খান, তমিজউদ্দীন


তমিজউদ্দীন খান

খান, তমিজউদ্দীন (১৮৮৯-১৯৬৩)  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি অবিভক্ত বাংলার একজন মন্ত্রী ছিলেন। পরে তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পরিষদের স্পীকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮৮৯ সালে ফরিদপুরের জন্মগ্রহণ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের সীমিত সুযোগে বিকাশোন্মুখ মুসলমানদের দীর্ঘ দুঃসাহসিক যাত্রায় একটি স্থান অধিকার করার বিশেষ লক্ষণসমূহ তাঁর প্রথম জীবনে দেখা গিয়েছিল।

১৯১৩ সালে ইংরেজিতে এম.এ ডিগ্রি এবং ১৯১৫ সালে আইন পাস করার পর তিনি আইন ব্যবসার জন্য ফরিদপুরে বসতি স্থাপন করেন। পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন এবং ফরিদপুর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি কংগ্রেসে যোগদান করেন, আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার সম্পাদকও হন এবং পরে মুসলিম লীগ-এ যোগদান করেন। তিনি  খিলাফত ও  অসহযোগ আন্দোলন-এ অংশ গ্রহন করেন এবং কারারূদ্ধ হন। ১৯২৬ সালে পৌরসভার নির্বাচনকালে তাঁর নির্বাচনী এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু নির্বাচকগণ তাঁকে সমর্থন করে নি। ব্যক্তিগত এ হতাশার সাথে ভারতের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত তীব্র হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চিত্র যুক্ত হলে অন্যান্য অনেক মুসলমান রাজনীতিবিদদের মতো তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি বিরূপ হন এবং নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মুসলমান স্বার্থে নিয়োজিত করেন।

১৯২০ সাল হতে ব্রিটিশ সরকার ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করতে শুরু করে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে কৃষক সম্প্রদায়ের উপরের অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে। শক্তিশালী গ্রামীণ ভিত্তি থাকার কারণে তমিজউদ্দীনের পক্ষে নিখিল বাংলার রাজনীতিতে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হওয়া সম্ভব হয়েছিল। ১৯২৬ সালে তিনি একজন কংগ্রেসপন্থি মুসলমান জমিদারকে পরাজিত করে ফরিদপুর হতে বঙ্গীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন।

মুসলিম লীগের সাথে একীভূত হতে অস্বীকার করে  .কে ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য ১৯৩৬ সালে  কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তমিজউদ্দীন খান মুসলিম লীগের টিকেটে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস প্রার্থী হুমায়ুন কবীরকে পরাজিত করে ফরিদপুর হতে নির্বাচিত হন। লীগ-প্রজা পার্টি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় তাঁকে না নেওয়ার জন্য তিনি হতাশ হয়ে স্বাধীন প্রজা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং গোপনে বঙ্গীয় আইন পরিষদের কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুর সাথে আলাপ আলোচনা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের মধ্য জুনে কংগ্রেস ‘বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল’-এর প্রশ্নে সরকারের বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অন্যান্য হতাশাগ্রস্ত প্রজা নেতাসহ তমিজউদ্দীন খান প্রস্তাবিত অনাস্থা সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি বিফল হয় এবং হক মন্ত্রিসভা টিকে যায়। অতঃপর ফজলুল হক তমিজউদ্দীন খানকে মন্ত্রিসভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রাথমিকভাবে তাঁকে ঔষধ ও জনস্বাস্থ্য দপ্তর দেওয়া হয় এবং পরে তাঁকে কৃষি ও শিল্প দপ্তরের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

১৯৪১ সালের মধ্যে ফজলুল হক এবং মুসলিম লীগের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। হক হিন্দু মহাসভার নেতা  শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাথে তাঁর দ্বিতীয় কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তমিজউদ্দীন খান তাঁর অন্যান্য মুসলিম লীগের সহকর্মীদের নিয়ে আইন পরিষদে বিরোধী দলে যোগদান করেন।

১৯৪৩ সালে হক মন্ত্রিসভার পতন ঘটলে স্বতন্ত্র হিন্দু ও ইউরোপীয়দের সমর্থনে নাজিমউদ্দীনের অধীনে একটি নতুন কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তমিজউদ্দীন খান শিক্ষা মন্ত্রী হন। ১৯৪৫ সালে একটি ছাটাই প্রস্তাবের (কাট মোশান) উপর ভোটে সরকার পরাজিত হয় এবং আইন পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়।

ইতোমধ্যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবিকে তার প্রধান বিষয়ে পরিণত করে। ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে তমিজউদ্দীন খান ঢাকা ময়মনসিংহ নির্বাচনী এলাকা থেকে টাঙ্গাইলের আবদুল হালীম গজনবী-কে পরাজিত করে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সরকার যখন উপমহাদেশকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং কেন্দ্রীয় পরিষদ ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের জন্য দুটি গণপরিষদ নির্বাচিত করে। পরে তিনি পরিষদের সহ সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সভাপতি হন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর পর তিনি সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের শাসনতন্ত্র রচনার প্রক্রিয়া ব্যাহত ও বিলম্বিত হয়। ফলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।

গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ ভেঙ্গে দিলে তমিজউদ্দীন খান উক্ত পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়ে সিন্ধু কোর্টে ‘তমিজউদ্দীন খান বনাম ফেডারেশন অব পাকিস্তান’ নামে এক মামলা দায়ের করেন এবং এতে তিনি জয়লাভ করেন। যাহোক, আপীলে ফেডারেল কোর্ট সিন্ধু কোর্টের রায়কে ‘রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে’ বাতিল করে দেয়। এ রায় ছিল দ্বিধাগ্রস্ত।

কিছু কালের জন্য তমিজউদ্দীন খান রাজনৈতিকভাবে হারিয়ে যান। ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রের অধীনে তমিজউদ্দীন খান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য (এম.এন.এ) নির্বাচিত হন এবং পরে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পীকার নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।  [মঞ্জুর আহসান]