০ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকার ১ম দশ জনের মধ্যে ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারী ৯ জনই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র।

ক্রিকেট ও বাস্কেটবলে এ বিদ্যালয় পর পর কয়েকবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সঙ্গীতে পারদর্শিতার ছাপ রেখে চলেছে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে কৃষি বিভাগ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান চর্চা, বিএনসিসি কার্যক্রম, স্কাউটস ও রেডক্রিসেন্ট কার্যক্রম।

বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে দুই শিফটে ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রভাতী শাখা চলে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং দিবা শাখা চলে দুপুর ১২.১৫টা থেকে বিকাল ৫.৩০টা পর্যন্ত। ২ শিফটে পাঠরত ছাত্রসংখ্যা ৩ হাজার। ২০০৯ সালে এস.এস.সি পরীক্ষায় পাশের হার ১০০%। শিক্ষকশিক্ষিকার সংখ্যা ৫৩। কর্মচারীর সংখ্যা ৬। এই বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বেশ পুরানো, গ্রন্থ সংখ্যা ৬ হাজার। এখানে অনেক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থও আছে। ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা স্কুলটি পরিচালিত হয়। পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হন জেলা প্রশাসক এবং সম্পাদক হন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সদস্যের মধ্যে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী ও সিভিল সার্জন। বিদ্যালয়ের ৯ টি ভবন শ্রেণি কক্ষের জন্য, ২টি একতলা ছাত্র হোস্টেল, একটি প্রশাসনিক ভবন, একটি শিক্ষকদের কমনরুম, ৬টি ল্যাবরেটরি, একটি খেলার মাঠ, একটি মসজিদ, একটি অডিটোরিয়াম ও একটি শহীদ মিনার রয়েছে।  [মালেকা বেগম]