ক্যারিয়ার সার্ভিস


ক্যারিয়ার সার্ভিস  বেসামরিক সরকারি চাকুরি কাঠামোর আওতাভুক্ত বিভিন্ন পেশা। এ পেশাকে মূলত দু’ভাগে ভাগ করা যায়, সাধারণ বা প্রশাসনিক এবং বিশেষ বা কারিগরি।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়ার দিকে দু শ্রেণির বেসামরিক চাকুরির উদ্ভব হয়েছিল। প্রথমটি সনদী চাকুরি এবং দ্বিতীয়টি ছিল অসনদী চাকুরি। সনদী চাকুরিতে নিয়োগ দেওয়া হতো ইংল্যান্ড থেকে। নিয়োগপ্রাপ্তরা সততা ও আনুগত্যের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে এখানে আসত। এ কারণেই এ চাকুরিকে বলা হতো সনদী বা চুক্তিবদ্ধ চাকুরি। অন্য শ্রেণির বেসামরিক কর্মকর্তারা কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হতেন না। এজন্য তাদের বলা হতো চুক্তিবহির্ভূত বা অসনদী কর্মকর্তা। এদেরকে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হতো। ১৮৩৩ সালে এসব চাকুরিকে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারে রূপ দেওয়া হয়।

সনদী চাকুরি ছিল অপরিহার্যভাবে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন চাকুরি। এ চাকুরিতে নির্দিষ্টভাবে সচিবালয় প্রশাসন ও মাঠ পর্যায়ে পদোন্নতির মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন পদগুলি পূরণের ব্যবস্থা ছিল। ১৮৬১ সালে প্রণীত এক আইনের মাধ্যমে সনদী চাকুরির জন্য পদ সংরক্ষণ পদ্ধতি চালু হয়। এর ফলে প্রথমবারের মতো দু শ্রেণির চাকুরির ক্ষেত্রে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। তখন থেকে এসব পদ  তালিকাবদ্ধ পদ হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯৮৭ সালের পর সনদী বেসামরিক চাকুরিকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আই.সি.এস) নাম দেওয়া হয়। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে এ চাকুরিতে নিয়োগ দেওয়া হতো। অসনদী চাকুরি সংশ্লিষ্ট প্রদেশের নামানুসারে প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস হিসেবে আখ্যাত হয়।

প্রসঙ্গত বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের (বি.সি.এস) আলোচনা এসে যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত চাকুরি কাঠামো কমবেশি অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিল। কাঠামোটি ছিল প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল পাকিস্তান আমলের সরকারি চাকুরি, যেমন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান, পুলিশ সার্ভিস অব পাকিস্তান এবং পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের মতো অপরাপর চাকুরি, এবং এগুলি সম্পৃক্ত ছিল হিসাব ও নিরীক্ষা, কর, শুল্ক ও আবগারি, সচিবালয়, ডাক ও তথ্য বিভাগের সঙ্গে। প্রদেশগুলোতে ঔপনিবেশিক চাকুরি কাঠামোই বলবৎ ছিল।

বাংলাদেশ আমলে ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেসামরিক চাকুরি কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চাকুরি পুনর্বিন্যাসের এসব উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে গঠিত কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ২৮টি ক্যাডার গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্যাডারের সংখ্যা ৩০-এ উন্নীত হয়। বর্তমানে রয়েছে ২৯ টি ক্যাডার।

ক্যারিয়ার সার্ভিসে এসব সংস্কারের প্রভাবে ক্যাডারের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্যাডারদের অধিকারও বিস্তৃত হতে থাকে। ফলত পদোন্নতির সুযোগ ও মর্যাদা-সচেতনতাকে কেন্দ্র করে একই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে এবং ভিন্ন ভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে তিক্ততা বাড়তে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতির সুযোগেও তারতম্য রয়েছে। [এ.এম.এম শওকত আলী]