খাদ্য নিরাপত্তা


খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security)  অবাধ খাদ্য সরবরাহ এবং সারা বছর খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা। খাদ্য নিরাপত্তা দুরকমের– গৃহগত বা পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি পরিবারের পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, যাতে পরিবারের প্রতিটি লোক সর্বদা স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য খেতে পারে। একইভাবে, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সারা দেশের জনগণের জন্য যথেষ্ট খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, একটি পরিবার ও গোটা জাতির প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রাপ্যতা। দ্বিতীয়ত, স্থানভেদে বা ঋতুভেদে খাদ্য সরবরাহের যুক্তিসঙ্গত স্থায়িত্ব। তৃতীয়ত নির্বিঘ্ন ও মানসম্মত পরিমাণ খাদ্যে প্রত্যেক পরিবারের ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা  সরাসরি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে থাকে। অর্থনৈতিক দিক থেকে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য সাহায্য প্রাপ্তির পরিমাণ ও খাদ্য আমদানির সামর্থ্য এবং আরও বহু জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অধিকন্তু কিছু প্রাকৃত, অপ্রাকৃত ও মানুষের সৃষ্ট উপাদানও খাদ্য নিরাপত্তার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে থাকে। ১৯৪৩-৪৪, ১৯৫৪-৫৬ ও ১৯৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষগুলিই এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পক্ষান্তরে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ব্যবধানটি এখনও বেশ বড় যা সাধারণত বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত খাদ্য সাহায্য বা খাদ্য আমদানি দ্বারা পূরণ করা হয়।

অন্যান্য ধরনের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতাও লক্ষণীয়। কিন্তু চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান বেশ বড় থাকায় বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী গ্রহণের মাথাপিছু মাত্রা কমে যায়। ফলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থা খুবই ভঙ্গুর ও নাজুক অবস্থায় আছে।

পারিবারিক পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা  নানা আর্থ-সামাজিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, যেমন পারিবারিক আয়, কৃষিযোগ্য ভূমির পরিমাণ, পারিবারিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি, পরিবারের আয়তন, খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস ইত্যাদি। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা মৌসুমি কারণেও প্রভাবিত হয়। বছরে খরার মাসগুলিতে (অক্টোবর-নভেম্বর) খাদ্যঘাটতি ও উচ্চমূল্যের জন্য মৌসুমি খাদ্য নিরাপত্তা প্রভাবিত হয়। খাদ্য উৎপাদন এবং গবাদি পশু প্রজননে ব্যর্থতা, কর্মসংস্থানের অভাব, ক্রয়ক্ষমতার দৈন্য ও নানা প্রতিকূল কারণে সাময়িক খাদ্য নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। সংক্ষেপে, দারিদ্র্যই পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ।

বাংলাদেশে পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির মধ্যে আছে ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর বা কামলা, গৃহহীন মহিলাদের পরিবার এবং চরাঞ্চল ও দ্বীপের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজন ও উদ্বাস্ত্ত শিবিরের বাসিন্দারা। এ পর্যন্ত পরিচালিত সবগুলি পুষ্টি জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে, দেশের প্রায় ৯০% লোক খাদ্যাভাবে কোনো না কোনো রকমের পুষ্টিহীনতায় ভোগে। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘প্রচ্ছন্ন দুর্ভিক্ষ’ বলে থাকেন। তাই গোটা খাদ্য পরিস্থিতিকেই জাতীয় ও পারিবারিক পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা রূপে অভিহিত করা যায়।  [এম কবিরউল্লাহ]

আরও দেখুন খাদ্যনীতি; খাদ্যশস্য গুদামজাতকরণ; খাদ্য সংরক্ষণ