ক্ষরণ


ক্ষরণ (Eluviation)  মৃত্তিকা পরিলেখের মধ্য দিয়ে প্রলম্বনে বস্ত্তর নিম্নমুখী বা তির্যক স্থানান্তর ঘটে। এ স্থানান্তরের ফলে বস্ত্ত-সমৃদ্ধ বা সঞ্চয়ণ ক্ষিতিজের উপর বস্ত্ত-অসমৃদ্ধ বা ক্ষরিত ক্ষিতিজ উৎপন্ন হয়। প্রক্রিয়াটি মৃত্তিকার উৎপত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বস্ত্তর এ স্থানান্তর সাধারণত নিচের দিকে ঘটে, কিন্তু যেসব স্থানে  পৃষ্ঠমৃত্তিকা শুকিয়ে যায় যেসব স্থানে উর্ধ্বমুখী স্থানান্তরও ঘটতে পারে। মৃত্তিকার মধ্য দিয়ে পানি চলনের কারণে পৃষ্ঠ ক্ষিতিজ থেকে বস্ত্ত স্থানান্তরিত হয়। এভাবে অপসারিত বা ক্ষরিত বস্ত্ত অন্তঃপৃষ্ঠ ক্ষিতিজে জমা হয় বা নিষ্কাশিত পানির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অপসারিত হয়।

ক্ষরণ দু প্রকারের হতে পারে: রাসায়নিক ক্ষরণ এবং ভৌত ক্ষরণ। মৃত্তিকা উৎপত্তির সময় জীব জগতের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে বায়ুমন্ডল, বারিমন্ডল ও শিলামন্ডলে অবিরতভাবে পারস্পরিক ক্রিয়ার কারণে অসংখ্য বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে শিলা ও মণিকে ভৌত বিচূর্ণন ও রাসায়নিক বিয়োজন ঘটে এবং একই সঙ্গে মৃত্তিকার জৈব বস্ত্ততেও বিভিন্ন পরিবর্তন সাধিত হয়। এসব পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন রাসায়নিক যৌগ উৎপন্ন হয়। নতুন যৌগগুলির কোনো কোনোটি মৃত্তিকা উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে আটকা পড়ে এবং কোনো কোনো রাসায়নিক যৌগ মৃত্তিকা থেকে অপসারিত হয়ে যায়। রাসায়নিক ক্ষরণ প্রক্রিয়াতে বিয়োজনের ফলে উৎপন্ন বস্ত্ত প্রকৃত বা কলয়ডীয় দ্রবণ (colloidal solution) আকারে অপসারিত হয়ে অন্যান্য ক্ষিতিজে অবক্ষেপিত হয়। অন্যদিকে, ভৌত ক্ষরণ প্রক্রিয়ায় মৃত্তিকা মণিকের তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম অংশ, বিশেষ করে এঁটেল কণা নিচের ক্ষিতিজে অপসারিত হয়। ভৌত ক্ষরণের ফলে হালকা গ্রথন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন  মৃত্তিকা ক্ষিতিজ উৎপন্ন হয়। উপরিস্থিত ক্ষিতিজ থেকে এঁটেলের সূক্ষ্মতর কণা অপসারিত হয়ে নিচের ক্ষিতিজে জমা হয় এবং ভারি গ্রথনের ক্ষিতিজ উৎপন্ন করে। নিচের এ ক্ষিতিজগুলি উপরের ক্ষিতিজ থেকে ক্ষরিত রাসায়নিক যৌগ দ্বারাও সমৃদ্ধ হয়।

নিচের ক্ষিতিজ থেকে উপরের ক্ষিতিজে বস্ত্তর ক্ষরণ উপরের ক্ষিতিজে শুষ্ক অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণে ঘটে থাকে। মৃত্তিকা পানিতে দ্রবীভূত লবণ মূলত একসঙ্গে উপরের ক্ষিতিজে পরিবাহিত হয়। এর কারণ হলো সংশ্লিষ্ট দুটি ক্ষিতিজের মধ্যে পানির পরিমাণে সাম্য রক্ষা করা।

বস্ত্তর ক্ষরণ জলবায়ুর উপর নির্ভর করে এবং স্থানীয় নিষ্কাশন অবস্থা দ্বারাও প্রভাবিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অবাধ নিষ্কাশিত মৃত্তিকাতে যখন বাস্পীভবনের চেয়ে বৃষ্টিপাত অধিক হয় তখন পৃষ্ঠ মৃত্তিকা থেকে পানি নিচের দিকে যায় এবং ভূ-জলে পৌঁছায়। ছাঁকন কাগজে যেমন করে অধঃক্ষেপ আলাদা করা হয় পানির এ প্রবাহ দ্বারাও তেমন করে  মৃত্তিকা পরিলেখ ক্ষরিত হয়। এ প্রকারের ক্ষরণ আর্দ্র অঞ্চল এবং বাংলাদেশের মতো অর্ধ-আর্দ্র অঞ্চলেও ঘটে। বস্ত্তর উর্ধ্বমুখী প্রবাহ সাধারণত শুষ্ক ও প্রায়-শুষ্ক অঞ্চলে যেখানে বাষ্পীভবনের হার বৃষ্টিপাতের হারের চেয়ে অধিক সেখানে বেশি দেখা যায়। দ্রবণীয় লবণের এ প্রকারের উর্ধ্ব ও নিম্নমুখী চলন ক্ষিতিজের বৈশিষ্ট্য পার্থক্যকরণের মাধ্যমে মৃত্তিকার উৎপত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। লবণাক্ত মৃত্তিকার উৎপত্তি পরিলেখের মধ্য দিয়ে লবণের প্রবাহ দ্বারাই মূলত নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।  [সিরাজুল হক]