খাতুন, দৌলতুন্নেসা


খাতুন, দৌলতুন্নেসা (১৯১৮-১৯৯৭)  লেখক, বাগ্মী, সমাজকর্মী এবং গান্ধীজীর অনুসারী। বগুড়া জেলার সোনাতোলা গ্রামে ১৯১৮ সালে দৌলতুন্নেসা খাতুনের জন্ম। মাত্র ৮ বছর বয়সে ডাক্তার হাফিজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সে সময়ে সামাজিক পরিবেশ ও মূল্যবোধ নারী শিক্ষার অনুকূলে ছিল না বটে, কিন্তু দৌলতুন্নেসা খাতুনের অভিভাবক ১২ বছর পর্যন্ত তাঁকে ঢাকার ইডেন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার অনুমতি প্রদান করেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার প্রতি দৌলতুন্নেসা খাতুনের গভীর আগ্রহ স্বামী গৃহে থেকেও তাঁর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল।

ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘লবণ আইন’ পাস করলে, ১৯৩০ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে দৌলতুন্নেসা লবণ আইন অমান্যের  উদ্দেশ্যে গান্ধীর আইন অমান্য আন্দোলন এর (লবণ সত্যাগ্রহ) সভায় ও মিছিলে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলন চলাকালে ১৯৩২ সালে দৌলতুন্নেসা অন্যান্য কর্মীর সহযোগিতায় গাইবান্ধায় ‘গাইবান্ধা মহিলা সমিতি (Gaibandha Women's Association) গঠন করেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বহু সভা, সমিতি, মিছিল, পিকেটিং ইত্যাদিতে কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ ছাড়াও তিনি ১৪৪ ধারার (একসঙ্গে চার ব্যক্তির সমাবেশ নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে জারিকৃত আইন) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এ পর্বে তিনি তাঁর কর্মকান্ড বক্তৃতা, বিবৃতি প্রভৃতির মাধ্যমে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার নারী সমাজকে অংশগ্রহণে উৎসাহীত করেন। তাঁর সময়ে আন্দোলনে জড়িত খুব কমসংখ্যক মুসলমান নারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন। সরকার বিরোধি আন্দোলনে দৌলতুন্নেসা খাতুনের সক্রিয় ভূমিকার জন্য তাঁর স্বামীকে গাইবান্ধা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করা হয় এবং তাদের বাড়ি অবরোধ করে রাখা হয়। পরবতকালে প্রতিভা সরকার ও মহামায়া নামের অন্য দু’জন নারী কর্মীর সঙ্গে দৌলতুন্নেসা গ্রেফতার ও বন্দী হন। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি তাঁর লেখাপড়া চালিয়ে যান এবং বিএ পাস করেন। পাশাপাশি তিনি সাহিত্য কর্ম চালিয়ে যান ও মহিলা সমিতির  জন্যও কাজ করতে থাকেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে তিনি একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর দৌলতুন্নেসা ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি বগুড়া, দিনাজপুর ও রংপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে নারী ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ‘পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ’ এ নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন।

দৌলতুন্নেসা খাতুন গান্ধীর অনুসারী হিসেবেই অধিক স্মরণীয় হয়ে আছেন। সমাজকর্মী হিসেবে তিনি তাঁর এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা ও তা পরিচালনার দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ছিলেন। গাইবান্ধায় নিভৃতে লেখাপড়া করেই তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত হয়। ১৯৯৭ সালে ৪ আগস্ট দৌলতুন্নেসা খাতুনের মৃত্যু হয়।  [সোনিয়া আমিন]