খাতুন, মাসুদা


খাতুন, মাসুদা (১৮৮৫-১৯২৬)  বাংলার নারীবাদী আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। হুগলী জেলার আরামবাগের শেখপুর গ্রামে ১৮৮৫ সালে তাঁর জন্ম। পিতা খান বাহাদুর মাযহারুল আনোয়ার চৌধুরী ছিলেন একজন অভিজাত ভূস্বামী ও হুগলী জর্জকোর্টের উকিল। কাজী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার সুবাদে পূর্ব নাম মোসাম্মত মাসুদা খাতুন থেকে তিনি মিসেস এম রহমান নামে পরিচিত হন। তাঁর জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। মাসুদা খাতুন  সে সময়ে অন্যান্য মুসলিম নারীদের মত নিজ বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেছেন। সে সময়ের অন্যান্য নারী লেখকদের তুলনায় মাসুদা খাতুনের লেখা ছিল অগ্নিগর্ভ। তিনি তাঁর লেখায় দেশপ্রেম সমস্যা ও আপোষহীন ভাবে সে সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তবে প্রগতিশীলরা তাঁকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাসুদা খাতুনের ঘনিষ্ঠ হূদ্যতা ছিল এবং কবি তাঁর কাজ ও দায়িত্ববোধকে শ্রদ্ধা করতেন। কবি নজরুল মাসুদা খাতুনকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন্এবং তাঁকে উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রতীক বলে মনে করতেন। তাই কবি নজরুল তাঁর বিষের বাঁশি (১৯২৪) কাব্যগ্রন্থখানি মাসুদা খাতুনকে উৎসর্গ করেছিলেন। কবি নজরুলের ধূমকেতু সাহিত্য পত্রিকায় মিসেস এম রহমান এর তিনটি প্রবন্ধ ছাড়াও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সহচর, সাম্যবাদী, লাঙ্গল, সওগাত প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

নারীবিষয়ক ইস্যু ছিল মিসেস এম রহমানের লেখার মূখ্য বিষয় এবং তাঁর বিবৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কর্মজীবী নারীর পারিশ্রমিকের বিষয়ে ওকালতি করা। একজন দৃড়চেতা ধর্মনিরপেক্ষ নারী হিসেবে মাসুদা খাতুন হিন্দু-মুসলমানদের একতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তিনি কলকাতা শহরে বোরকাবিহীন অবস্থায় একাই চলাফেরা করতেন, প্রায়ই সিনেমা হলে যেয়ে সিনেমা দেখতেন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কীর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। মাসুদা খাতুন পতিতাদের পুনর্বাসনের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রেরও ব্যবস্থা করেছিলেন।

১৯২৬ সালের ২০ ডিসেম্বর মিসেস এম রহমানের অকাল মৃত্যু সে সময়ে নারীমুক্তির জন্য আন্দোলনকারীদের উদ্দীপনাকে প্রায় নির্জীব করে দিয়েছিল। শোকাহত কবি নজরুল তাঁর গ্রন্থের উৎসর্গে মিসেস এম রহমানকে অগ্নি নাগিনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।  [সোনিয়া আমিন]