খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট


খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আই.এফ.আর.বি) [Institute of Food and Radiation Biology (IFRB)]  বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান। ষাটের দশকের প্রথম দিকে পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকাতে ফুড ইরেডিয়েশন, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের নিয়ন্ত্রণ, শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্তকরণ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম আরম্ভ হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে ইরেডিয়েশন ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অনুমোদন দেয়। এ ইনস্টিটিউটটি কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালে এবং পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা-এর রেডিওবায়োলজী বিভাগকে এ প্রতিষ্ঠানের একটি অংশে পরিণত করা হয়। প্রথমে ইনস্টিটিউটটিকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল ঢাকার অদূরে টংগীতে। ১৯৭৯ সালে ইরেডিয়েশন ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটকে আবার স্থানান্তরিত করা হয় ঢাকা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে সাভারে অবস্থিত  পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Atomic Energy Research Establishment) ক্যাম্পাসে। এ সময় এর নতুন নামকরণ হয় খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য সংরক্ষণ, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা ও ঔষধ প্রস্ত্ততের জন্য ব্যবহার্য সামগ্রীগুলির নির্বীজন, শস্যকণা, কলাই, ডাল, ফল, শুঁটকি মাছ, তামাক ইত্যাদিকে কীটপতঙ্গের উৎপাত থেকে মুক্তকরণের ওপর গবেষণাধর্মী কাজ শুরু করে। গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কার্যক্রমগুলিকে আরও গতিশীল করতে এখানে ৫০,০০০ কুরি শক্তিসম্পন্ন গামা রশ্মি, ৬৫০ ইরেডিয়েটর, শীতল কক্ষ, বিভিন্ন প্রকারের স্পেক্ট্রোফটোমিটার, লামিনার, হুড, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি স্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশে গুদামজাত চাল, গম, কলাই ও ডাল, তৈলবীজ এবং অন্যান্য শস্যকণার বিশাল ক্ষতির জন্য গুদামের মধ্যে উৎপন্ন  কীটপতঙ্গ দায়ী। এগুলিকে গামা বিকিরণের একটি মাত্রা প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত করা যেতে পারে। গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে বিকিরণ ব্যবহার করে আলু ও পিঁয়াজকে ২° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রাসম্পন্ন কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করার পরিবর্তে ১২°-১৫° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গুদামজাত করা যেতে পারে। এ পদ্ধতি কোল্ড স্টোরেজের খরচ বহুলাংশে বাঁচায় এবং তা প্রচলিত পদ্ধতির প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। ইরেডিয়েটেড আলু প্রচলিত পদ্ধতির কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত আলুর মতো মিষ্টি হয়ে যায় না। উৎপাদন মৌসুম ব্যতীত অন্য সময়ে ব্যবহারের জন্য যে শুঁঁটকি মাছ গুদামজাত করা হয় তাতে কীটপতঙ্গ মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে। এ কীটপতঙ্গ দমনের জন্য সাধারণত বিষ প্রয়োগ করা হয়। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর শুঁটকি মাছে থেকে যাওয়া বিষের অবশিষ্টাংশ ভোক্তার স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাবে ফেলে। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। শুঁটকি মাছ থেকে কীটপতঙ্গকে অপসারণের জন্য বিকিরণ মাধ্যম ব্যবহার করা হলো একটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি। খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এ বিষয়ে সফল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।

খাদ্য গুদামজাতকরণ খরচ কমানোর জন্য পাইকারি বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা নিয়ে ইনস্টিটিউটটি সাফল্যপূর্ণ পরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণ ও আধা-বাণিজ্যিক মাত্রার ইরেডিয়েশন এবং খাদ্য সংরক্ষণের গবেষণা সম্পন্ন করেছে। এ গবেষণাটি হয়েছিল কলাই ও অন্যান্য ডাল, আলু, পিঁয়াজ এবং শুঁটকি মাছের ওপর ভিত্তি করে। ভোক্তার গ্রহণযোগ্যতা পরখ ও ইরেডিয়েটেড পণ্যগুলির বাজার যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং ফলাফল অনুকূলে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ পদ্ধতির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়নি।

উৎপাদন ধারায় অস্বাস্থ্যকর চর্চার কারণে বাংলাদেশে সরবরাহকৃত চিকিৎসা সামগ্রী রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হয়ে থাকে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে জীবাণু সংক্রমণ হলো একটি প্রধান সমস্যা। আই.এফ.আর.বি তার নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে সাধারণ চিকিৎসা দ্রব্যাদি, যেমন: তুলা, ব্যান্ডেজ, ড্রেসিং গজ, শোষক পদার্থ/স্পঞ্জ, ক্ষতস্থানে সেলাইয়ের জন্য ব্যবহূত রেশম ও নাইলনের সুতা ইত্যাদি নির্বীজনের কর্মকান্ড শুরু করেছিল প্রথম থেকেই। বর্তমানে বেশিরভাগ সরকারি হাসপতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি, তাদের ট্রান্সফিউসন ও ইনফিউসন সেটগুলিকে আই.এফ.আর.বি থেকে জীবাণুমুক্ত করে থাকে। খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের নির্বীজন সেবা গ্রহণযোগ্য ভর্তুকি মূল্যে সর্বক্ষণ গ্রহীতাদের জন্য উন্মুক্ত।  [মিয়া মোঃ সিরাজুল হক]