খাজা উসমান


খাজা উসমান  আফগান দলপতি। খাজা উসমান ছিলেন বাংলায় মুগল আগ্রাসনের মোকাবেলায় আফগানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রাণপুরুষ এবং বাংলায় মুগলদের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি ছিলেন খাজা ঈসার (ঈসা খান মিয়া খেল) পুত্র এবং উত্তর উড়িষ্যার অধিপতি কুতলু খান লোহানীর ভ্রাতুষ্পুত্র। কুতলু খান লোহানীর মৃত্যুর (১৫৯০) পর তাঁর ভাই ও মন্ত্রী ঈসা খান লোহানী কুতলু খানের নাবালক পুত্র নাসির লোহানীকে উড়িষ্যার মসনদে অধিষ্ঠিত করে মুগল সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করেন। কিন্তু ঈসা খান লোহানীর মৃত্যুর পর উড়িষ্যার আফগানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উড়িষ্যার মুগল সুবাদার রাজা মানসিংহ কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করেন (১৫৯৩)। আফগান দলপতিদের বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে মানসিংহ বিশিষ্ট আফগান নেতাদের উড়িষ্যার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে জায়গির প্রদান করেন। খাজা উসমানকে বাংলার ফতেহাবাদ পরগণায় (বর্তমান ফরিদপুর অঞ্চল) জায়গির বন্দোবস্ত দেয়া হয়।

খাজা উসমান তাঁর ভাই খাজা সুলায়মান, খাজা ওয়ালী, খাজা মালহী ও খাজা ইবরাহিমসহ বাংলা অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু উসমান তাঁর জায়গির এলাকায় পৌঁছবার আগেই মানসিংহ জায়গির সনদ বাতিল করেন। সম্ভবত মানসিংহ বাংলায় অপরাপর আফগান নেতাদের এতোটা কাছাকাছি উসমানকে পুনর্বাসন করা সমীচিন মনে করেন নি। মানসিংহের এই হঠকারিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে উসমান প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং দক্ষিণবঙ্গে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ভাটি অঞ্চলের অধিপতি ঈসা খান মসনদ-ই-আলার সঙ্গে যোগ দেন। পরে উসমান ময়মনসিংহ জেলায় ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব তীরবর্তী এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। বোকাইনগরে গড়ে তোলেন দুর্ভেদ্য নগর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরবর্তী হাসানপুর ও এগারসিন্ধুতে গড়ে তোলেন দুটি দুর্ভেদ্য সামরিক ঘাটি। ব্রহ্মপুত্র নদই তখন ছিল উসমানের রাজ্য ও মুগল অধিকৃত অঞ্চলের মধ্যকার বিভাজন রেখা।

খাজা উসমান ভাটির অধিপতি ঈসা খানের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কয়েকবারই রাজা মানসিংহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কোনদিনই তিনি মুগলের আধিপত্য মেনে নেন নি। তিনি ঈসা খানের পুত্র মুসা খানের সঙ্গেও মিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখেন। মুসা খানের বিরুদ্ধে মুগল বাহিনীর অভিযানকালে তিনি বরাবরই মুগলদের আক্রমণ করার জন্য আগ্রহী ছিলেন। উসমান সিলেটের আফগান দলপতি বায়েজীদ কররানী এবং বানিয়াচঙ্গের জমিদার আনোয়ার খান এর সঙ্গে কুটনৈতিক সখ্যতা স্থাপন করেন।

মুসা খানের পতনের পর উসমানের পতন ঘটানোই ছিল মুগল সুবাদার ইসলাম খানের প্রধান লক্ষ্য। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের শুরুতে ইসলাম খান উসমানের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ব্যাপক সমর প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন। মুগল পদাতিক বাহিনী শেখ কামাল ও শেখ আব্দুল ওয়াহিদের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে হাসানপুরে (বোকাইনগরের ২৫ মাইল উত্তরে) গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে শেখ কামাল ও আব্দুল ওয়াহিদ বোকাইনগরের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। মুগল বাহিনী সারাপথে চতুষ্পার্শ্বে পরিখা বেষ্টিত ছোট ছোট প্রতিরক্ষা দুর্গ নির্মাণ করে ওই দুর্গের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ছত্রছায়ায় সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। ছোট ছোট দুর্গের সহায়তায় অগ্রসরমান মুগল বাহিনীকে পদে পদেই উসমানের সৈন্যবাহিনীর আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়। উভয় পক্ষে খন্ডযুদ্ধ অব্যাহত থাকে।

মুগল বাহিনীর বীরদৃপ্ত অগ্রগতি, তাদের সংখ্যাধিক্য এবং বিপুল রণসম্ভার অচিরেই আফগান প্রতিরোধের ভিতকে দুর্বল করে দেয় এবং তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে সংশয়। উসমানের সেনাপতিদের মধ্যকার ঐক্যেও ফাটল ধরে। তাজপুরের দুই আফগান দলপতি নাসির খান ও দরিয়া খান তখন উসমানের পক্ষ ত্যাগ করে মুগলদের সঙ্গে যোগ দেন। দুই সেনাপতির দলত্যাগ এবং অনুরূপ আরও দলত্যাগের সম্ভাবনায় উৎকণ্ঠিত হয়ে খাজা উসমান বোকাইনগর ত্যাগ করে সিলেটে বায়েজিদ কররানির রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। উসমান তখন নাসির খান ও দরিয়া খানের ২৫০ জন আফগান সৈন্যকে বন্দী করেন এবং শেষ পর্যন্ত সিলেট অভিমুখে পশ্চাদপসরণ করেন। মুগল বাহিনী উসমান কর্তৃক পরিত্যক্ত বোকাইনগর দুর্গ অধিকার করে (৭ ডিসেম্বর ১৬১১)।

উসমান সিলেটের দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় নতুনভাবে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। উহরে গড়ে তোলেন তাঁর সুরক্ষিত রাজধানী শহর। এই উহর বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার হাইল হাওরের উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে ১৬ মাইল পূর্বে অবস্থিত পতন উশারের সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করা হয়। উসমান তাঁর পুত্র খাজা মুমরিজ ও ভাই খাজা মালহীকে নিকটবর্তী তরফ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন।

মুগল সুবাদার ইসলাম খান এরপর খাজা উসমানের বিরুদ্ধে অভিযানের ব্যাপক প্রস্ত্ততি নেন। বাংলার বাইরে থেকে কতিপয় সেনানায়ককে এনে এই অভিযানে সম্পৃক্ত করেন। দাক্ষিণাত্য থেকে সুজাত খানকে এনে অভিযানের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়।  শান্তিপূর্ণভাবে উসমানকে আয়ত্তে আনার উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট এক জরুরি বার্তা প্রেরণ করা হয়। উসমানকে অনুরোধ জানানো হয় যেন তিনি যুদ্ধবিগ্রহ পরিহার করে আত্মসমর্পণ করেন। জবাবে উসমান জানান যে, অদৃষ্টের বহু ঘাতপ্রতিঘাতের পর সমগ্র দেশ মুগলের কর্তৃত্বে ছেড়ে দিয়ে তিনি দেশের এক নিভৃত কোণে আশ্রয় নিয়েছেন যেখানে তিনি শান্তিতে বসবাস করতে চান। আর এখন যদি তারা তাকে সেখান থেকেও বিতাড়িত করতে বদ্ধপরিকর হয়ে থাকে তাহলে তাঁর জন্য আর একবার রণক্ষেত্রে তাঁর ভাগ্যের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।

সুজাত খানের অধীনে অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এ বাহিনীতে ছিল ইসলাম খানের ৫০০ বাছাই করা অশ্বারোহী, ৪০০০  বন্দুকধারী, বিপুল সংখ্যক হাতী, ইহতিমাম খানের অধীনে পুরো মুগল নৌবহর এবং সরাইলের জমিদার সোনাগাজীর নৌবহর। স্থলবাহিনী মেঘনার তীর পথে উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে তরফ দুর্গের নিকটে পৌঁছে। খাজা মুমরিজ ও খাজা মালহী দুর্গ থেকে শত্রু বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। কিন্তু স্বল্পকালীন প্রতিরোধের পরই তারা দুর্গ ত্যাগ করে পশ্চাদপসরণ করেন এবং উহরে খাজা উসমানের সঙ্গে মিলিত হন। সুজাত খান তখন তাঁর বাহিনীসহ দক্ষিণদিকে অগ্রসর হয়ে একসময় পুটিয়া গিরিপথে উসমানের দুর্গের নিকটে পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। খাজা উসমানের ভাই খাজা ওয়ালী দুটি দুর্গ থেকে গিরিপথ প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। গিরিপথে শত্রুবাহিনীর গতিরোধ করার ক্ষেত্রে এ দুটি দুর্গের অবস্থান ছিল খুবই সুবিধাজনক। একটি দুর্গ ছিল পাহাড়ের পাদদেশে এবং অপরটি পাহাড়ের উপর। খাজা ওয়ালী দুর্গ দুটি পরিত্যাগ করে পালিয়ে যান। এভাবে দুর্গ দুটি ত্যাগ করে খাজা উসমানের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেন খাজা ওয়ালী। সুজাত খান দুটি দুর্গ দখল করে (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৬১২) তাঁর বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন।

উহর অভিমুখে সুজাত খানের অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে খাজা উসমান তাঁর মোকাবেলার জন্য অগ্রসর হন। খাজা উসমান নিজে তাঁর বাহিনীর মধ্যবর্তী অংশের দায়িত্ব নেন। এ অংশে ছিল ২০০০ অশ্বারোহী, ৫০০০ পদাতিক ও ৪০টি হাতী। ১০০০ অশ্বারোহী, ২০০০ পদাতিক সৈন্য এবং ৩০টি হাতীসহ বাহিনীর বাম অংশের দায়িত্ব দেয়া হয় খাজা ওয়ালীকে। উসমানের বিশ্বস্ত অনুচর শেরে ময়দানকে দায়িত্ব দেয়া হয় বাহিনীর ডান অংশের। এতে ছিল ৭০০ অশ্বারোহী, ১০০০ পদাতিক সৈন্য ও ২০টি হাতী। ১৫০০ অশ্বারোহী, ২০০০ পদাতিক সৈন্য ও ৫০টি হাতী সমন্বয়ে গঠিত অগ্রগামী বাহিনীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ভাই খাজা ওয়ালী ও খাজা ইবরাহিম এবং ভ্রাতুষ্পুত্র খাজা দাউদের উপর। খাজা উসমান তাঁর বাহিনী নিয়ে রাজধানী উহর থেকে পূর্বদিকে প্রায় ১২ মাইল অগ্রসর হয়ে দৌলম্বপুর গ্রামে পৌছেন। দৌলম্বপুর গ্রামটি বর্তমান মৌলভীবাজারের প্রায় পাঁচ মাইল দক্ষিণে হাইল হাওরের মাইল খানেক উত্তরে অবস্থিত। দৌলম্বপুরে পৌঁছে খাজা উসমান কর্দমাক্ত ও খানাখন্দ ভরা বিশাল এক জলাভূমির পাশে পরিখা খনন করে অবস্থান নেন। এই জলাভূমির পার্শ্বে ছিল বিশাল ও ঘন সুপারি বন। এই সুপারিগাছের সঙ্গে উঁচুতে তক্তা বেঁধে মাচান তৈরি করা হয় এবং সেই মাচানের উপর বসানো হয় কামান। এ ভাবেই উসমান জলাভূমির প্রান্তে শত্রুর মোকাবেলার জন্য এমন দুর্ভেদ্য অবস্থান বেছে নেন যাতে তাঁর প্রতিপক্ষের পক্ষে যুদ্ধ করা ছিল খুবই দুরূহ। মুগল সেনাপতি তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এসে জলাভূমির নিকটে উসমানের অবস্থান থেকে দেড় মাইল দূরে পরিখা তৈরি করে অবস্থান নেন।

১৬১২ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ রবিবার প্রত্যুষে মুগল বাহিনী উসমানের বাহিনীর ডান অংশের উপর প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই মুগল সৈন্যদের মধ্যে সংশয় ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বাহিনীর ডান ও বাম অংশ শোচনীয় পরাজয় বরণ করে, বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয় এবং উভয় অংশের সেনাপতি শেখ আচ্ছা ও ইফতিখার খান নিহত হন। প্রবল আক্রমণের মুখে অবশিষ্ট সৈন্যরা তাড়া খেয়ে মূল পরিখায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। আফগানরা মুগল বাহিনীর মধ্যবর্তী অংশে প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে শত্রুর রক্ষাব্যুহ ভেঙে দেয়। মুগল সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং তাদের প্রধান সেনাপতি সুজাত খান তাঁর বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কোনরকমে তিনি বন্দীত্ব এড়াতে সক্ষম হন।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তুমুল যুদ্ধে মুগল বাহিনী যখন সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত এবং আফগানদের বিজয় অবধারিত, ঠিক তখনই একটি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অকস্মাৎ এক মুগল অশ্বারোহীর তীরের আঘাতে খাজা উসমান মারাত্মক আহত হন। এই মুগল অশ্বারোহী শেখ আব্দুল জলিল ছিলেন সেনাপতি ইফতিখার খানের এক বিশ্বস্ত অনুচর। যুদ্ধে ইফতিখার খানের মৃত্যুর বদলা নেয়ার উদ্দেশ্যে শেখ আব্দুল জলিল যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে উসমানের দিকে ছুটে যান এবং এতোটা কাছে থেকে তাঁর প্রতি তীর ছোড়েন যে তীরটি তাঁর বাম চোখ ভেদ করে মাথার মগজে ঢুকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে উসমান তাঁর ঘাতককে বর্শায় গেঁথে ফেলেন এবং চোখে বিদ্ধ তীরটি টেনে বের করেন। কিন্তু তীরটি বের করতে গিয়ে তাঁর ডান চোখটিও তীরের ফলার সঙ্গে বের হয়ে আসে। তিনি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। এতে এতটুকু বিচলিত না হয়ে এই দুর্ধর্ষ আফগান যোদ্ধা একটি রুমাল দিয়ে বা হাতে নিজের চোখ বেঁধে ফেলেন যাতে তাঁর অনুসারীরা তাঁর এ মারাত্মক জখম দেখতে না পায়। আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি ডান হাতে তাঁর হাতীর মাহুতকে ইশারা করেন সুজাত খানের দিকে অগ্রসর হওয়ার। কিন্তু দ্রুত তাঁর বাকশক্তি রহিত হতে থাকে এবং তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

খাজা উসমানের মৃত্যুসংবাদ সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখা হয়। তাঁর পুত্র খাজা মুমরিজ হাতীর পিঠে করে দ্রুত উসমানের মৃতদেহ শিবিরে নিয়ে যান এবং নিজে সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসেন। নেতাকে হারিয়ে আফগানরা সন্ধ্যা পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং রাতের অন্ধকারে উহরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মধ্যরাতের পরে চুপিসারে শিবির ছেড়ে উহরের উদ্দেশে রওনা হন। উসমানের মৃতদেহ উহরে নিয়ে গিয়ে দুই পাহাড়ের মধ্যস্থলে গোপনে সমাহিত করা হয়। তাঁর প্রাসাদ অঙ্গনে তৈরি করা হয় একটি মেকি সমাধি।

উসমান সম্ভবত ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব। উড়িষ্যা থেকে বিতাড়িত হয়ে উসমান মুগল আগ্রাসনের মোকাবেলা করে বাংলায় স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং এ অঞ্চলে আফগান শক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটান। উসমান অমর হয়ে আছেন তাঁর ব্যক্তিগত শৌর্য, অকুতোভয় উদ্যম ও কর্মশক্তি, তেজস্বিতা, উদ্দেশ্য সাধনে নিষ্ঠা এবং সর্বোপরি তাঁর স্বাধীনতা প্রিয়তার জন্য। এসব গুণাবলিই তাঁকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছে ক্রমবর্ধমান মুগল শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধ যুদ্ধে। মুগলের আধিপত্য কোনদিন তিনি মেনে নেন নি, বরং স্বীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রামে রণক্ষেত্রেই তিনি প্রাণ দিয়েছেন।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]