খান, খানবাহাদুর হাশেম আলী


খান, খানবাহাদুর হাশেম আলী (১৮৮৮-১৯৬২)  রাজনীতিক, কৃষক নেতা। ১৮৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার স্বরূপকাঠি থানার সেহাঙ্গল গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পূর্বপুরুষ ফালাহ আলী খান লোদী ছিলেন দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদীর বংশধর। কথিত আছে, ফালাহ আলী খান লোদী দিল্লি থেকে বাংলায় আসেন এবং লাখেরাজ ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে বরিশালের সেহাঙ্গল গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। হাশেম আলী খানের পিতা আরমান আলী খান সেহাঙ্গলে নিজস্ব তালুক দেখাশুনা করতেন।

হাশেম আলী খান ১৯০৬ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। তিনি কলিকাতা মাদ্রাসা থেকে ১৯০৮ সালে এফ.এ এবং ১৯১০ সালে বি.এ পাস করেন। কলিকাতা মাদ্রাসায় পড়াশুনায় তাঁর কৃতিত্বের ফলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভাইস প্রিন্সিপাল নিয়োগ করেন। মাদ্রাসায় চাকরিকালে তিনি কলিকাতার বেকার হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হন। এ সময় হাশেম আলী খান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে পুলিশ বিভাগে ডিএসপি পদে নিয়োগ পান। পুলিশের চাকরি গ্রহণে পিতার আপত্তির কারণে তিনি এ চাকুরিতে যোগ দেন নি। অতঃপর ১৯১৩ সালে তিনি কলিকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল পাস করে আলীপুর প্রেসিডেন্সি কোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন। হাশেম আলী খান ১৯১৪ সালে বরিশাল বারে যোগ দেন। এ সময় তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯১৫ সালে তিনি কৃষক-প্রজা পার্টিতে যোগ দেন। হাশেম আলী খান ছিলেন বরিশাল জেলা কৃষক-প্রজা পার্টির সভাপতি।

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনকালে তিনি বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং বরিশালস্থ উকিল-মোক্তারদের আইনব্যবসা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ সময় বরিশালে বঙ্গীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে তিনি অভ্যর্থনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯২১ সালে বরগুনার গৌরিচন্না এবং ১৯৩০ সালে আগৈলঝড়ায় ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৪ সালে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তিনি প্রজাপার্টির প্রার্থী হিসেবে পুনরায় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর জনসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক তিনি ‘খানবাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৯ সালে বাংলার কৃষকদের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ এবং জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের লক্ষ্যে যে ‘ফ্লাউড কমিশন’ গঠিত হয়, হাশেম আলী খান ছিলেন তার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। তিনি ১৯৪১ সালে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় সমবায় ও কৃষি বিভাগের মন্ত্রী হন। তিনি আইনসভার ভেতরে ও বাইরে থেকে ১৯৩৮ সালের ভূমি সংস্কার আইন, ১৯৪০ সালের মহাজনী আইন, ১৯৩৯ সালের কৃষি খাতক আইনের প্রথম সংশোধনী এবং ১৯৪২ সালের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৬ সালে আইনসভার নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে  মুসলিম লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এ নির্বাচনে কৃষক-প্রজা পার্টির বিপর্যয়ের পর হাশেম আলী খান মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীর কাছে তিনি হেরে যান। ১৯৬২ সালে আইউব বিরোধী দলগুলোর সমর্থনে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারকালে ১৯৬২ সালের ১৬ এপ্রিল ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবিতে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

রাজনীতি ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন কোলকাতা থেকে প্রকাশিত নবযুগ পত্রিকার প্রধান পরিচালক। কাজী নজরুল ইসলাম ও আবুল মনসুর আহমদ এ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া এস. ওয়াজেদ আলীর সহযোগিতায় ১৯৪২ সালে তিনি কলকাতা থেকে গুলিস্তাঁ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি বরিশাল থেকে খাদেম নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৬১ সালে বরিশাল সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে বরিশালে যে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তার অন্যতম ব্যবস্থাপক ছিলেন হাশেম আলী খান। [দেলওয়ার হাসান]