খাল


খাল (Canal)  মানব সৃষ্ট উন্মুক্ত জলপ্রবাহ খাত। খাল দুই ধরনের হয়ে থাকে: বহন খাল ও নৌ-পরিবহণ খাল। সেচ, জল নিষ্কাশন অথবা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বহন খাল খনন করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, নৌযোগাযোগের উদ্দেশ্যে খনন করা হয় নৌ-পরিবহণ খাল। তবে উভয় প্রকার খালই নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে বলে উভয় ক্ষেত্রে নৌযোগাযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। খালের মাধ্যমে কখনও কখনও দুটি প্রাকৃতিক জলরাশিকেও সংযুক্ত করা হয়।

খাল

সম্ভবত সেচের প্রয়োজনেই সর্বপ্রথম খাল খনন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে, জলকপাট (spillway) উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে নৌচলাচলের উদ্দেশ্যেও খাল খনন করা হতে থাকে। খাল খননের ফলে বিভিন্ন স্থানে সমুদ্র যাত্রার পথ বহুলাংশে হ্রাস পেতে থাকে। এ প্রসঙ্গে ১৮৬৯ সালে সমাপ্ত সুয়েজ খাল, ১৯১৪ সালে খনন সমাপ্ত পানামা খাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নৌপথ উন্নয়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই খাল খনন করে দুই বা তার চেয়ে বেশি সংখ্যক নদীকে যুক্ত করা হয়, যেমন বাংলাদেশের মাদারীপুর বিল রুট

খাল খননের ক্ষেত্রে পানির সহজলভ্যতা, ভূ-প্রকৃতি (ভূমি ও পানির লেভেলের পার্থক্য, ঢাল প্রভৃতি) প্রভৃতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। পানি বহনকারী খালগুলি সাধারণত সরু প্রকৃতির হয়ে থাকে যাদের মধ্য দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হয়। সেচ খালগুলি কৃষি ভূমিকে অনুসরণ করে খনন করা হয়। সহজেই এ সকল খালে ভাঙন এবং পলিভরাট সংঘটিত হয়ে থাকে। কখনও কখনও তলদেশের ও তীরের মৃত্তিকার অবস্থা বিবেচনা করেও খালের পথ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে এবং তীর ভাঙন রোধের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বার্জ অথবা জাহাজ চলাচলের জন্য খাল খননের বেলায় তীর রক্ষার সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়েই খালের পথ নির্ধারণ করা হয়।

বাংলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে এ অঞ্চলে প্রথম সেচ খাল খনন করা হয়েছিল। সেসময় থেকে আজ পর্যন্ত দেশের সর্বত্র সেচ এবং নিষ্কাশনের প্রয়োজনে খাল খনন করা হয়ে আসছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সেচ প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিত খাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ: গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, তিস্তা প্রকল্প, মুহুরী সেচ প্রকল্প প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আবার বিভিন্ন খালে রেগুলেটর, জলকপাট, মৎস্য যাতায়াতের পথ প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে।

কয়েকটি ছোট ছোট সর্পিলাকৃতি নদী যেমন: সাঙ্গু, গোমতী প্রভৃতির বাঁক সংযোজক খালসমূহ (loop cuts) বাংলাদেশের নৌচলাচল খালের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। মাদারীপুর বিলের মধ্য দিয়ে আড়িয়াল খাঁ, পুরাতন কুমার এবং মধুমতি নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ১৮৯৯ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে মাদারীপুর বিল রুট খনন করা হয়। এ রুট খনন করার ফলে খুলনার সঙ্গে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হয়। কিছু কিছু স্থানে নির্মিত তীর রক্ষা সুবিধা ব্যতীত বাংলাদেশের সকল নৌচলাচল খালের তীর ভাঙনপ্রবণ।  [এইচ.এস মোজাদ্দাদ ফারুক]