খাদ্যশস্য গুদামজাতকরণ


খাদ্যশস্য গুদামজাতকরণ (Grain Storage)  বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান, গম ও ভুট্টা প্রায়শই কিছুকালের জন্য গুদামে রাখা হয়। ফসল তোলার পর গুদামজাত খাদ্যশস্যের ক্ষতির মাত্রা বাংলাদেশে ১০-২৫ শতাংশের মতো। গুদামজাত অবস্থায় পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণ অংশত এজন্য দায়ী। ফসল তোলার পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি বস্ত্তত যথাযথ মাড়াই, পরিষ্করণ, শুকানো ও গুদামজাতকরণের ওপর নির্ভরশীল।

শস্য সংরক্ষণ: ডোল, পাটের বস্তা, মটকা

শস্য শুকানো  শস্যে সঠিক মাত্রায় পানি রেখে অতিরিক্ত পানি অপসারণই হলো শুকানো। বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সনাতন পদ্ধতিতে রোদে শুকানো হয়ে থাকে। রোদে কৃষিপণ্য শুকানো এদেশে সর্বাধিক অনুসৃত পদ্ধতি। এ চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভেজা শস্য সমতল ভূমিতে, সাধারণত সমান করা মাটির উপর, সরাসরি রোদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছড়িয়ে রাখা হয়।

উন্নত দেশসমূহে ব্যবহূত উচ্চ তাপমাত্রার ড্রায়ার ব্যবহার আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশে লাভজনক নয়। দেশের সকল এলাকায় প্রচুর সৌর-বিকিরণ থাকায় রোদে শুকানোর পদ্ধতি এখানে ব্যাপক। সৌর-ড্রায়ার প্রচলন একাধারে আশাপ্রদ, পরিবেশগতভাবে সঠিক ও দূষণমুক্ত বলেই প্রতীয়মান হয়। সীমিত পরিমাণ বীজের ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল ড্রায়ার/সৌরতাপচালিত নিরুদক যন্ত্র এবং প্রচুর পরিমাণ বীজের ক্ষেত্রে ব্যাচ-টাইপ শুষ্ককরণ ও গুদামজাতকরণ পদ্ধতির প্রয়োগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারে।

গুদামজাতকরণ  শস্যমানের অবনতি রোধই গুদামজাতকরণের প্রাথমিক লক্ষ্য। কাজটি প্রত্যক্ষভাবে না করে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, নির্বিঘ্ন বায়ু চলাচল এবং জীবাণুসংক্রমণ, কীটপতঙ্গ ও ইঁদুরের আক্রমণ রোধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সম্পন্ন করা হয়।

বাংলাদেশে কৃষকরা নিজেদের খাদ্য চাহিদা মিটানো এবং বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য খাদ্যশস্য গুদামজাত করে থাকে। এভাবে সঞ্চিত শস্য মোটামুটি মোট উৎপাদনের ১০-১০০% হতে পারে। গড় গুদামজাতকরণের পরিমাণ উৎপন্ন শস্যের প্রায় ৭০%। খাদ্যশস্য পাত্রে বা ভাঁড়ারে রাখা হয়। বাংলাদেশে এজন্য ব্যবহূত পাত্রের মধ্যে রয়েছে মটকা, মাটির হাঁড়ি, পাটের বস্তা ইত্যাদি। অধিক পরিমাণ শস্য রাখা হয় সনাতন গুদামজাতকরণ ব্যবস্থায় ভাঁড়ার, গোলাঘর ও সাইলো অথবা ভূগর্ভস্থ শস্যাগারে। প্রাপ্ত শস্যের প্রায় ৯০% ভাঁড়ারে সঞ্চিত থাকে।

গ্রামাঞ্চলে গুদামজাত থাকে মোট উৎপন্ন শস্যের ৮০% এবং তা সনাতন গুদামজাতকরণ ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়। গুদামজাতকরণের সনাতন কৌশল সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতেই প্রোথিত এবং তা বংশপরম্পরায় অব্যাহত রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের ধরন ও শস্যাদির পরিমাণ অনুযায়ী শস্যাগারের নমুনা ও ধারণক্ষমতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে খামার পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকারের প্রায় ৮ ধরনের গুদামজাতকরণ পদ্ধতি ব্যবহূত। এর মধ্যে সাধারণ প্রচলিত শস্যাগারগুলি হচ্ছে ধানগোলা (বেত বা বাঁশের তৈরী মাঝারি ও বড় আকারের চোঙাকার বা আয়তাকার পাত্র), বেড় (বাঁশের তৈরী মাঝারি ধারণক্ষমতার চোঙাকার পাত্র) ও ডোল (স্বল্প ধারণক্ষমতার বাঁশনির্মিত চোঙাকার ভান্ড)। বাঁশের তৈরী ভান্ডের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহূত হয় ডোল ও বেড়। ডোলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একটি তলা রয়েছে, বেড় ও ধানগোলার তা নেই। ডোল সচরাচর ০.৬ মিটার চওড়া ও ১ মিটার উঁচু এবং ধারণক্ষমতা ২৪০-৪৫০ কেজি। বেড় প্রায় ১.৫ মিটার উঁচু ও ১.৫ মিটার চওড়া এবং ধারণক্ষমতা ৭০০ থেকে ১২০০ কেজি। আয়তাকার ধানগোলা প্রায় ৭ মিটার লম্বা, ৩.৫ মিটার চওড়া ও ৩ মিটার উঁচু এবং ধারণক্ষমতা ৪০০০ থেকে ৪০,০০০ কেজি। এগুলির মধ্যে ধানগোলা বেশি মজবুত করে তৈরি। তবে এ তিন ধরনের পাত্রই ফসল তোলা থেকে বীজবপন পর্যন্ত ধানের বীজ গুদামজাতকরণের জন্য উপযুক্ত এবং এ তিনটির মধ্যে ডোল সর্বোৎকৃষ্ট। বেড় ও ডোলের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ২৪৫০ কেজি ও ৭৫০ কেজি।

বস্তাভর্তি শস্য শস্যাগারে গুদামজাত করা হয়। এগুলিকে ‘মামুলি গুদামঘর’ বলা হয়ে থাকে। বস্তাভর্তি খাদ্যশস্য গুদামজাতকরণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় মালগুদাম (গ্রামাঞ্চলে ও শহরের মহল্লা এলাকায়) ও কেন্দ্রীয় মালগুদাম (আঞ্চলিক পর্যায়ে)। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় মালগুদামগুলি মূলত খাদ্যশস্যের স্বল্পমেয়াদি ভান্ডার হিসেবে ব্যবহূত হয়। এসব খাদ্যশস্য ফসল কাটার মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অথবা অন্যান্য স্থানীয় মালগুদাম, কেন্দ্রীয় মালগুদাম ও সাইলো থেকে আনা। অন্যান্য স্থানীয় মালগুদাম, কেন্দ্রীয় মালগুদাম ও রেশন দোকানগুলিতে পাঠানোর জন্য আমদানিকৃত শস্যও এগুলিতে রাখা হয়। দেশে জরুরি প্রয়োজনের সময় খাদ্যনিরাপত্তার ব্যবস্থা হিসেবে খাদ্যশস্য, বিশেষত গম গুদামজাত করার জন্য সাইলো ব্যবহূত হয়ে থাকে।  [বি.কে বালা]

আরও দেখুন খাদ্যনীতি; খাদ্য সংরক্ষণ; খাদ্যসামগ্রী