ক্যালকাটা মিশনারি কনফারেন্স


ক্যালকাটা মিশনারি কনফারেন্স প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারিদের প্রধান আন্তঃসম্প্রদায় সংস্থা। প্রতিষ্ঠা ১৮৩১ সাল।  এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা বিশ্বাস করতেন, ভারতীয় ও ব্রিটিশ জনমত তথা সরকারি নীতি প্রভাবিত করার জন্য এরকম একটি সংস্থার প্রয়োজন আছে।

ক্যালকাটা মিশনারি কনফারেন্স (সি.এম.সি) ব্রিটিশ প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারি সমিতিসমূহের মুখপাত্র ছিল। চার্চ, ব্যাপটিস্ট ও লন্ডন মিশনারি সোসাইটি দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রিত হতো। সংস্থার মাসিক সভাগুলিতে পারস্পরিক মত ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হতো। পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা বৃদ্ধি ও ঈশ্বরের বাণী প্রচারে পরস্পরকে উৎসাহ প্রদানও ছিল এ সভাগুলির উদ্দেশ্য।

সি.এম.সি-র পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৮৪৫, ১৮৪৮, ১৮৫৮ ও ১৮৮৭ সালে যথাক্রমে বোম্বাই, মাদ্রাজ, বাঙ্গালোর ও লক্ষ্ণৌতে অনুরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সি.এম.সি-ই অবশ্য এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। ১৮৩১ সালে এ সংস্থা মুখপত্র হিসেবে দি ক্যালকাটা ক্রিশ্চিয়ান অবজারভার নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করে। ১৮৩৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত প্রকাশিত এ পত্রিকার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান, সাহিত্য ও খ্রিস্টান ধর্মবাণী প্রচার।

লিঙ্গ ও জাতিবৈষম্য অতিক্রম করার ব্যাপারে সি.এম.সি-র অগ্রণী ভূমিকা ছিল। মিশনারি কাজে ব্যাপৃত মহিলারা ‘পুরুষদের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে’ সংস্থার পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। ভারতীয় নারীর অবস্থা ও মর্যাদা নিয়ে এখানে আলোচনা হতো। এ আলোচনায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করত ভারতীয় মিশনারি ও যাজকবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ।

বাংলার কৃষকের স্বার্থ তুলে ধরার মধ্যেই সি.এম.সি-র ভূমিকার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য নিহিত ছিল। মফস্বলে কাজ করার সুবাদে মিশনারিরা গ্রাম বাংলার বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়। ফলে তাদেরকে ঔপনিবেশিক কর ব্যবস্থা, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার অসঙ্গতি লক্ষ্য করার সুযোগ পায়। তারা কৃষকের ক্রমবর্ধমান দুর্দশার জন্য সরকারকে দায়ী করে এবং ‘নিগৃহীত জনতার নৈতিক ও বৈষয়িক কল্যাণের’ জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে চাপ প্রয়োগ করে।

১৮৫৫ সালের ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বাংলার প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারিদের প্রথম সাধারণ সম্মেলন সি.এম.সি-র কর্মকান্ডের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বিভিন্ন সোসাইটি থেকে ৪৭ জন মিশনারি এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। এ সম্মেলন থেকেই ওয়ার্ল্ড মিশনারি কনফারেন্স্-এর জন্ম হয় (এডিনবার্গ, ১৯১০)। পরবর্তীকালের বিশ্ব মিশনারি ঐক্যের জন্যও উল্লিখিত সম্মেলন ছিল প্রথম পদক্ষেপ।

১৮৫৫ সালের সাধারণ সম্মেলন প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থায় সংস্কার সাধনের স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করে। জমিদারি ও নীলপ্রথার ত্রুটির ওপর বেশ কিছু প্রবন্ধ এ সম্মেলনে পঠিত হয়। তখন থেকেই এ সব ত্রুটি দূর করার জন্য সি.এম.সি সংগঠিত প্রচারাভিযান শুরু করে। পুলিশ বিভাগের দুর্নীতি ও বিচার-প্রশাসনের অসঙ্গতি দূর করার জন্যও সংস্থা সরকারের প্রতি আহবান জানায়।

সিএমসি মনে করে, ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন বাংলার রায়তদের পক্ষে তাদের তিরিশ বছরের আন্দোলনের ফসল। সংস্থা ধরে নিয়েছিল, রায়তদের পক্ষে যে তিনটি ‘এফ’-এর জন্য তারা সংগ্রাম করেছে ‘ফিক্সিটি অব টেনিউর’ বা ভোগ দখলের স্থায়িত্ব, ‘ফেয়ার রেন্ট’ বা ন্যায্য কর ও ‘ফেয়ার সেল’ বা ন্যায্য বিক্রয় সে তিনটি দাবি উল্লিখিত ‘অ্যাক্ট’ পূরণ করবে, একই সঙ্গে ‘মুক্ত মানুষের যেসব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা’ রায়তেরা কোনোদিন ভোগ করে নি, সে সব অধিকার ও সুযোগ সুবিধা তাদেরকে দেওয়া হবে।

গ্রামাঞ্চলে মিশন স্থাপনের ফলে সি.এম.সি খ্রিস্টান রায়তদের ওপর জমিদারি প্রথার কুফল সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ১৮৪০-এর দশকে কৃষ্ণনগর, যশোর ও বরিশাল অঞ্চলে ‘কর্তাভজ’ (‘কর্তা’ অর্থাৎ ঈশ্বর, ‘ভজ’ অর্থাৎ উপাসক) নামে এক নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় বিপুল সংখ্যায় ধর্মান্তরিত হয়। এর ফলে তাদের ওপর জমিদারি অত্যাচার বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। সি.এম.সি-র মতে, জমিদারেরা ধর্মান্তরীতদের ওপর অতিরিক্ত অত্যাচার চালাত এবং একটি স্বনির্ভর খ্রিস্টান সমাজ গড়ে তুলতে মিশনারিরা যে প্রয়াস চালাচ্ছিল তা বাধাগ্রস্ত করছিল। সি.এম.সি অবশ্য জমিদারদের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়নি। বরং  রায়তদের সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সমিতি ১৮৩৮ সালে স্থাপিত  ‘ল্যান্ড হোল্ডার্স সোসাইটি’ এবং ১৮৪৩ সালে স্থাপিত বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি-র সহযোগিতা কামনা করেছিল।

১৮৫২ সালের পর এ সংস্থা ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ভারত তথা বাংলার সরকারের কাছে একাধিক দরখাস্ত পেশ করে। এসব দরখাস্তের বিষয়বস্ত্ত ছিল প্রচলিত ভূমি-রাজস্ব, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার অসঙ্গতি এবং এইগুলির প্রতিকার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা, বেনামি লেনদেন বন্ধের উদ্দেশ্যে জমিদারিসমূহের সর্বাঙ্গীণ জরিপ এবং ‘অত্যাচারিতকে রক্ষা ও সবার জন্য ন্যায়বিচার’ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার সাধানের জন্য এসব দরখাস্তে আবেদন জানানো হয়। আবেদনকারীরা ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়দের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করেন, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, এতে ভারতীয় কৃষিতে ইউরোপীয় পুঁজি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, আর তার ফলে ভারতীয় কৃষি ও কৃষক লাভবান হবে।

অবশ্য ‘নীল সংকট’ সি.এম.সি-কে ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়দের অবদান সম্পর্কে সন্ধিহান করে তোলে। নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) প্রতি এ সংস্থার সমর্থন, ‘নীল দর্পন’ (১৮৬০) মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেমস লং-এর কারাদন্ডের সমালোচনা এবং লং সাহেবের অবস্থানের প্রতি জোর সমর্থন এ সংস্থার মহৎ ও উন্নত চিন্তাধারার আভাস দেয়। সি.এম.সি  নীলকরদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে নীলচাষীদেরকে উদ্বুদ্ধ করে।

সি.এম.সি গণশিক্ষার উপর অত্যন্ত জোর দেয়, কারণ তারা বিশ্বাস করত, কেবল প্রশাসনিক সংস্কার গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবেনা। সি.এম.সি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে, কারণ বিদেশি ভাষায় শিক্ষা শুধু সমাজের গুটিকয় মানুষকেই স্পর্শ করতে পারে। সি.এম.সি-র এ বিশ্বাস বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। বিদেশি মিশনসমূহের সাধারণ সভায় (মিলড্মে, লন্ডন ১৮৭৮) সি.এম.সি-র প্রাক্তন সম্পাদক এম. মিচেল এ বিশ্বাস তুলে ধরেন।

এ বিশ্বাস থেকে সি.এম.সি ‘ক্রিশ্চিয়ান ভার্নাক্যুলার এডুকেশন সোসাইটি’-র (লন্ডন ১৮৫৮) ‘বেঙ্গল কমিটি’ কর্তৃক গৃহীত গণশিক্ষা কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সি.এম.সি বেঙ্গল কমিটি কর্তৃক প্রবর্তিত সার্কেল সিস্টেম-এর মাধ্যমে অধিক সংখ্যক গ্রাম্য পাঠশালা পরিদর্শন করতে বাংলার মিশনারিদের উৎসাহিত করে।

সি.এম.সি আন্তঃচার্চ বিবাদ দূর করতে এবং নানা মতের মিশনারিদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়। বাংলার কৃষকের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সংস্থাটির মুখ্য উপজীব্য। ফলে এর অনুসৃত কর্মকান্ডের সঙ্গে খ্রিষ্টের বাণী প্রচারের খুব একটা সংযোগ ছিল না। সি.এম.সি ভারতের প্রথম সংগঠন যা রায়তদের অভাব অভিযোগের কথা তুলে ধরে। এ ক্ষেত্রে সংস্থার সাফল্য ছিল আংশিক। তবে এ আংশিক সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ছিল গণমানুষের স্বার্থের প্রতি সংস্থার বিশ্বস্ততা। ঔপনিবেশিক পরিবেশে এটি ছিল এক অভিনব ঘটনা।  [তৃপ্তি চৌধুরী]

গ্রন্থপঞ্জি  GA Oddie, Social Protest in India, British Protestant Missionaries and Social Reform 1850 - 1900, New Delhi, 1979; Tripti Chaudhuri, 'The Calcutta Missionary Conference: A Voice of protest in the late 19th Century Bengal', Proceedings of the Fifty-Sixth Session of Indian Historical Records Commission, New Delhi, 1998.