ক্যালেন্ডার অব পার্সিয়ান করেস্পন্ডেন্স


ক্যালেন্ডার অব পার্সিয়ান করেস্পন্ডেন্স  ১৯১১ থেকে ১৯৫৩ সালব্যাপী কলকাতাস্থ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দলিল দফতর কর্তৃক প্রকাশিত ধারাবাহিক সরকারী পত্রাবলি। এ ক্যালেন্ডারে ওই সকল পত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয় যেগুলি প্রধানত বাংলার বিষয়াবলি সম্পর্কে ব্রিটিশ  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীবৃন্দ এবং ভারতীয় শাসক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আদান-প্রদান করা হয়েছে।

ক্যালেন্ডার অব পার্সিয়ান করেস্পন্ডেন্স (সংক্ষেপে CPC-সি.পি.সি) প্রণীত হয় ১৮৯১ সালে যখন ভারত সরকার জি.ডব্লিউ ফরেস্টের তত্ত্বাবধানে সাম্রাজ্যের ইম্পেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করে। ফরেস্টের দৃষ্টিগোচর হয়, বৈদেশিক বিভাগ থেকে যে সকল নথি পাওয়া গেছে সেগুলির মধ্যে ফারসি ভাষায় লিখিত প্রচুর কাগজপত্রের সংগ্রহ বিদ্যমান। এগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ফরমান, সনদ, চুক্তিপত্র এবং সর্বোপরি ফারসি ভাষা পত্রাবলি। ফরেস্টের উত্তরাধিকারী ড. উইলসন ফারসি ভাষার দলিলসমূহের পুরোটা আলাদাভাবে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সেগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার পদক্ষেপ নেন। ১৯০৬ সালে উইলসনের উত্তরাধিকারী ই.ডি রস রেকর্ড ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ ফারসি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং ফারসি ভাষায় সুশিক্ষিত ও ঐতিহাসিক গবেষণায় উৎসুক চারজন ‘মৌলভী’কে নিয়োগ করেন। এভাবে সাম্রাজ্যের রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে প্রাচ্যদেশীয় শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আলীগড় থেকে পাস করা একজন বিশিষ্ট স্নাতক ডিগ্রিধারী মৌলভি যায়িফ মুহম্মদ সি.পি.সি-র প্রথম খন্ড তৈরীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাম্রাজ্যের রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে রক্ষিত ফারসি ভাষার নথিসমূহের একটি তালিকা ১৯০৯ সালে ছাপা হয়।

উপরিউল্লিখিত ফারসি দলিলসমূহ, যেগুলি তথ্যের অমূল্য ভান্ডার, ৯ খন্ডে প্রকাশিত হয় যার সংক্ষিপ্তসার নিম্নে দেওয়া হলো:

প্রথম খন্ড ১৯১১ সালে প্রকাশিত হয় এবং এতে ১৭৫৯ থেকে ১৭৬৭ সাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলির বিবরণ রয়েছে। যে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট বাংলার ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করে এবং ক্রমান্বয়ে তা সংহত করতে সাহায্য করে এখানে তার ধারাবাহিক বর্ণনা দেওয়া আছে। দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে এবং এতে ১৭৬৭ থেকে ১৭৬৯ সাল পর্যন্ত সময়ের আলোচনা করা হয়েছে।  খন্ডটি শুরু হয় আহমদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণ বিষয় নিয়ে। ভারত ওই সময় মারাঠাদের চিরাচরিত পেশা লুণ্ঠন ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের কারণে অস্থির ছিলো। এতে ক্যাপ্টেন জেমস রেনেল এর বঙ্গভূমি জরিপ, মুদ্রা সংস্কার ও সব গুরুত্বপূর্ণ জেলায় রাজস্ব প্রশাসন তদারক করতে আমিল নিয়োগের তথ্যও রয়েছে। তৃতীয় খন্ড দু’বছরের (১৭৭০-১৭৭২) ঘটনাবলি নিয়ে ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়। এতে জন কার্টিয়ারের ফোর্ট উইলিয়মএর গভর্নরের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু ফরাসিদের দমন করে।

১৭৭২ থেকে ১৭৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদন সম্বলিত চতুর্থ খন্ড ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ খন্ডে ওয়ারেন হেস্টিংস এর প্রশাসনের প্রথম চার বছরের বর্ণনা রয়েছে। পঞ্চম খন্ডে ১৭৭৬ থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত সময় নিয়ে আলোচনা রয়েছে এবং এটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। এ খন্ডে গভর্নর জেনারেল হিসেবে হেস্টিংসের শাসনামলের অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ষষ্ঠ খন্ডে ১৭৮১ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত সময় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এটি ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়। এতে হেস্টিংসের শাসনের শেষ পাঁচ বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি বিধৃত হয়েছে। সপ্তম খন্ড ১৭৮৫ থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত সময় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এটি ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়। এ খন্ডে লালসোট (রাজপুতানার জয়পুর রাজ্যের একটি শহর) অভিযান ও দাক্ষিণাত্যের জটিল রাজনীতির বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত চিঠিসমূহে আঠারো শতক থেকে উনিশ শতকে উত্তরণকালের রাজনৈতিক সমস্যাবলি, অর্থনৈতিক পরিবর্তনসমূহ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং আধ্যাত্মিক বিপ্লবের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অষ্টম খন্ড ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় (কিছু অনিবার্য কারণে খন্ডটি শেষ খন্ডের পরে বের হয়)। এতে কর্নওয়ালিস এর প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে ১৭৮৮ থেকে ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৭৯০ থেকে ১৭৯১ সালের বিবরণ নিয়ে নবমখন্ড প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। শেষ খন্ডটি মহীশূরের তৃতীয় যুদ্ধ ও এর পূর্ববর্তী কূটনৈতিক কার্যাবলির যথাযথ উপলব্ধিতে সাহায্য করে।

প্রথম খন্ডে যে পত্রাবলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তার কিছু কিছু এর পূর্বে লং-এর সিলেকশন ফ্রম দি আনপাবলিশড রেকর্ডস অব গভর্নমেন্ট (১৭৪৮-১৭৬৭) এবং আরও কয়েক জায়গায় প্রকাশিত হয়েছিল। ফারসি ভাষায় আদান-প্রদানকৃত চিঠিপত্রসমূহ সি.পি.সি. ছাড়া অন্য কোথাও একত্রিতভাবে আলোচিত হয় নি।  [শিরীন আখতার]