ক্যাডেট কলেজ


ক্যাডেট কলেজ  পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলের আদর্শে সরকারি অর্থে সর্বপ্রথম পাঞ্জাবে পূর্ণ আবাসিক ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ক্যাডেট কলেজে প্রাথমিক সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। সম্ভবত ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলের আদর্শে এবং জারের আমলে রাশিয়ার ক্যাডেট কোরের আদলে পাকিস্তানের ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে ১৮৫ একর জায়গা নিয়ে এ অঞ্চলে প্রথম ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজটি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। এ কলেজ পরিচালনার দায়িত্বভার দেওয়া হয় তদানীন্তন চতুর্দশ ডিভিশনের জিওসি-র হাতে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের দায়িত্বভার অর্পিত হয় প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর। কলেজটির প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন স্যার উইলিয়ম মরিস ব্রাউন। তিনি নিউজিল্যান্ড সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন। তিনি এখানে ৭ বছর  অধ্যক্ষ ছিলেন। ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য ছিল উচ্চতর নৈতিক বোধ, সুদৃঢ় মনোবল, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, সুস্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে দক্ষ নেতৃত্ব দানের গুণাবলিসম্পন্ন প্রশিক্ষিত যুবশক্তি গড়ে তোলা। ভাল পড়াশোনা ও ফলাফলের জন্য ক্যাডেট কলেজ দ্রুত সুনাম অর্জন করে। ১৯৬৩ সালে খুলনা বিভাগে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, ১৯৬৫ সালে মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ-এর নাম হয় মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ।

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ

১৯৬০ সালে প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল নামে ঢাকায় একটি আবাসিক স্কুল স্থাপন করা হয় এবং তারই অনুসরণে ১৯৭০ সালের মধ্যে কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, পাবনা ও রংপুর জেলায় রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলটিকে কেবল মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়।

রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল ও ক্যাডেট কলেজ দুটিই আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এগুলির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। ক্যাডেট কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব সরাসরি সেনা সদর দপ্তরের উপর এবং অন্যান্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা শিক্ষা পরিদপ্তরের উপর অর্পিত হয়।

১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে রাষ্ট্রপতির ক্যাডেট কলেজ ৮৯নং অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ক্যাডেট কলেজ কাউন্সিল ও গভর্নিং বডিসমূহের পুনর্বিন্যাস করা হয়। কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হন শিক্ষামন্ত্রী এবং গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হন বিভাগীয় কমিশনার। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে ক্যাডেট কলেজ আইন পাস করা হয় এবং তদনুযায়ী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ক্যাডেট কলেজ কাউন্সিল ও গভর্নিং বডিসমূহের পুনর্গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিবকে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সামরিক বাহিনীর উপ-প্রধানকে গভর্নিং বডিসমূহের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। সে সময় থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে কাউন্সিল ও গভর্নিং বডিসমূহের চেয়ারম্যান পদের রদবদল হয়েছে কিন্তু মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ একই রয়ে গেছে।

১৯৭৮ সাল থেকে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলগুলিকে ক্যাডেট কলেজে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে উক্ত বছরে সিলেট ও ১৯৭৯ সালে রংপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলকে ক্যাডেট কলেজে পরিণত করা হয়। ১৯৮২ সালে বরিশাল ও পাবনা, ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলকে মহিলা ক্যাডেট কলেজ এবং কুমিল্লা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলকে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে রূপান্তর করা হয়। ২০০৬ সালে জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ ও ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজের মোট সংখ্যা ১২টি।   [ফজলে রাবিব]